শব্দবাজি বা আতসবাজি, পরিবেশ থেকে প্রাণ, কার কতটা ক্ষতি
Fireworks Pollution: দীপাবলি ও কালীপুজোর আনন্দে বাজি পোড়ানোর চল থাকলেও এর প্রভাব পড়ে মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও পশুপাখির উপর। বাজির ধোঁয়া থেকে বাড়ে বায়ুদূষণ, বিকট শব্দে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শ্রবণশক্তি। দূষিত হয় মাটি ও জলও। কিন্তু শব্দবাজি ও আতসবাজি ঠিক কতটা ক্ষতি করে এবং কীভাবে কমানো সম্ভব?
দীপাবলি ও কালীপুজো মানেই আলোর উৎসব। এই সময় উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠেন আট থেকে আশি সকলেই। তবে এই আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পরিবেশদূষণের বড় সমস্যা। বাজি পোড়ানোর ফলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে বিষাক্ত ধোঁয়া ও ক্ষতিকারক রাসায়নিক। বাড়ে শব্দদূষণ। শুধু বায়ুদূষণ নয়, মাটি ও জলও দূষিত হয়। এর প্রভাব পড়ে মানুষের স্বাস্থ্য, পশুপাখি এবং প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্যের উপর। কিন্তু বাজি পোড়ানোর ফলে ঠিক কী কী ক্ষতি হয়?
মানুষের স্বাস্থ্যের উপর বাজির প্রভাব
১. শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের সমস্যা: বাজি পোড়ানোর সময় বাতাসে মিশে যায় PM2.5 ও PM10-এর মতো অতি সূক্ষ্ম কণা। শ্বাসের সঙ্গে এই কণাগুলি ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করতে পারে। ফলে কাশি, শ্বাসকষ্ট এবং হাঁপানির সমস্যা বাড়তে পারে। যাদের আগে থেকেই শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য এই ধোঁয়া বিশেষভাবে ক্ষতিকর।
২. চোখ ও ত্বকের সমস্যা: বাজির ধোঁয়া এবং রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে এলে চোখ জ্বালা, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং চোখ দিয়ে জল পড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি ত্বকে অ্যালার্জি ও চুলকানিও হতে পারে।
৩. শ্রবণশক্তির ক্ষতি: শব্দবাজির বিকট আওয়াজ কানের জন্য ক্ষতিকর। দীর্ঘক্ষণ অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে থাকলে কানে অস্বস্তি, কানে শব্দ হওয়া এবং শ্রবণশক্তির ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Dakat Kali: দক্ষিণ কলকাতার চেতলায় রয়েছে রহস্যে মোড়া প্রাচীন ডাকাত কালীবাড়ি। লোককথা অনুযায়ী, একসময় ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে এই মন্দিরে পুজো দিত দস্যুরা। লুটের সম্পদও নিবেদন করত দেবীর চরণে। কিন্তু কেন শিকলে বাঁধা রয়েছে দেবীমূর্তি? নীলু-ভুলু ডাকাতের কাহিনি থেকে সারদা দেবীর আগমন—জানুন এই মন্দিরের ইতিহাস।
৪. হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা: বায়ুদূষণের কারণে হৃদ্যন্ত্রের উপর চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে দূষিত বাতাসের প্রভাব গুরুতর হতে পারে।
৫. মানসিক চাপ ও ঘুমের সমস্যা: একটানা বাজির বিকট শব্দে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, অস্থিরতা ও মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। রাতে অতিরিক্ত শব্দের কারণে ঘুমের ব্যাঘাতও ঘটে।
৬. শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকি: শিশুদের ফুসফুস সম্পূর্ণ বিকশিত নয়। অন্যদিকে বয়স্কদের শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তুলনামূলক কম থাকে। তাই বাজির ধোঁয়া ও শব্দ তাদের বেশি সমস্যায় ফেলতে পারে।
পরিবেশের উপর বাজির প্রভাব
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Dhaka Kalibari: দেশভাগের পর বরিশাল থেকে কলকাতায় এসে নিজের শিকড়ের স্মৃতি ধরে রাখতে মন্দির গড়ে তুলেছিলেন ননীগোপাল চক্রবর্তী। দক্ষিণ কলকাতার প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের এই মন্দিরই আজ পরিচিত ঢাকা কালীবাড়ি নামে। মাটির প্রতিমা থেকে কষ্টিপাথরের বিগ্রহ, কালীপুজোর বিশেষ ভোগ—মন্দিরটির ইতিহাসে মিশে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস ও দেশভাগের স্মৃতি। কী ভাবে?
১. বায়ুদূষণ: বাজি পোড়ানোর ফলে বাতাসে সালফার ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড এবং বিভিন্ন ক্ষতিকারক সূক্ষ্ম কণা ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে বাতাসের গুণমান খারাপ হয়। উৎসবের সময় একসঙ্গে অনেক বাজি পোড়ালে দূষণের মাত্রা আরও বেড়ে যেতে পারে।
২. শব্দদূষণ: বাজির বিকট আওয়াজ পরিবেশের স্বাভাবিক শব্দের ভারসাম্য নষ্ট করে। অতিরিক্ত শব্দে শুধু মানুষ নয়, পশুপাখিরাও সমস্যায় পড়ে। বিশেষ করে পাখিরা আতঙ্কিত হয়ে বাসা ছেড়ে উড়ে যেতে পারে। কুকুর ও বিড়ালের মতো পোষ্য প্রাণীরাও ভয়ে অস্থির হয়ে পড়ে।
৩. মাটিদূষণ: বাজি পোড়ানোর পরে কাগজ, প্লাস্টিক, পোড়া বারুদ এবং বিভিন্ন রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ মাটিতে পড়ে থাকে। এই বর্জ্যের মধ্যে থাকা ক্ষতিকারক পদার্থ মাটির সঙ্গে মিশে তার স্বাভাবিক গুণমান নষ্ট করতে পারে। ফলে মাটির উপর নির্ভরশীল উদ্ভিদ ও অন্যান্য জীবের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
৪. জলদূষণ: বাজির পোড়া অংশ ও রাসায়নিক বর্জ্য বৃষ্টির জলের সঙ্গে মিশে পুকুর, নদী এবং অন্যান্য জলাশয়ে পৌঁছতে পারে। এর ফলে জল দূষিত হয়। জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীদের উপরও এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে।
৫. পশুপাখির ক্ষতি: বাজির ধোঁয়া ও শব্দ পশুপাখিদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করে। কুকুর, বিড়াল ও অন্যান্য প্রাণী আতঙ্কে কাঁপতে থাকে বা নিরাপদ আশ্রয় খোঁজে। অনেক সময় ভয়ে তারা পালিয়ে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকারও হয়। পাখিদের ক্ষেত্রেও বিকট শব্দ বিপদের কারণ হতে পারে।
৬. জলবায়ু পরিবর্তনে প্রভাব: বাজি পোড়ানোর ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইড-সহ বিভিন্ন গ্যাস নির্গত হয়। গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বাড়লে বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা আরও জটিল হতে পারে।
কীভাবে দূষণ কমানো সম্ভব?
উৎসবের আনন্দ বজায় রেখেও পরিবেশের ক্ষতি কমানো সম্ভব। তার জন্য বাজি পোড়ানো থেকে বিরত থাকা, বিশেষ করে শব্দবাজি এড়িয়ে চলা এবং পরিবেশবান্ধব উপায়ে উৎসব পালন করা জরুরি। বাজির বর্জ্য যত্রতত্র না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে। পাশাপাশি শিশু, বয়স্ক, অসুস্থ মানুষ এবং পশুপাখিদের ধোঁয়া ও শব্দ থেকে দূরে রাখতে হবে। উৎসবের আনন্দ কয়েক মুহূর্তের হলেও দূষণের ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। আলোর উৎসব পালন করতে গিয়ে যেন মানুষের স্বাস্থ্য, পশুপাখি ও পরিবেশের ক্ষতি না হয়, সে বিষয়ে প্রত্যেকের সচেতন হওয়া জরুরি।






