তৃণমূলের ‘যুব সাথী’ বনাম বিজেপির ‘ভরসা’: যুব নীতিতে আর কী কী বদল আনল নতুন বাজেট?
West Bengal Budget 2026: দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের পর রাজ্যে এসেছে ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন 'ডাবল ইঞ্জিন' সরকার। রাজ্যের প্রথম নিজেপি সরকারের অর্থমন্ত্রী ড. স্বপন দাশগুপ্ত ২২ জুন মেগা বাজেট পেশ করেছেন। এই বাজেটের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো কর্মসংস্থান ও যুবকল্যাণ।
দীর্ঘ দেড় দশকের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের পর রাজ্যে এসেছে ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন 'ডাবল ইঞ্জিন' সরকার। রাজ্যের প্রথম নিজেপি সরকারের অর্থমন্ত্রী ড. স্বপন দাশগুপ্ত ২২ জুন মেগা বাজেট পেশ করেছেন। এই বাজেটের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো কর্মসংস্থান ও যুবকল্যাণ।
‘চপ ভাজা’-র জমানা
নতুন বাজেটের কর্মসংস্থান নীতি বুঝতে গেলে বিগত বছরগুলিতে রাজ্যের কর্মসংস্থানের প্রকৃত সংকটটা কেমন ছিল, তা জানা প্রয়োজন। বাংলায় শিল্পায়ন ও বড় মাপের কর্মসংস্থানের সমস্যা নতুন নয়, এটি প্রায় ৫০-৬০ বছরের পুরনো রোগ। ১৯৬০-এর দশকে যে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পোন্নত রাজ্য ছিল, তা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ভুল নীতির কারণে ধীরে ধীরে পতনের দিকে এগিয়ে যায়।
বিশেষ করে ২০১১ সালের পর গত ১৫ বছরে রাজ্যে বড় কোনো শিল্প আসেনি। উল্টে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়েছে, হাজার হাজার কোম্পানি পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাদের রেজিস্ট্রেশন বা ব্যবসা গুটিয়ে ভিন রাজ্যে চলে গিয়েছে। এই দীর্ঘ মেয়াদে রাজ্যে সংগঠিত উৎপাদন ক্ষেত্রে নতুন কোনো কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। ফলে বাংলার লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতী পেটের টানে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে দক্ষিণ ভারত, গুজরাত বা মহারাষ্ট্রে পাড়ি দিতে বাধ্য হয়েছেন।
উচ্চশিক্ষিত ও যোগ্য যুবকদের জন্য এই স্থবিরতা আরও বেশি যন্ত্রণাদায়ক ছিল। সরকারি স্কুল-কলেজে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগ প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়েছিল। এই গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী যুবকদের উদ্দেশ্যে বলতেন—"চাকরি না পেলে মন খারাপ না করে চপ ভাজুন, ঘুঘনি বিক্রি করুন, চাইয়ের দোকান দিন।" সরকারি চাকরির স্বচ্ছ নিয়োগের অভাব এবং বেসরকারি ক্ষেত্রে বড় শিল্পের অনুপস্থিতির কারণে যুবকদের মধ্যে তীব্র হতাশা ও মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ১৭ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল।
যদিও পূর্বতন সরকার ২০২৬ সালের শুরুতে ‘যুব সাথী’ নামে একটি ভাতা প্রকল্প এনেছিল (যেখানে বেকারদের মাসে ১৫০০ টাকা করে ভাতা দেওয়ার কথা বলা হয়), কিন্তু তা চালুর মাত্র ১২ দিনের মধ্যে ৮৪ লক্ষেরও বেশি বেকার যুবক-যুবতী আবেদন করেন। এই বিশাল আবেদনের সংখ্যাই প্রমাণ করে দিয়েছিল, বাংলায় যুব বেকারত্ব কতখানি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। স্রেফ একটা সামান্য ভাতা দিয়ে এই বিপুল যুববাহিনীর কর্মহীনতার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান করা সম্ভব ছিল না, কারণ যুবকরা দয়া বা ভাতা নয়, মর্যাদা ও কর্মসংস্থান চেয়েছিল।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal Budget 2026-27: দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজ্যে নবগঠিত ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন প্রথম 'ডাবল ইঞ্জিন' সরকারের ভারপ্রাপ্ত অর্থমন্ত্রী ড. স্বপন দাশগুপ্ত বাজেট পেশ করেছেন। কিন্তু এই দেড় দশকের শাসক তৃণমূল সরকারের পূর্বতন ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের বাজেটের সঙ্গে রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেটের পার্থক্য ঠিক কী কী?
২. ‘ভাতা’ নয়, ‘মর্যাদা ও কাজ’
২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের নতুন বাজেটে এই মানসিকতা সম্পূর্ণ বদলে দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী ড. স্বপন দাশগুপ্ত তাঁর বাজেট বক্তৃতায় স্পষ্ট করেছেন, নতুন সরকারের লক্ষ্য কেবল কিছু ভাতা দেওয়া নয়, বরং গভীর কাঠামোগত রূপান্তর। যুবকদের জন্য প্রকৃত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বন্ধ নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু এবং মেধার যোগ্য মর্যাদা দেওয়াই নতুন ডাবল ইঞ্জিন সরকারের মূল নীতি।
১ লক্ষ সরকারি চাকরি ও শূন্যপদ পূরণ
রাজ্যের বেকার যুবকদের জন্য সবচেয়ে বড় সুখবর এনে অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন যে, রাজ্য সরকার বিভিন্ন অফিস ও বিভাগে খালি পড়ে থাকা ১ লক্ষ শূন্যপদ দ্রুত পূরণ করবে। এই শূন্যপদগুলির একটি বড় অংশ নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।
শিক্ষা বিভাগ (শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী): স্কুল-কলেজের কর্মী সংকট মেটাতে ৫০,০০০ শিক্ষক, অধ্যাপক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগ করা হবে।
পুলিশ বিভাগ: রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিকাঠামো মজবুত করতে ২০,০০০ শূন্যপদ পূরণ করা হবে।
ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলস: এই বিভাগে ১,০০০ শূন্যপদ পূরণ করা হবে।
অন্যান্য বিভাগ: বাকি শূন্যপদগুলি রাজ্য সরকারের অন্যান্য দপ্তরে পূরণ করা হবে।
মহিলা সংরক্ষণ: সামগ্রিক শূন্যপদগুলির মধ্যে ৩৩ শতাংশ পদ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।
ইউপিএসসি (UPSC) মডেলে স্বচ্ছ নিয়োগ
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal Budget 2026: অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, রাজ্যের আগের সমস্ত সামাজিক প্রকল্পগুলি অব্যাহত বা চালু থাকবে, তবে সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া এবং দুর্বল শ্রেণি যাতে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পায়, এই বাজেটে সেদিকেই বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
আগের জমানায় নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে যুবকদের মনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রাতিষ্ঠানিক অনাস্থা তৈরি হয়েছিল। নতুন বাজেটে সেই ক্ষতে প্রলেপ দিতে বড় ঘোষণা করা হয়েছে। এবার থেকে রাজ্যের সব নিয়োগকারী সংস্থাকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার স্বার্থে ইউপিএসসি (UPSC) মডেলে একটি নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা হচ্ছে।
বয়সের ঊর্ধ্বসীমায় ৫ বছরের ছাড়
বিগত বছরগুলিতে নিয়োগ বন্ধ থাকায় বহু চাকরিপ্রার্থীর বয়স পার হয়ে গিয়েছিল। তাঁদের কথা মাথায় রেখে নতুন বিজেপি সরকার সরকারি চাকরির আবেদনের সর্বোচ্চ বয়সের সীমায় ৫ বছর ছাড় দিয়েছে। এই বিশেষ সুবিধা আগামী ২ বছরের জন্য বহাল থাকবে, যাতে বঞ্চিত যুবকরা পরীক্ষায় বসার সুযোগ পান।
চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বিনামূল্যে কোচিং ও ৩০,০০০ টাকা সাহায্য
সরকারি চাকরির পরীক্ষা বা সর্বভারতীয় স্তরের পরীক্ষার প্রস্তুতির খরচ অনেক। নতুন বাজেটে ঘোষণা করা হয়েছে, যেসব ছাত্র-ছাত্রী প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাঁদের রাজ্য সরকার এককালীন ৩০,০০০ টাকা আর্থিক সাহায্য দেবে। এর পাশাপাশি আইআইটি (IIT), জেইই (JEE), নিট (NEET), ক্যাট (CAT), সিএ (CA) এবং সিভিল সার্ভিস (UPSC) পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য রাজ্যের প্রতিটি জেলায় তৈরি হবে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সরকারি 'স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার' ও কোচিং সেন্টার।
অক্টোবর থেকে ‘ভরসা’ প্রকল্প
যারা উচ্চশিক্ষা শেষ করে চাকরির জন্য অপেক্ষা করছেন, সেই ২১ থেকে ৪৫ বছর বয়সি যোগ্য ও শিক্ষিত বেকার যুবকদের জন্য আগামী অক্টোবর থেকে চালু হচ্ছে ‘ভরসা’ কর্মসূচি।
যে সব পরিবারের মাসিক আয় ১ লক্ষ টাকার কম এবং যাঁরা অন্য কোনো সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন না, তাঁরা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন।
স্নাতক (Graduate) বেকার যুবকরা পাবেন প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা ভাতা।
অন্যান্য শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন বেকারদের জন্য মাসিক ভাতার পরিমাণ হবে ২,০০০ টাকা।
পূর্বতন জমানার স্রেফ ভাতার ধারণার চেয়ে এটি আলাদা, কারণ এর পাশাপাশি যুবকদের স্কিল ডেভেলপমেন্ট বা দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
ভারী শিল্প ও পরিকাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি কাজের সুযোগ
তৃণমূল কংগ্রেসের ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের বাজেটে বড় শিল্প বা উৎপাদন ক্ষেত্রে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছিল না। কিন্তু নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেটে বড় শিল্প তৈরি করে স্থায়ী কর্মসংস্থানের উপর জোর দেওয়া হয়েছে:
নতুন গভীর সমুদ্র বন্দর ও লজিস্টিক হাব: পূর্ব মেদিনীপুরের দাদনপাত্রবাড়ে পিপিপি (PPP) মডেলে একটি নতুন গভীর সমুদ্র বন্দর গড়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা এই অঞ্চলে হাজার হাজার যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। এছাড়া ডানকুনিতে 'মাল্টি-মোডাল লজিস্টিক হাব' এবং 'ডানকুনি-সুরাট ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডোর' তৈরির মাধ্যমে পরিবহণ ও লজিস্টিক ক্ষেত্রে কাজের নতুন দরজা খুলে দেওয়া হচ্ছে।
শিলিগুড়ি, দুর্গাপুর ও আসানসোলে মেট্রো: এই বড় শহরগুলিতে মেট্রো রেলের বিস্তার এবং কল্যাণীর কাছে একটি নতুন দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর গড়ার প্রাথমিক কাজ শুরু হচ্ছে, যা নির্মাণ ও পরিষেবা ক্ষেত্রে বিপুল কর্মসংস্থান আনবে।
সিন্ডিকেট রাজের অবসান: ব্যবসা সহজ করতে ১০০ কোটি টাকা বা তার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সিঙ্গল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্সের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, কারখানায় বা ব্যবসায় জোর করে টাকা আদায় করা বা ‘সিন্ডিকেট রাজ’ বন্ধ করতে সরকার নতুন কড়া আইন আনছে, যাতে বড় কোম্পানিগুলি নির্ভয়ে বাংলায় বিনিয়োগ করতে পারে এবং বাংলার যুবকদের চপ ভাজার বদলে মর্যাদাপূর্ণ চাকরি দিতে পারে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেটটি পশ্চিমবঙ্গের বেকার যুবক-যুবতীদের মেধা ও যোগ্যতার মর্যাদা কিছুটা ফিরিয়ে দেওয়ার এক ব্লু-প্রিন্ট। যুবকদের কেবল ‘চপ ভাজা’র স্তোকবাক্য বা নামমাত্র ভাতার উপর নির্ভরশীল না রেখে—স্বচ্ছ সরকারি নিয়োগ, সর্বভারতীয় স্তরের পরীক্ষার জন্য ফ্রি কোচিং এবং রাজ্যজুড়ে ভারী শিল্প ও পরিকাঠামো পরিকাঠামোর প্রসারের মাধ্যমে বাংলায় কর্মসংস্থানের ঘোষণা করা হয়েছে।






