সুপ্রিম সওয়াল থেকে বাজেটে চমক, ভোটের আগে একের পর এক মাস্টারস্ট্রোক মমতার
Bengal interim budget 2026: রাজ্যের স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের আওতায় এবার গিগ কর্মীদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হবে। শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুই ময়দানেই একযোগে আক্রমণাত্মক অবস্থান নিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একদিকে SIR মামলায় নিজে সুপ্রিম কোর্টে হাজির হয়ে নজিরবিহীন সওয়াল, অন্যদিকে তার পরদিনই রাজ্য বিধানসভায় অন্তর্বর্তী বাজেটে একের পর এক জনকল্যাণমুখী ঘোষণা— রাজনৈতিক মহলের একাংশ এই ধারাবাহিকতাকে স্পষ্টভাবে ‘মাস্টারস্ট্রোক’ হিসেবেই দেখছে।
বিধানসভায় বাজেট পেশের আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের উন্নয়ন নিয়ে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, বাংলার উন্নয়ন নিয়ে রাজ্য সরকার গর্বিত। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে আটকে থাকা ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের জন্য রাজ্য সরকার দেড় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করে কাজ শুরু করেছে এবং ইতোমধ্যেই প্রায় ৩০০ কোটি টাকার কাজ হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, রাজ্যের থেকে টাকা তুলে সেটাই ফেরত দেওয়া হয়।
মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, রাজ্যে মোট ২ লক্ষ ২০ হাজার কিলোমিটার রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি কেন্দ্রকে কটাক্ষ করে বলেন, গান্ধীজির নামে থাকা প্রকল্প পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধীদেরও কড়া বার্তা দেন। শুভেন্দু অধিকারীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, বাংলা দখলের কথা ভাববেন না। দিল্লি নিয়েই নাজেহাল অবস্থা। ডাবল ইঞ্জিন সরকারের কী অবস্থা দেখা যাচ্ছে। বিরোধী শিবিরকে ‘জিরো’ আখ্যা দিয়ে তিনি চ্যালেঞ্জ করেন, আগামী দিনে তারা অনেক আসন হারাতে চলেছে।
দীর্ঘ তর্ক-বিতর্কের পর দুপুর আড়াইটায় রাজ্যের অন্তর্বর্তী বাজেট পেশ করা শুরু করেন অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্য সরকার ৪ লক্ষ ৬ হাজার কোটি টাকার অন্তর্বর্তী বাজেট পেশ করল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাজেটের মূল লক্ষ্য করা হয়েছে, রাজ্যের বড় ভোটব্যাঙ্কগুলিকে খুশি করা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Mamata Bandyopadhyay: সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের স্বার্থে নয়, মানুষের অধিকার রক্ষার তাগিদে তিনি এসেছেন।
বাজেটের মূল ঘোষণাগুলি একনজরে:
সরকারি কর্মচারীদের জন্য জোড়া উপহার: অন্তর্বর্তী বাজেটে (ভোট অন অ্যাকাউন্টে) রাজ্য সরকারি কর্মীদের জন্য বড় চমক। অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, রাজ্যে সপ্তম বেতন কমিশন (7th Pay Commission) গঠন করা হবে। পাশাপাশি, মহার্ঘ ভাতা (DA) আরও ৪ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে ডিএ ১৮ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়াল ২২ শতাংশে, যা আগামী ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে।
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার: মাসিক ভাতা ৫০০ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই কার্যকর হবে। এর জন্য বরাদ্দ ১৫ হাজার কোটি টাকা।
কর্মচারীদের ডিএ: রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য ৪ শতাংশ ডিএ বৃদ্ধির ঘোষণা। উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবারই সুপ্রিম কোর্ট বকেয়া ২৫% ডিএ মেটানোর নির্দেশ দিয়েছে এবং বাকি ৭৫% বকেয়া নিয়ে একটি নতুন কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Budget 2026: বাজেটে বিহার বা অন্ধ্রপ্রদেশের মতো জোট শরিকদের রাজ্যগুলি গত কয়েক বছরে যে গুরুত্ব পেয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ কি তার তুলনায় পিছিয়ে?
স্বাস্থ্য ও অঙ্গনওয়াড়ি: আশা ও অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের আংশিক সুরাহা হয়েছে। আশা এবং অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়কদের মাসিক ভাতা ১০০০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের মৃত্যুতে পরিবারের জন্য ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের ঘোষণা করা হয়েছে, যার জন্য বাজেটে ২৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।।
নতুন প্রকল্প ‘বাংলার যুব সাথী’: বাজেটের অন্যতম বড় চমক এই প্রকল্প। ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সী মাধ্যমিক পাশ বেকার যুবক-যুবতীরা ১৫ অগাস্ট থেকে মাসিক ১৫০০ টাকা করে ভাতা পাবেন (সর্বোচ্চ ৫ বছর)।
অন্যান্য: সিভিক ভলান্টিয়ার, গ্রিন পুলিশ এবং শিক্ষাবন্ধুদের ভাতাও ১০০০ টাকা করে বৃদ্ধি করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসাথীর আওতায় এবার গিগ কর্মীদেরও (Gig Workers) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বাজেটে আরও ঘোষণা করা হয়, রাজ্যের স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের আওতায় এবার গিগ কর্মীদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হবে। শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়। বারুইপুরে একটি ‘কালচারাল সিটি’ গড়ে তোলার ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি রাজ্যে ছ’টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক করিডোর তৈরি হবে এবং ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পের জন্য পাঁচটি নতুন ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও বাজেটে জানানো হয়েছে।
সুপ্রিম সওয়াল থেকে বাজেট: মমতার দ্বিমুখী রাজনৈতিক কৌশল
SIR মামলায় নিজে সুপ্রিম কোর্টে হাজির হয়ে সওয়াল করা মুখ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক জীবনে যেমন নজিরবিহীন, তেমনই তা সাধারণ মানুষের মধ্যে এক শক্ত বার্তা দিয়েছে। ভোটার তালিকা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা পশ্চিমবঙ্গবাসীর ক্ষোভ ও উদ্বেগকে তিনি নিজের লড়াই হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছেন বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। বাংলার মানুষের পাশে মমতা, যেন এই ন্যারেটিভ আরও শক্ত করেছে তাঁর এই পদক্ষেপ।
তার পরদিনই বাজেটে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে ভাতা বৃদ্ধি, ডিএ বৃদ্ধি এবং বেকার যুবকদের জন্য নতুন প্রকল্প— সব মিলিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে ২০২৬-এর আগে জনকল্যাণ ও রাজনৈতিক লড়াইকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলছেন, তা এখন আর গোপন নয়।
সুপ্রিম কোর্টে সাংবিধানিক লড়াই এবং বিধানসভায় জনকল্যাণমূলক বাজেট— এই দুইয়ের সমন্বয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে আবারও আন্দোলনের নেত্রী ও শাসকের ভূমিকায় একসঙ্গে তুলে ধরছেন। তবে, ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে এই কৌশল কতটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন রাজ্য রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।





