কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬: মধ্যবিত্তের পকেটে স্বস্তি, কিন্তু বাংলার ভাঁড়ারে কি শুধুই প্রতিশ্রুতি?
Budget 2026: বাজেটে বিহার বা অন্ধ্রপ্রদেশের মতো জোট শরিকদের রাজ্যগুলি গত কয়েক বছরে যে গুরুত্ব পেয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ কি তার তুলনায় পিছিয়ে?
অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ সম্প্রতি সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেট পেশ করেন। ২০২৪-এর নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে এটি মোদি সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পূর্ণাঙ্গ বাজেট। বাজেটের সবচেয়ে বড় চমক নিঃসন্দেহে আয়করের আমূল পরিবর্তন, যা মধ্যবিত্তের মুখে চওড়া হাসি ফুটিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, 'ইন্ডিয়া' জোটের অন্যতম শরিক এবং রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ এই বাজেট থেকে আসলে কী পেল? এটি কি শুধুই একটি চিত্তাকর্ষক বাজেট, নাকি এতে বাংলার কাঠামোগত উন্নয়নের রসদ আছে?
১. সাধারণ মানুষ ও মধ্যবিত্তের প্রাপ্তি
পশ্চিমবঙ্গের এক বিরাট অংশ চাকুরিজীবী মধ্যবিত্ত। তাদের জন্য এই বাজেট নিঃসন্দেহে স্বস্তির।
করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি: নতুন কর কাঠামোয় (New Tax Regime) বার্ষিক ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয়ে আর কোনো আয়কর দিতে হবে না। আগে এই সীমা ছিল ৭ লক্ষ টাকা। এর ফলে রাজ্যের সরকারি ও বেসরকারি চাকুরিজীবীদের হাতে খরচের জন্য অনেকটা বাড়তি টাকা থাকবে।
স্ল্যাবের পরিবর্তন: ৪ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয়ে শূন্য কর, ৪-৮ লক্ষে ৫%, এবং ৮-১২ লক্ষে ১০% করের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এতে নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলি মুদ্রাস্ফীতির বাজারে একটু অক্সিজেন পাবে।
২. পশ্চিমবঙ্গের পরিকাঠামো: লাভ কতটা?
রেল এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় পশ্চিমবঙ্গ কিছু সুনির্দিষ্ট প্রকল্প পেয়েছে, যা রাজ্যের উত্তর ও দক্ষিণ—উভয় প্রান্তকেই ছুঁয়ে গেছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
National Voters Day: ঐ বিল ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসের ২৩ তারিখ আনার এক সপ্তাহের মধ্যে রাষ্ট্রপতি তাতে সই করেন। অনেকের হয়তো মনে নেই, ঐ শীতকালীন অধিবেশনেই প্রায় সমস্ত বিরোধী সাংসদকে বহিষ্কার করে বিলটি আনা হয়েছিল।
কলকাতা মেট্রো (Kolkata Metro): জোকা-বিবাদী বাগ এবং নিউ গড়িয়া-বিমানবন্দর রুটের কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য বাজেটে ২,৫০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ২০২৬-এর শেষেই যাতে সম্পূর্ণ পরিষেবা চালু করা যায়, সেটাই লক্ষ্য।
চা বাগানের জন্য প্যাকেজ: উত্তরবঙ্গের চা শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবির কথা মাথায় রেখে চা বাগানের নারী ও শিশুদের কল্যাণমূলক প্রকল্পের জন্য ১,০০০ কোটি টাকার তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে। ডুয়ার্স ও তরাই অঞ্চলের শ্রমিকদের জন্য এটি কিছুটা স্বস্তির।
পাট শিল্পের (Jute) পুনরুজ্জীবন: পাট চাষিদের জন্য 'পিএম আশা' (PM-AASHA) প্রকল্পের আওতায় পাটের এমএসপি (MSP) বাড়ানোর ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। হুগলি ও উত্তর ২৪ পরগনার বন্ধ চটকলগুলোর আধুনিকীকরণে বিশেষ ঋণের সুবিধার কথাও বলা হয়েছে।
বারাণসী-শিলিগুড়ি হাই স্পিড করিডর: বাজেটের অন্যতম বড় ঘোষণা হলো ৭টি নতুন হাই-স্পিড রেল করিডর, যার মধ্যে একটি বারাণসী থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি উত্তরবঙ্গের পর্যটন এবং ব্যবসায়িক পরিবহণে 'গেম চেঞ্জার' হতে পারে।
চিকেন’স নেক করিডর: শিলিগুড়ি তথা উত্তরবঙ্গের কৌশলগত গুরুত্বের কথা মাথায় রেখে 'চিকেন’স নেক' এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে প্রায় ১৪,০০০ কোটি টাকার বরাদ্দের ইঙ্গিত রয়েছে, যা জাতীয় নিরাপত্তার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিকেও চাঙ্গা করবে।
৩. পশ্চিমবঙ্গের ক্ষতি ও বঞ্চনার খতিয়ান
প্রাপ্তির তালিকার পাশাপাশি ‘না পাওয়ার’ তালিকাটিও দীর্ঘ, যা রাজ্য সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Ajit Pawar: বিমান দুর্ঘটনায় অজিত পাওয়ারের মৃত্যু ঘিরে উঠছে প্রশ্ন, এটা কি নিছকই দুর্ঘটনা নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে গভীর কোনো ষড়যন্ত্র?
১০০ দিনের কাজ ও আবাস যোজনা: রাজ্যের সবথেকে বড় অভিযোগ ছিল ১০০ দিনের কাজ (MGNREGA) এবং আবাস যোজনার বকেয়া টাকা নিয়ে। এই বাজেটেও সেই জট খোলার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। বকেয়া মেটানোর কোনো 'স্পেশাল প্যাকেজ' ঘোষণা না হওয়ায় রাজ্যের গ্রামীণ অর্থনীতির সংকট এখনই কাটছে না।
বন্যা নিয়ন্ত্রণ (ঘাটাল ও তিস্তা): ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান বা তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে সরাসরি কোনো অর্থ বরাদ্দ করা হয়নি। প্রতি বর্ষায় মেদিনীপুর ও উত্তরবঙ্গ যে বন্যায় ভাসে, তার স্থায়ী সমাধানের কোনো দিশা এই বাজেটে নেই।
হলদিয়া পেট্রোকেম ও বন্দরের ভবিষ্যৎ: হলদিয়া বন্দরের নাব্যতা বাড়াতে বা পেট্রোকেম শিল্পের জন্য কোনো বিশেষ ছাড়ের ঘোষণা নেই, যা রাজ্যের শিল্পমহলকে হতাশ করেছে।
বনগাঁ ও নদিয়ার নতুন রেল প্রকল্প: ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের কথা মাথায় রেখে উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়ায় ৪টি নতুন রেল লাইন প্রকল্পের অনুমোদন মিলেছে (বনগাঁ-পোড়ামহেশতলা, বনগাঁ-চাঁদাবাজার ইত্যাদি)। এটি স্থানীয় নিত্যযাত্রী এবং কৃষিপণ্যের পরিবহণে বড় লাভ দেবে।
শিল্পায়নে নির্দিষ্ট দিশার অভাব: বিহার বা অন্ধ্রপ্রদেশের মতো কোনো বিশেষ ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডর বা প্যাকেজ বাংলার জন্য ঘোষণা করা হয়নি। অমৃতসরের মতো ফ্রেট করিডরের সুবিধা বাংলা কতটা পাবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বাজেটের এই ঘোষণার পর কিছু প্রশ্ন উঠে আসছে:
১: কর ছাড় কি মুদ্রাস্ফীতির ক্ষতে প্রলেপ দিতে পারবে?
১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত কর ছাড় নিঃসন্দেহে বড় খবর। কিন্তু চাল, ডাল, তেল ও ওষুধের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে হাতে আসা বাড়তি টাকা কি সঞ্চয় হবে, নাকি দৈনন্দিন বাজার খরচেই বেরিয়ে যাবে?
২: ‘কর্মসংস্থান’ শব্দটা কি শুধু ভাষণেই সীমাবদ্ধ?
কর ছাড় দিয়ে মানুষের হাতে টাকা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু রাজ্যের শিক্ষিত বেকার যুবকদের জন্য নতুন চাকরির সুযোগ তৈরির মতো কোনো বড় 'ম্যানুফ্যাকচারিং হাব' বা শিল্প ঘোষণা কি বাজেটে আছে? স্টার্ট-আপের বরাদ্দ বাড়লেও, তার সুফল বাংলার মফস্বলে পৌঁছাতে কত বছর লাগবে?
২: রাজনৈতিক সমীকরণই কি বরাদ্দের মাপকাঠি?
বাজেটে বিহার বা অন্ধ্রপ্রদেশের মতো জোট শরিকদের রাজ্যগুলি গত কয়েক বছরে যে গুরুত্ব পেয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ কি তার তুলনায় পিছিয়ে? কৌশলগত রেল প্রকল্প ছাড়া রাজ্যের নিজস্ব উন্নয়নের (যেমন—গঙ্গা ভাঙন রোধ বা চা বাগানের উন্নয়ন) জন্য বরাদ্দ কোথায়?
২০২৬-এর বাজেটকে পশ্চিমবঙ্গের পরিপ্রেক্ষিতে "মিশ্র অনুভূতির বাজেট" বলা চলে। যাঁরা শহুরে মধ্যবিত্ত, মাসের শেষে নির্দিষ্ট বেতন পান—তাঁদের জন্য আজ উৎসবের দিন। কিন্তু যাঁরা চা বাগানের অস্থায়ী শ্রমিক কিংবা সুন্দরবনের বাঁধের দিকে তাকিয়ে থাকা মানুষ—তাঁদের জন্য এই বাজেটে বড় কোনো আশার আলো নেই। এক কথায়, মধ্যবিত্তের মন জয় ও উত্তরে কিছুটা নজর দিলেও, বাংলার সামগ্রিক বা কাঠামোগত উন্নয়নের প্রশ্নে এই বাজেট আরও একবার অনেক প্রশ্নচিহ্ন রেখে গেল।






