মমতার সুপ্রিম সওয়াল, নির্বাচনের আগে বড় মাস্টারস্ট্রোক মুখ্যমন্ত্রীর?

​Mamata Bandyopadhyay: সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের স্বার্থে নয়, মানুষের অধিকার রক্ষার তাগিদে তিনি এসেছেন।

inscript
৪ মিনিট
মমতার সুপ্রিম সওয়াল, নির্বাচনের আগে বড় মাস্টারস্ট্রোক মুখ্যমন্ত্রীর?

টানা তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী, প্রায় ১৫ বছর পশ্চিমবঙ্গের শাসনক্ষমতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবু যেন তিনি আজও পুরোদস্তুর বিরোধী নেত্রী। নির্বাচন এলেই সেই চেনা মেজাজেই ধরা দেন তৃণমূল সুপ্রিমো। এবার ভোটার তালিকা সংশোধন বা SIR সংক্রান্ত আন্দোলন দিল্লি পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে তিনি আরও একবার বুঝিয়ে দিলেন, মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকা রাজনীতিবিদ তিনি। এই সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্টে নিজেই সওয়াল করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। যদিও তাঁর হয়ে মূল মামলাটি লড়ছিলেন বিশিষ্ট আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান, তবু আইনজীবীর সওয়ালের পাশাপাশি বাংলায় ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে সাধারণ মানুষের হয়রানির কথা শীর্ষ আদালতে নিজেই তুলে ধরার আর্জি জানান মমতা। তিনি পাঁচ মিনিট সময় চান। প্রধান বিচারপতি তখন বলেন,

“৫ মিনিট কেন? আপনি ১৫ মিনিট বলতে পারেন, তাতে অসুবিধে নেই। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মামলায় তো আইনজীবীরাই সওয়াল করছেন।”

​সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের স্বার্থে নয়, মানুষের অধিকার রক্ষার তাগিদে তিনি এসেছেন। অভিযোগ করেন, এই সমীক্ষা প্রক্রিয়াটি মূলত নাম বাদ দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বিয়ের পর মেয়েরা শ্বশুরবাড়ির পদবি ব্যবহার করলেই তথ্যের গরমিল বা ‘মিসম্যাচ’ ধরা হচ্ছে। এমনকি অনেক জীবিত মানুষকেও মৃত দেখিয়ে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নীতির প্রশ্নে বামপন্থা কি আপসের পথে?

Salim-Humayun:জোট করা তো অনেক বড় বিষয়, এমন ব্যক্তিত্বের সঙ্গে বৈঠক করতে গেলেনই বা কেন মহম্মদ সেলিম?

​শীর্ষ আদালতের উদ্দেশ্যে তিনি আরও বলেন, শুধু পশ্চিমবঙ্গকে নিশানা করা হচ্ছে। দীর্ঘ ২৪ বছর পর এই বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া (SIR) হচ্ছে, অথচ মাত্র ৩ মাসে কেন কাজ শেষ করার এত তাড়াহুড়ো? তিনি জানান, এই প্রক্রিয়ায় ১০০-র বেশি মানুষ মারা গিয়েছেন, বহু বিএলও (BLO) অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ইআরও (ERO)-দের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তাঁর বিস্ফোরক অভিযোগ, বিজেপিশাসিত রাজ্য থেকে প্রায় ৮,৩০০ মাইক্রো-অবজার্ভার এনে অফিসে বসিয়ে ইচ্ছেমতো নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে এবং নতুন ভোটারদের ফর্ম-৬ জমা দিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।

​হয়তো সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী খুব নতুন কোনো কথা বলেননি; অন্যান্য বিজেপি-বিরোধী দলগুলো আগেই এসব অভিযোগ তুলেছে। কিন্তু তবুও কেন তিনি চর্চায়? কারণ, ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো মুখ্যমন্ত্রী নিজে সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে সওয়াল করলেন। রীতিমতো নজির গড়লেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর এর সঙ্গেই মানুষের আবেগ বুঝে রাজনৈতিক ময়দানেও উত্তীর্ণ হলেন তিনি। সাধারণ মানুষ যখন এই সংশোধনী প্রক্রিয়ার শুনানির লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে বিরক্ত, নাম বাদ যাওয়ার আশঙ্কায় চিন্তিত, এবং মতুয়ারা যখন আরও একবার দেশছাড়া হওয়ার ভয়ে সিঁটিয়ে রয়েছেন—ঠিক সেই সময়েই ‘ত্রাতা’ বা ‘মসিহা’ রূপে মানুষের সামনে দাঁড়ালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

​মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই পুরো ভূমিকাকে অবশ্য ‘নাটক’ বলেই কটাক্ষ করছেন বিরোধীরা। বিজেপি নেতা সুকান্ত মজুমদার বলেন,

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাজেট ২০২৬: লাভবান আম্বানি-আদানি! বঞ্চিত সাধারণ মানুষ?

Budget 2026: অর্থমন্ত্রী এমন কোনো বড় ঘোষণা দেননি যা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াবে, নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি করবে, ট্যাক্স বা রাজস্ব আদায় বাড়াবে কিংবা ঋণের বোঝা কমাবে।

এসবই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাটক। ক্যামেরাকে নিজের দিকে টানার চেষ্টা। আমরা সারা বছর দেখি, এবার দিল্লির লোকজনও দেখুক।

​অন্যদিকে সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী মমতার এই পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন,

৭ তারিখে শুনানি শেষ, সম্ভবত ১৪ তারিখ ফাইনাল লিস্ট বেরোবে। তার ঠিক আগে তিনি সুপ্রিম কোর্টে গেলেন! নভেম্বর, ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে গেলেন না কেন? আমরা সবাই এই প্রক্রিয়ার ত্রুটির বিরুদ্ধে, কিন্তু ওনার আচরণের কোনো মানে হয় না। কেরল সরকার যখন কোর্টে গিয়েছিল, তখন তো তিনি যাননি। এখন হঠাৎ একটা নাটকীয়তা তৈরি করছেন।

​তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে বড় আন্দোলন গড়ার সুযোগ তৃণমূল ছাড়া অন্যান্য অবিজেপি বিরোধী দলরাও পেয়েছিল, কিন্তু তারা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ। বিশ্লেষক মানসারুল হক ইনস্ক্রিপ্টকে বলেন,

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানো তো দূর, তাঁকে কোনো আসনে চ্যালেঞ্জ জানাতে হলে তিনি কী পদক্ষেপ নেবেন, সেটা বিরোধীদের আগে থেকেই আঁচ করতে হবে। মমতা কোনো ‘পলিটিক্যাল স্পেস’-এ ঢোকার আগেই সেই জায়গাটি দখল করে, শক্তিশালী কাউন্টার ন্যারেটিভ তৈরি করতে হবে যা জনগণের সঙ্গে সংযোগ ঘটাবে। নাহলে বিরোধীদের ব্যর্থতার সুযোগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অপরাজেয়ই থাকবেন।

​সামনেই ২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন। সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করে মানুষের আবেগ কি আবারও নিজের দিকে টেনে নিলেন মুখ্যমন্ত্রী? আরও একবার নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করে ফেললেন? আসন্ন নির্বাচনে ‘বাঙালি অস্মিতা’ কাজে লাগিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোট বৈতরণী পার করতে পারেন বলে আগেই মনে করা হচ্ছিল। তার ওপর ভোটার তালিকা ইস্যুতে যেভাবে এই আন্দোলন দিল্লি পর্যন্ত নিয়ে গেলেন, তাতে শাসক হয়েও নিজেকে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি বা ‘বিরোধী’ মেজাজে প্রতিষ্ঠিত করলেন মমতা। এই লড়াই যেন এখন দিল্লি বনাম বাংলার লড়াই।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই আপত্তি, ১০ মাসে দুই কমিশনারের ১৪ বার প্রশ্ন

Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।