মমতার সুপ্রিম সওয়াল, নির্বাচনের আগে বড় মাস্টারস্ট্রোক মুখ্যমন্ত্রীর?
Mamata Bandyopadhyay: সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের স্বার্থে নয়, মানুষের অধিকার রক্ষার তাগিদে তিনি এসেছেন।
টানা তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী, প্রায় ১৫ বছর পশ্চিমবঙ্গের শাসনক্ষমতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবু যেন তিনি আজও পুরোদস্তুর বিরোধী নেত্রী। নির্বাচন এলেই সেই চেনা মেজাজেই ধরা দেন তৃণমূল সুপ্রিমো। এবার ভোটার তালিকা সংশোধন বা SIR সংক্রান্ত আন্দোলন দিল্লি পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে তিনি আরও একবার বুঝিয়ে দিলেন, মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকা রাজনীতিবিদ তিনি। এই সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্টে নিজেই সওয়াল করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। যদিও তাঁর হয়ে মূল মামলাটি লড়ছিলেন বিশিষ্ট আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান, তবু আইনজীবীর সওয়ালের পাশাপাশি বাংলায় ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে সাধারণ মানুষের হয়রানির কথা শীর্ষ আদালতে নিজেই তুলে ধরার আর্জি জানান মমতা। তিনি পাঁচ মিনিট সময় চান। প্রধান বিচারপতি তখন বলেন,
“৫ মিনিট কেন? আপনি ১৫ মিনিট বলতে পারেন, তাতে অসুবিধে নেই। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মামলায় তো আইনজীবীরাই সওয়াল করছেন।”
সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের স্বার্থে নয়, মানুষের অধিকার রক্ষার তাগিদে তিনি এসেছেন। অভিযোগ করেন, এই সমীক্ষা প্রক্রিয়াটি মূলত নাম বাদ দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বিয়ের পর মেয়েরা শ্বশুরবাড়ির পদবি ব্যবহার করলেই তথ্যের গরমিল বা ‘মিসম্যাচ’ ধরা হচ্ছে। এমনকি অনেক জীবিত মানুষকেও মৃত দেখিয়ে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Salim-Humayun:জোট করা তো অনেক বড় বিষয়, এমন ব্যক্তিত্বের সঙ্গে বৈঠক করতে গেলেনই বা কেন মহম্মদ সেলিম?
শীর্ষ আদালতের উদ্দেশ্যে তিনি আরও বলেন, শুধু পশ্চিমবঙ্গকে নিশানা করা হচ্ছে। দীর্ঘ ২৪ বছর পর এই বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া (SIR) হচ্ছে, অথচ মাত্র ৩ মাসে কেন কাজ শেষ করার এত তাড়াহুড়ো? তিনি জানান, এই প্রক্রিয়ায় ১০০-র বেশি মানুষ মারা গিয়েছেন, বহু বিএলও (BLO) অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ইআরও (ERO)-দের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তাঁর বিস্ফোরক অভিযোগ, বিজেপিশাসিত রাজ্য থেকে প্রায় ৮,৩০০ মাইক্রো-অবজার্ভার এনে অফিসে বসিয়ে ইচ্ছেমতো নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে এবং নতুন ভোটারদের ফর্ম-৬ জমা দিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।
হয়তো সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী খুব নতুন কোনো কথা বলেননি; অন্যান্য বিজেপি-বিরোধী দলগুলো আগেই এসব অভিযোগ তুলেছে। কিন্তু তবুও কেন তিনি চর্চায়? কারণ, ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো মুখ্যমন্ত্রী নিজে সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে সওয়াল করলেন। রীতিমতো নজির গড়লেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর এর সঙ্গেই মানুষের আবেগ বুঝে রাজনৈতিক ময়দানেও উত্তীর্ণ হলেন তিনি। সাধারণ মানুষ যখন এই সংশোধনী প্রক্রিয়ার শুনানির লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে বিরক্ত, নাম বাদ যাওয়ার আশঙ্কায় চিন্তিত, এবং মতুয়ারা যখন আরও একবার দেশছাড়া হওয়ার ভয়ে সিঁটিয়ে রয়েছেন—ঠিক সেই সময়েই ‘ত্রাতা’ বা ‘মসিহা’ রূপে মানুষের সামনে দাঁড়ালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই পুরো ভূমিকাকে অবশ্য ‘নাটক’ বলেই কটাক্ষ করছেন বিরোধীরা। বিজেপি নেতা সুকান্ত মজুমদার বলেন,
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Budget 2026: অর্থমন্ত্রী এমন কোনো বড় ঘোষণা দেননি যা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াবে, নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি করবে, ট্যাক্স বা রাজস্ব আদায় বাড়াবে কিংবা ঋণের বোঝা কমাবে।
এসবই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাটক। ক্যামেরাকে নিজের দিকে টানার চেষ্টা। আমরা সারা বছর দেখি, এবার দিল্লির লোকজনও দেখুক।
অন্যদিকে সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী মমতার এই পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন,
৭ তারিখে শুনানি শেষ, সম্ভবত ১৪ তারিখ ফাইনাল লিস্ট বেরোবে। তার ঠিক আগে তিনি সুপ্রিম কোর্টে গেলেন! নভেম্বর, ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে গেলেন না কেন? আমরা সবাই এই প্রক্রিয়ার ত্রুটির বিরুদ্ধে, কিন্তু ওনার আচরণের কোনো মানে হয় না। কেরল সরকার যখন কোর্টে গিয়েছিল, তখন তো তিনি যাননি। এখন হঠাৎ একটা নাটকীয়তা তৈরি করছেন।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে বড় আন্দোলন গড়ার সুযোগ তৃণমূল ছাড়া অন্যান্য অবিজেপি বিরোধী দলরাও পেয়েছিল, কিন্তু তারা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ। বিশ্লেষক মানসারুল হক ইনস্ক্রিপ্টকে বলেন,
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানো তো দূর, তাঁকে কোনো আসনে চ্যালেঞ্জ জানাতে হলে তিনি কী পদক্ষেপ নেবেন, সেটা বিরোধীদের আগে থেকেই আঁচ করতে হবে। মমতা কোনো ‘পলিটিক্যাল স্পেস’-এ ঢোকার আগেই সেই জায়গাটি দখল করে, শক্তিশালী কাউন্টার ন্যারেটিভ তৈরি করতে হবে যা জনগণের সঙ্গে সংযোগ ঘটাবে। নাহলে বিরোধীদের ব্যর্থতার সুযোগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অপরাজেয়ই থাকবেন।
সামনেই ২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন। সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করে মানুষের আবেগ কি আবারও নিজের দিকে টেনে নিলেন মুখ্যমন্ত্রী? আরও একবার নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করে ফেললেন? আসন্ন নির্বাচনে ‘বাঙালি অস্মিতা’ কাজে লাগিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোট বৈতরণী পার করতে পারেন বলে আগেই মনে করা হচ্ছিল। তার ওপর ভোটার তালিকা ইস্যুতে যেভাবে এই আন্দোলন দিল্লি পর্যন্ত নিয়ে গেলেন, তাতে শাসক হয়েও নিজেকে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি বা ‘বিরোধী’ মেজাজে প্রতিষ্ঠিত করলেন মমতা। এই লড়াই যেন এখন দিল্লি বনাম বাংলার লড়াই।






