প্রাথমিকে ‘এক ক্লাস, এক শিক্ষক’ নীতি! পড়ুয়াদের ফলাফলের উপর নির্ভর করবে শিক্ষকদের ইনক্রিমেন্ট?
West Bengal Primary Education: প্রাথমিক শিক্ষায় বড় পরিবর্তনের পথে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে চালু হতে পারে ‘এক ক্লাস, এক শিক্ষক’ নীতি। পড়ুয়াদের অগ্রগতির ভিত্তিতে শিক্ষকদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টও কি নির্ধারিত হবে?
পশ্চিমবঙ্গের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের পথে রাজ্য সরকার। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই প্রাথমিক স্কুলে চালু হতে পারে ‘এক ক্লাস, এক শিক্ষক’ নীতি। অর্থাৎ, একটি শ্রেণির সমস্ত পড়ুয়াকে পড়ানোর পাশাপাশি তাদের পড়াশোনার অগ্রগতির সম্পূর্ণ দায়িত্বও থাকবে একজন শিক্ষকের উপর। শুধু তাই নয়, পড়ুয়াদের সার্বিক উন্নতির ভিত্তিতে শিক্ষকদের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্টের বিষয়টিও বিবেচনা করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। বৃহস্পতিবার এই নতুন ব্যবস্থার কথা জানিয়েছেন রাজ্যের স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন।
কী এই ‘এক ক্লাস, এক শিক্ষক’ নীতি?
প্রাথমিক স্তরে সাধারণত বাংলা, ইংরেজি, অঙ্কের মতো বিষয় পড়ানো হয়। নতুন ব্যবস্থায় প্রতিটি শ্রেণির জন্য একজন নির্দিষ্ট শিক্ষক দায়িত্বে থাকবেন। তিনি সংশ্লিষ্ট শ্রেণির সমস্ত বিষয় পড়াবেন এবং গোটা শিক্ষাবর্ষে পড়ুয়াদের পড়াশোনার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবেন। কোন পড়ুয়া কোন বিষয়ে দুর্বল, কার শেখার ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে এবং কার অতিরিক্ত সাহায্য প্রয়োজন, সেই বিষয়গুলির উপর নজর রাখবেন দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক।
স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মনের বক্তব্য, প্রাথমিক স্তরে পড়ানোর জন্য নিযুক্ত শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা রয়েছে। তাঁরা যে পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন, তাতে প্রাথমিকের শিশুদের সমস্ত বিষয় পড়ানোর দক্ষতা তাঁদের রয়েছে বলেই মনে করে রাজ্য সরকার। তাই প্রতিটি বিষয়ের জন্য আলাদা শিক্ষক রাখার পরিবর্তে শ্রেণি অনুযায়ী শিক্ষকের দায়িত্ব নির্দিষ্ট করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই এই ব্যবস্থা চালু করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে নয়া নীতির বিস্তারিত বাস্তবায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে আরও সরকারি নির্দেশিকার অপেক্ষা করতে হবে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Education : রাতারাতি গায়েব দেশের প্রায় ২০ হাজার স্কুল, আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমে গিয়েছে শিক্ষক সংখ্যাও।
পড়ুয়াদের অগ্রগতির দায়িত্ব শিক্ষকের
এই নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল শিক্ষকদের দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে দেওয়া। কোনো শ্রেণির পড়ুয়ারা বছর শেষে কতটা শিখল, তাদের পড়াশোনার মান কতটা উন্নত হলো এবং পিছিয়ে থাকা পড়ুয়ারা কতটা এগোলো, তার জবাবদিহি করতে হবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে।
বিষয়টি বোঝাতে একটি উদাহরণ দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনও শ্রেণিতে ২০ জন পড়ুয়া থাকলে এবং তাদের মধ্যে ১৫ জনের সার্বিক উন্নতি না হলে, কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হল, তার ব্যাখ্যা দিতে হবে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষককে। পড়ুয়াদের পিছিয়ে পড়ার কারণ চিহ্নিত করে তাদের উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্বও শিক্ষকের।
সরকারের যুক্তি, একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির দায়িত্ব একজন শিক্ষকের উপর থাকলে তিনি পড়ুয়াদের দক্ষতা, দুর্বলতা ও শেখার সমস্যাগুলি ভালোভাবে বুঝতে পারবেন। ফলে প্রত্যেকের প্রয়োজন অনুযায়ী পড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। এর মাধ্যমে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার মান বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছে রাজ্য সরকার।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
political influence on education: শিক্ষা কি শুধু নতুন কিছু জানা, নাকি মানুষের আচরণ ও চিন্তার পরিবর্তন? পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন কি সত্যিই শিক্ষার্থীদের স্বার্থে, নাকি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে? পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র কতটা প্রভাব ফেলে শিক্ষায়? আর বিজ্ঞান ও ধর্মের সম্পর্কই বা কী? আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় বিজ্ঞান, যুক্তি ও ধর্মের অবস্থান কোথায়?
পড়ুয়াদের ফলাফলের উপর নির্ভর করবে ইনক্রিমেন্ট?
নতুন নীতির পাশাপাশি শিক্ষকদের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব সামনে এসেছে। যে শিক্ষক যে শ্রেণির দায়িত্বে থাকবেন, সেই শ্রেণির পড়ুয়াদের অগ্রগতি বিচার করে তাঁর কাজের মূল্যায়ন করা হতে পারে। অর্থাৎ, পড়ুয়াদের শেখার মান এবং সার্বিক উন্নতির সঙ্গে শিক্ষকের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের বিষয়টি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
দীপক বর্মনের বক্তব্য, কোনও শিক্ষকের বেতন কেন বাড়ানো হবে, তা তাঁর কাজের ভিত্তিতে বিচার করা প্রয়োজন। দায়িত্ব পালন এবং পড়ুয়াদের উন্নতির ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা কতটা কার্যকর, তা খতিয়ে দেখার উপর জোর দিচ্ছে সরকার।
শিক্ষক নিয়োগ ও ছাত্র-শিক্ষক অনুপাতেও নজর
প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষকসংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। শিক্ষার অধিকার আইন অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরে ৩০ জন পড়ুয়া পিছু একজন শিক্ষক রাখার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় সব স্কুলে এই অনুপাত বজায় রাখা সম্ভব হয় না। ফলে নতুন নীতি কার্যকর করার পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বৃহস্পতিবার সল্টলেকের বিদ্যাসাগর ভবনে আয়োজিত বৈঠকে এই বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের চেয়ারম্যান, অ্যাড হক কমিটির সদস্য, বিভিন্ন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের চেয়ারম্যান এবং মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদের প্রতিনিধিরা। শিক্ষক নিয়োগ, দায়িত্ব বণ্টন এবং শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন স্কুলশিক্ষামন্ত্রী।
শুধু প্রাথমিক স্কুল নয়, মাধ্যমিক স্তরেও ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত উন্নত করার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। পাশাপাশি বেসরকারি স্কুলগুলিতে শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষকের সংখ্যা এবং পড়ুয়াদের শিক্ষার মান নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
দীপক বর্মন শিক্ষকদের ব্যক্তিগত অহং সরিয়ে রেখে দায়িত্ব পালনের উপর জোর দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ছবি তোলা বা প্রচারের দিকে মনোযোগ না দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব সমস্যাগুলি সমাধান করাই শিক্ষকদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। সরকারের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করার পরিবর্তে পড়ুয়াদের শিক্ষার মান উন্নত করার দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি। নতুন নীতি কার্যকর হলে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষক ও পড়ুয়াদের সম্পর্ক আরও নিবিড় হবে বলে আশা করছে সরকার।







