ট্রাফিক সিগন্যালই ভারতের সবচেয়ে বড় বইয়ের দোকান!

Pirated Books in India: প্রকাশকদের মাথায় হাত পড়লেও লেখকদের জন্য কিন্তু এটা এক অদ্ভুত আনন্দের বিষয়। ভারতের রাস্তায় যদি কোনো লেখকের বইয়ের নকল বা সস্তা কপি দেদার বিক্রি হতে দেখা যায়, তবে বুঝতে হবে তিনি সাধারণ মানুষের ড্রয়িংরুম পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছেন।

inscript
৪ মিনিট
ট্রাফিক সিগন্যালই ভারতের সবচেয়ে বড় বইয়ের দোকান!

ব্যস্ত রাস্তা, অন্তহীন গাড়ির লাইন আর চড়া রোদ—ভারতের যেকোনো বড় শহরের ট্রাফিক সিগন্যালের চেনা দৃশ্য এটাই। কিন্তু সিগন্যালের এই চেনা দৃশ্যটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়, যদি না এই ছবিতে সিগন্যালে দাঁড়ানো গাড়ির জানালার পাশে এসে দাঁড়ানো মানুষগুলির কথা বলা হয়। সেই মানুষগুলি, যাঁদের বগলে থাকে গোছা গোছা বই। বইগুলির ঝকঝকে মলাট, অথচ আসল বইয়ের চেয়ে দামে অনেক সস্তা।

রাস্তার মোড়ে মোড়ে পাইরেটেড বইয়ের এই রমরমা ব্যবসা লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়,

প্রথমত, এ দেশে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে এখনও পর্যাপ্ত ভালো বইয়ের দোকান নেই।

দ্বিতীয়ত, কপিরাইট বা স্বত্বাধিকার আইনের প্রয়োগ এখানে বেশ শিথিল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কোনওটা ১০ বছর, কোনওটা আবার ৫৭! যেসব বই লিখতে সবচেয়ে বেশি সময় লেগেছে

Longest time to write Books : সবচেয়ে বেশি সময় নিয়ে লেখা হয়েছিল বিখ্যাত কিছু বই, এক নজরে দেখে নিন তালিকা...

এবং তৃতীয়ত, বইয়ের দাম বেশি হলেও এ দেশের মানুষের বই পড়ার আগ্রহে কোনো কমতি নেই।

প্রকাশকদের মাথায় হাত পড়লেও লেখকদের জন্য কিন্তু এটা এক অদ্ভুত আনন্দের বিষয়। ভারতের রাস্তায় যদি কোনো লেখকের বইয়ের নকল বা সস্তা কপি দেদার বিক্রি হতে দেখা যায়, তবে বুঝতে হবে তিনি সাধারণ মানুষের ড্রয়িংরুম পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছেন। একসময় চেতন ভগতের বইগুলির ক্ষেত্রে এই দৃশ্য নিয়মিত দেখা যেত, আর আজ দেখা যায় দেশি-বিদেশি নানা বেস্টসেলার বইয়ের ক্ষেত্রে।

কেন ইংরেজি বইয়ের এত দাপট?

ভারতে ইংরেজি বলতে বা পড়তে পারা মানুষের সংখ্যা কিন্তু খুব বেশি নয়—মোট জনসংখ্যার মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মতো। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, এ দেশের বইয়ের বাজারের সিংহভাগ আর্থিক লেনদেন বা বড় অংশটাই নিয়ন্ত্রণ করে ইংরেজি বই। ভারত বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইংরেজি বইয়ের বাজার।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কী বই পড়ছি?

Reading List : মাঝে-মাঝে ভাবি হয়তো-বা আমার নিজের বিপন্নতার সময়ে যার কাছে আশ্রয় পেয়েছি সেই বইটাই অনেকটা জায়গা জুড়ে আছে আমার জীবনে। তা হলেই বা ক্ষতি কী। পড়া তো আমার একার।

ইংরেজি ভাষা এখানে কেবল মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি সামাজিক মর্যাদা, ভালো চাকরি আর অর্থনৈতিক উন্নতির এক মস্ত বড় চাবিকাঠি। নিজের জীবনকে বদলে ফেলার এবং বিশ্বমঞ্চে নিজেকে মেলে ধরার এক বড় হাতিয়ার হিসেবেই মধ্যবিত্ত ও তরুণ প্রজন্ম ইংরেজি বইকে বেছে নিচ্ছে।

ভারতীয়দের প্রথম পছন্দ: নিজেকে বদলে ফেলার মন্ত্র

আজকের ভারতীয় পাঠকদের পছন্দের তালিকায় সবচেয়ে উপরে আছে ‘সেলফ-হেল্প’ বা আত্ম-উন্নয়নমূলক বই। The Psychology of Money কিংবা Atomic Habits-এর মতো বইগুলি এখন ভারতের শহর-শহরতলির ঘরে ঘরে। এর পাশাপাশি রয়েছে আধ্যাত্মিকতা, ব্যবসা এবং নতুন আঙ্গিকে লেখা পৌরাণিক কাহিনী (যেমন অমিশ ত্রিপাঠী বা দেবদত্ত পট্টনায়কের বই)।

এর নেপথ্যে একটা বড় মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। ভারত ঐতিহাসিকভাবে এমন এক সমাজ, যেখানে যৌথ পরিবার বা সামাজিক নিয়মের গুরুত্ব অনেক বেশি। এখানে পরিবার ও সমাজের চাপ সামলে নিজের একটা আলাদা স্বাধীন পরিচয় তৈরি করা বেশ কঠিন। মনস্তত্ত্ববিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এমন একটি পরিবেশে নিজের একক সত্তা বা ‘সেলফ’ গড়ে তোলার জন্য বই পড়াকে সবচেয়ে নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য উপায় বলে মনে করছে আজকের প্রজন্ম। সমাজ বা পরিবারের সঙ্গে লড়াই না করেও, বইয়ের পাতায় তারা খুঁজে নিচ্ছে নিজেদের বড় হওয়ার স্বপ্ন।

তরুণ প্রজন্ম এখন এমন গল্প বা বিষয় পছন্দ করছে যা তাদের কেরিয়ারের লড়াই, আইআইটি/আইআইএম-এর মতো নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঢোকার চাপ, প্রেম, কর্পোরেট জীবনের টানাপোড়েন কিংবা স্টার্ট-আপ খোলার স্বপ্নের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।

এই পড়ার অভ্যাস থেকে আজকের ভারতীয়দের চরিত্র সম্পর্কে কিছু বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ভারতীয় তরুণ ও মধ্যবিত্ত সমাজ এখন কেবল ভাগ্যের উপর ভরসা করে বসে থাকতে রাজি নয়। তারা নিজেদের আর্থিক অবস্থা, চিন্তাভাবনা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে মরিয়া। সেলফ-হেল্প বইয়ের এই বিপুল জনপ্রিয়তা সেই জেদটাই প্রমাণ করে। ভারতীয় পাঠকেরা একদিকে যেমন আধুনিক বিশ্বের প্রগতিশীল চিন্তার সঙ্গে তাল মেলাতে চাইছে, অন্যদিকে নিজেদের সংস্কৃতি ও পৌরাণিক ঐতিহ্যকেও ভুলে যাচ্ছে না। তারা যেমন আধুনিক অর্থনীতির বই পড়ছে, তেমনই আগ্রহ নিয়ে পড়ছে রামায়ণ-মহাভারতের নতুন ব্যাখ্যা। ইংরেজি এখনও বড় শহর বা উচ্চশিক্ষিত সমাজের প্রতীক ঠিকই, কিন্তু এখন দিন বদলাচ্ছে। বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার (যেমন বাংলা, হিন্দি বা তামিল) শক্তিশালী সাহিত্যগুলি এখন ইংরেজিতে অনুবাদ হচ্ছে। ফলে প্রান্তিক বা আঞ্চলিক বাস্তবতাগুলিও পৌঁছে যাচ্ছে গোটা দেশের পাঠকের কাছে।

ট্রাফিক সিগন্যালের জ্যামে আটকে থেকে সস্তার পাইরেটেড বই কেনা মানুষগুলি আসলে স্রেফ সময় কাটানোর বিনোদন খুঁজছে না। তারা খুঁজছে নিজেদের জীবনটাকে বদলে দেওয়ার এক টুকরো নতুন ফর্মুলা।

আজকের ভারতীয় সমাজ নিজের কেরিয়ার, অর্থ ও মানসিক শান্তি নিয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা কঠোর পরিশ্রমী, যুগের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারদর্শী এবং সফল হওয়ার জন্য ভীষণ রকম উচ্চাকাঙ্ক্ষী। আর তাদের এই বদলে যাওয়া ‘আমিত্ব’ বা নিজের রূপটাই খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠছে তাদের পড়া বইয়ের পাতায় পাতায়।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

নাৎসি জার্মানি থেকে FTII–SRFTI: ফিল্ম স্কুল কেন ক্ষমতার চোখে এত গুরুত্বপূর্ণ?

History of Film school's against Fasicsm: ১৯৩৩ সালে নাৎসিরা ভাঙচুর করেছিল বার্লিনের ফিল্ম স্কুল টনফিল্মশুলে। ১৯৩৫ সালে মুসোলিনি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন ইতালির ফিল্ম স্কুল সিএসসি। ২০১৫ সালে ভারতে পুনের এফটিআইআইতে মোদী সরকারের নিয়োগ বিষয়ক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ১৩৯ দিনের ধর্মঘট হয়েছিল। ২০২৬-এ কলকাতার এসআরএফটিআইতে, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ইট-পাথরের হামলা সেই ইতিহাসকেই পুনরাবৃত্ত করল। হামলার পদ্ধতি বদলেছে, কিন্তু ফ্যাসিবাদের উদ্দেশ্য আজও একই, স্বাধীন সাংস্কৃতিক চর্চাকে নিয়ন্ত্রণ করা। যদিও ইতিহাস বলে, ফিল্ম স্কুল কেবল একটি ভবন নয়, একটি ধারণা, একটি মতাদর্শিক বলয়।

জেলের ৭১৬ দিন: কী পড়তেন, কী ভাবতেন, কীভাবে লড়তেন ভগৎ সিং?

Bhagat Singh jail life: জেলখানায় ভগৎ সিংয়ের সবচেয়ে বড় সঙ্গী ছিল বই। দ্বারকাদাস লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান শাস্ত্রী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জেলের ভিতর বই পাচার করতেন। এই ৭১৬ দিনে তিনি প্রায় ৩০০-র বেশি বই পড়েছেন ভগৎ সিংহ।

টাকার বিনিময়ে বিজেপি-র প্রচার করেছেন সায়ক! আর আইনি জালে জড়ালেন অলিপাবের নিরীহ কর্মী

Sayak Chakraborty Olypub controversy: নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, পাঁচটি রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের নির্বাচনে বিজেপির কেন্দ্রীয় দফতরের মোট খরচ ছিল ৫২৯.৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গেই খরচ হয়েছে প্রায় ২৮৬ কোটি টাকা। সেই প্রচারের একটি অংশ ছিল সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল কনটেন্ট।

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।