ট্রাফিক সিগন্যালই ভারতের সবচেয়ে বড় বইয়ের দোকান!
Pirated Books in India: প্রকাশকদের মাথায় হাত পড়লেও লেখকদের জন্য কিন্তু এটা এক অদ্ভুত আনন্দের বিষয়। ভারতের রাস্তায় যদি কোনো লেখকের বইয়ের নকল বা সস্তা কপি দেদার বিক্রি হতে দেখা যায়, তবে বুঝতে হবে তিনি সাধারণ মানুষের ড্রয়িংরুম পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছেন।
ব্যস্ত রাস্তা, অন্তহীন গাড়ির লাইন আর চড়া রোদ—ভারতের যেকোনো বড় শহরের ট্রাফিক সিগন্যালের চেনা দৃশ্য এটাই। কিন্তু সিগন্যালের এই চেনা দৃশ্যটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়, যদি না এই ছবিতে সিগন্যালে দাঁড়ানো গাড়ির জানালার পাশে এসে দাঁড়ানো মানুষগুলির কথা বলা হয়। সেই মানুষগুলি, যাঁদের বগলে থাকে গোছা গোছা বই। বইগুলির ঝকঝকে মলাট, অথচ আসল বইয়ের চেয়ে দামে অনেক সস্তা।
রাস্তার মোড়ে মোড়ে পাইরেটেড বইয়ের এই রমরমা ব্যবসা লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়,
প্রথমত, এ দেশে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে এখনও পর্যাপ্ত ভালো বইয়ের দোকান নেই।
দ্বিতীয়ত, কপিরাইট বা স্বত্বাধিকার আইনের প্রয়োগ এখানে বেশ শিথিল।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Longest time to write Books : সবচেয়ে বেশি সময় নিয়ে লেখা হয়েছিল বিখ্যাত কিছু বই, এক নজরে দেখে নিন তালিকা...
এবং তৃতীয়ত, বইয়ের দাম বেশি হলেও এ দেশের মানুষের বই পড়ার আগ্রহে কোনো কমতি নেই।
প্রকাশকদের মাথায় হাত পড়লেও লেখকদের জন্য কিন্তু এটা এক অদ্ভুত আনন্দের বিষয়। ভারতের রাস্তায় যদি কোনো লেখকের বইয়ের নকল বা সস্তা কপি দেদার বিক্রি হতে দেখা যায়, তবে বুঝতে হবে তিনি সাধারণ মানুষের ড্রয়িংরুম পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছেন। একসময় চেতন ভগতের বইগুলির ক্ষেত্রে এই দৃশ্য নিয়মিত দেখা যেত, আর আজ দেখা যায় দেশি-বিদেশি নানা বেস্টসেলার বইয়ের ক্ষেত্রে।
কেন ইংরেজি বইয়ের এত দাপট?
ভারতে ইংরেজি বলতে বা পড়তে পারা মানুষের সংখ্যা কিন্তু খুব বেশি নয়—মোট জনসংখ্যার মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মতো। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, এ দেশের বইয়ের বাজারের সিংহভাগ আর্থিক লেনদেন বা বড় অংশটাই নিয়ন্ত্রণ করে ইংরেজি বই। ভারত বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইংরেজি বইয়ের বাজার।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Reading List : মাঝে-মাঝে ভাবি হয়তো-বা আমার নিজের বিপন্নতার সময়ে যার কাছে আশ্রয় পেয়েছি সেই বইটাই অনেকটা জায়গা জুড়ে আছে আমার জীবনে। তা হলেই বা ক্ষতি কী। পড়া তো আমার একার।
ইংরেজি ভাষা এখানে কেবল মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি সামাজিক মর্যাদা, ভালো চাকরি আর অর্থনৈতিক উন্নতির এক মস্ত বড় চাবিকাঠি। নিজের জীবনকে বদলে ফেলার এবং বিশ্বমঞ্চে নিজেকে মেলে ধরার এক বড় হাতিয়ার হিসেবেই মধ্যবিত্ত ও তরুণ প্রজন্ম ইংরেজি বইকে বেছে নিচ্ছে।
ভারতীয়দের প্রথম পছন্দ: নিজেকে বদলে ফেলার মন্ত্র
আজকের ভারতীয় পাঠকদের পছন্দের তালিকায় সবচেয়ে উপরে আছে ‘সেলফ-হেল্প’ বা আত্ম-উন্নয়নমূলক বই। The Psychology of Money কিংবা Atomic Habits-এর মতো বইগুলি এখন ভারতের শহর-শহরতলির ঘরে ঘরে। এর পাশাপাশি রয়েছে আধ্যাত্মিকতা, ব্যবসা এবং নতুন আঙ্গিকে লেখা পৌরাণিক কাহিনী (যেমন অমিশ ত্রিপাঠী বা দেবদত্ত পট্টনায়কের বই)।
এর নেপথ্যে একটা বড় মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। ভারত ঐতিহাসিকভাবে এমন এক সমাজ, যেখানে যৌথ পরিবার বা সামাজিক নিয়মের গুরুত্ব অনেক বেশি। এখানে পরিবার ও সমাজের চাপ সামলে নিজের একটা আলাদা স্বাধীন পরিচয় তৈরি করা বেশ কঠিন। মনস্তত্ত্ববিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এমন একটি পরিবেশে নিজের একক সত্তা বা ‘সেলফ’ গড়ে তোলার জন্য বই পড়াকে সবচেয়ে নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য উপায় বলে মনে করছে আজকের প্রজন্ম। সমাজ বা পরিবারের সঙ্গে লড়াই না করেও, বইয়ের পাতায় তারা খুঁজে নিচ্ছে নিজেদের বড় হওয়ার স্বপ্ন।
তরুণ প্রজন্ম এখন এমন গল্প বা বিষয় পছন্দ করছে যা তাদের কেরিয়ারের লড়াই, আইআইটি/আইআইএম-এর মতো নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঢোকার চাপ, প্রেম, কর্পোরেট জীবনের টানাপোড়েন কিংবা স্টার্ট-আপ খোলার স্বপ্নের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
এই পড়ার অভ্যাস থেকে আজকের ভারতীয়দের চরিত্র সম্পর্কে কিছু বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ভারতীয় তরুণ ও মধ্যবিত্ত সমাজ এখন কেবল ভাগ্যের উপর ভরসা করে বসে থাকতে রাজি নয়। তারা নিজেদের আর্থিক অবস্থা, চিন্তাভাবনা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে মরিয়া। সেলফ-হেল্প বইয়ের এই বিপুল জনপ্রিয়তা সেই জেদটাই প্রমাণ করে। ভারতীয় পাঠকেরা একদিকে যেমন আধুনিক বিশ্বের প্রগতিশীল চিন্তার সঙ্গে তাল মেলাতে চাইছে, অন্যদিকে নিজেদের সংস্কৃতি ও পৌরাণিক ঐতিহ্যকেও ভুলে যাচ্ছে না। তারা যেমন আধুনিক অর্থনীতির বই পড়ছে, তেমনই আগ্রহ নিয়ে পড়ছে রামায়ণ-মহাভারতের নতুন ব্যাখ্যা। ইংরেজি এখনও বড় শহর বা উচ্চশিক্ষিত সমাজের প্রতীক ঠিকই, কিন্তু এখন দিন বদলাচ্ছে। বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার (যেমন বাংলা, হিন্দি বা তামিল) শক্তিশালী সাহিত্যগুলি এখন ইংরেজিতে অনুবাদ হচ্ছে। ফলে প্রান্তিক বা আঞ্চলিক বাস্তবতাগুলিও পৌঁছে যাচ্ছে গোটা দেশের পাঠকের কাছে।
ট্রাফিক সিগন্যালের জ্যামে আটকে থেকে সস্তার পাইরেটেড বই কেনা মানুষগুলি আসলে স্রেফ সময় কাটানোর বিনোদন খুঁজছে না। তারা খুঁজছে নিজেদের জীবনটাকে বদলে দেওয়ার এক টুকরো নতুন ফর্মুলা।
আজকের ভারতীয় সমাজ নিজের কেরিয়ার, অর্থ ও মানসিক শান্তি নিয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা কঠোর পরিশ্রমী, যুগের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারদর্শী এবং সফল হওয়ার জন্য ভীষণ রকম উচ্চাকাঙ্ক্ষী। আর তাদের এই বদলে যাওয়া ‘আমিত্ব’ বা নিজের রূপটাই খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠছে তাদের পড়া বইয়ের পাতায় পাতায়।








