নীতীশের মন বদলের নেপথ্যে পুরনো বন্ধু প্রশান্ত কিশোর? দানা বাঁধছে জল্পনা
প্রশান্ত কিশোরের একদা ঘনিষ্ঠ নীতীশ কুমারের এই মনবদলের পিছনে আগামী বছরের লোকসভা নির্বাচনের কোনও ইঙ্গিত রয়েছে কি না, তাও ভাবাচ্ছে রাজনৈতিক মহলের একাংশকে।

রাজনীতিতে দলবদল আর মাছের দরের ওঠানামা প্রায় এক সারিতে। কে কোন দলে গেলেন, আবার এলেন, আবার গেলেন, এসব নিয়ে ভাবনার অবসরের মধ্যেই ঘটে পাল্টি-চক্রের বিবর্তন। চলতেই থাকে, চলতেই থাকে। আর সেই ধারা বজায় রেখেই অনবরত চলে রাজনীতির নামে লোক ঠকানোর কারবার! কেন বলা হচ্ছে একথা? কারণ, আপনি ভোট দিলেন। নাগরিক হিসেবে আপনার কর্তব্য পালন করলেন। একটি নীতি, আদর্শ, মতের বিরুদ্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন আদায় হলো। সেই সমর্থনকারীরা আশ্বস্ত হলেন, তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকারের মর্যাদা রেখেই মনের মতো সরকার তৈরি হবে ভাবলেন। এমন ভেবে ঘুমোতে গেলেন, কিন্তু পরদিন সকালে উঠেই দেখলেন, যা ভেবেছিলেন, সবটা বদলে গিয়েছে নিমেষেই! ধরা যাক, 'এ' দলকে ভোট দিয়েছিলেন 'বি' দলের বিপক্ষে গিয়ে। 'সি' দলকে ক্ষমতায় দেখবেন না বলে। হঠাৎ দেখলেন, সেই 'এ' দলই হাত মিলিয়েছে 'সি' দলের সঙ্গে। অর্থাৎ দুইয়ে দুইয়ে চার করে আপনার আশা-ভরসার সুনামি ঘটিয়ে দেওয়া হয়েছে কয়েকটি মুহূর্তেই। সমীকরণ, রাজনীতিতে সবকিছু সম্ভব! এই দোহাই দিয়ে বারবার বদলে যাচ্ছে চারপাশ। পতাকার রং বদলে নিয়ে প্রচার! নীতি, আদর্শ, মানুষের জন্য কাজকে জলাঞ্জলি দিয়ে ক্ষমতাই ফের উঠে আসছে মুখ্যে। এমন পরিস্থিতিতে আপনার কি সত্যিই ভালো লাগবে? আবেগকে শেষ করে শুনতে ইচ্ছা করবে, রাজনৈতিক কৌশলের ভূরি ভূরি বাণী?
হ্যাঁ, সাম্প্রতিককালে এই হঠাৎ বদলের রাজনীতিই বাড়ছে নিরন্তর। বঙ্গের রেজ্জাক, উদয়ন, শুভেন্দু, মুকুল, রাজীব অথবা উত্তরপ্রদেশে মুলায়ম সিং যাদবের বউমা। অথবা মধ্যপ্রদেশের জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া। সমগ্র ভারত শুধু নয়, সমগ্র বিশ্বের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একাধিক নাম আসবে বারবার। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিশ্বাসকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে শুধুই ক্ষমতার হাতছানি!
স্বাধীনতার পর থেকেই দেশজুড়ে এর বহু উদাহরণ থাকলেও আমরা সাম্প্রতিক মহারাষ্ট্রের উদাহরণই দিতে পারি। কর্নাটকের সরকার কার হাতে থাকবে, তাই নিয়ে মাঝরাতে দেশের শীর্ষ আদালত খুললেও মহারাষ্ট্র সীমাবদ্ধ থেকেছে বন্যাবিধ্বস্ত অসমেই। সেখান থেকেই তৈরি হয়েছে রণকৌশল। নিন্দুকেরা বলেন, অসম তো শুধু রূপকমাত্র, গুজরাতে দরদাম ঠিক হয়েছিল আগেই! ছত্রপতি শিবাজীর রাজ্যে সরকার বদলেছে। বালাসাহেবের আদর্শ নিয়ে টানাটানি চলেছে বহুদিন। কেন্দ্রের রাজাধিরাজের দলের সহযোগে একদা উদ্ধব-প্রিয় একনাথ শিন্ডে 'বস'-কে ঠেলে সরিয়ে হয়ে গিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। নিজের দলের নেতার কাছেই 'ল্যাং' খেয়ে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন শিবসেনার উদ্ধব ঠাকরে।
কিন্তু এখানেই কি প্রথম! অনেকেই বলছেন, উদ্ধব ঠাকরে যে 'বেইমানি' করেছিলেন আড়াই বছর আগে, তার ফল ভোগ করছেন। বলিউডের বিতর্কিত অভিনেত্রী কঙ্গনার অভিশাপ ফলেছে বলেও মশকরা করছেন কেউ কেউ। আসলে এই উদ্ধব ঠাকরে শুধুমাত্র মুখ্যমন্ত্রীর পদ দীর্ঘ সময় রাখবেন বলে, বিজেপির সঙ্গে জোট ভেঙেছিলেন, এমনটাই অভিযোগ ওঠে। নির্বাচনে বিরোধী দলের সঙ্গে জোট করেছিলেন, কট্টর হিন্দুত্ববাদী উদ্ধবের দল। তারই ফল!
প্রশ্ন উঠছে, সাম্প্রতিক বিহারের পরিস্থিতি নিয়েও। একদা বিজেপির সঙ্গী নীতীশ, মোদি-বিরোধিতায় এনডিএ ত্যাগ করেছিলেন। জোট ভেঙে রাতারাতি ভিন্ন কৌশলে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে গিয়েছিলেন। আবার বিহারের সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে জেলবন্দি লালু-পুত্র তেজস্বী যাদবের দলের থেকে অনেক কম আসন জিতেও সুকৌশলে বিজেপির সঙ্গে ফের হাত মিলিয়ে গড়ে ফেলেছিলেন সরকার। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন তিনি। রাজ্যের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হলেও তেজস্বী যাদবের দলকে ডাকা হয়নি রাজভবনের তরফে। অর্থাৎ ছলে, বলে, কৌশলে বিহারের জনতা দল ইউনাইটেড প্রধান নীতীশ কুমার থেকে গিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। কখনও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থনে, কখনও লালু-রাবড়ি পরবর্তী জমানায় 'প্রশান্ত কিশোর কৌশল' অথবা অন্যান্য কৌশলে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ওয়াকিবহাল মহলের বক্তব্য, ঘন ঘন ইউ টার্নের জন্য নীতীশের জনপ্রিয়তা কমেছে। ২০১৩ সালে বিহারে যে দাপট ছিল তাঁর, আজ ২০২২-এ এসে সেই জায়গায় নেই তিনি।
এদিনও তার অন্যথা ঘটেনি। জোটসঙ্গী বিজেপির একছত্র আধিপত্য, সরকার চালানোর ক্ষেত্রে সমস্যা এবং নিজের সরকার থাকলেও উন্নয়নের ক্ষেত্রে সমস্যার দোহাই দিয়ে হঠাৎই জোট ভেঙে দিলেন নীতীশ কুমার। কিন্তু বিরোধী আসনে বসার জন্য নয়, মানুষের সেবা করতে তাঁর প্রয়োজন কুর্সি। সেটাই রাখলেন বজায়। একদিনের ইস্তফা এবং পরদিন ফের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার বাসনায় সোনিয়া গান্ধী, তেজস্বী যাদবের সঙ্গে কথা, দলীয় বিধায়কদের সঙ্গে বৈঠকে একটুও কার্পণ্য করেননি তিনি। রাজ্যে রাজ্যে বিজেপির ক্ষমতালাভের কৌশলের পাল্টা চাল দিয়ে ফের তিনি ইস্তফা দিলেন, বিজেপির সঙ্গ ছাড়লেন, সরকার ভাঙলেন। তবে আবার মুখ্যমন্ত্রী হবেন বলে, বিহারের উন্নয়নের জন্য বহুবছর এই কুর্সি তাঁর দারুণ প্রয়োজন! আজ সকাল পর্যন্ত তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার বিরোধী দলের হাত ধরলেন। তাঁর দলের থেকে অনেক বেশি আসন জেতা দলের প্রধানকে ডেপুটি বানালেন (আলোচনা চলছে)। তবুও তিনিই মুখ্যমন্ত্রী রইলেন।
আরজেডি, কংগ্রেস, বিজেপি, আসাদউদ্দিনের দল, বামপন্থী দলগুলো, তাদের দলের আসনসংখ্যা, একদা বিহারের তাকতদার নেতা কানহাইয়া কুমার। বিহার বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল এখানে বিচার্য নয়, মঙ্গল-সন্ধ্যায় আলোচ্য আসলে, সাম্প্রতিক রাজনীতিতে আজীবন বসন্তে থাকা নীতীশ কুমার। তেজস্বীর নিজের দল, ভাই তেজপ্রতাপ বিদ্রোহ রক্ষা, লোকসভা নির্বাচনের আগের মুহূর্তে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার ঝুঁকি নেওয়া, ক'দ্দিন নীতিশের এই জোটে সুমতি থাকবে, তা নিয়ে বিস্তর জলঘোলা, আবার লালুর দলের সঙ্গে বিভেদের আশঙ্কা, বিজেপির সঙ্গে ফের বন্ধুত্বের কানাঘুষোর মধ্যেই হিরো আবার নীতীশই। কারণ, মাত্র ৪৫ আসনের জোরে ৮০ আসনকে ম্যানেজ করে মুখিয়া আবার তিনিই।
এরকম একটি পরিস্থিতিতে, বিজেপির ঘোড়া কেনাবেচার একের পর কাণ্ডের (বিরোধীদের অভিযোগ অনুযায়ী) মধ্যে নীতিশের এই চাল, বিরোধীদের কাছে স্বস্তির। তবে, আশঙ্কা অন্য জায়গায়। ক্ষণস্থায়ী, প্রশান্ত কিশোরের একদা ঘনিষ্ঠ নীতীশ কুমারের এই মনবদলের পিছনে আগামী বছরের লোকসভা নির্বাচনের কোনও ইঙ্গিত রয়েছে কি না, তাও ভাবাচ্ছে রাজনৈতিক মহলের একাংশকে। কেন? দিল্লির রাজনীতির অলিন্দে কান পাতলেই শোনা যায় নিজের সংস্থা খাতায়-কলমে ছাড়লেও মোদিবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির কঠিন অবস্থার গঠনে সচেষ্ট জেডিইউ-র প্রাক্তন নেতা ভোটকুশলী প্রশান্ত কিশোর। বিহারের গত বিধানসভা নির্বাচনে তেজস্বী যাদবের লড়াই, ঘুরে দাঁড়ানোর পিছনে খানিকটা তাঁর হাত রয়েছে বলেও অনুমান করেন কেউ কেউ। কংগ্রেসের প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়া প্রশান্ত কিশোর, মোদিবিরোধী শক্তি হিসেবে আঞ্চলিক দলগুলোকে একজোট করার চেষ্টা করছেন বলে অনেকেই বলেন। সেখানে দাঁড়িয়ে মধ্য এবং পূর্ব ভারতের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য বিহারের হঠাৎ পটপরিবর্তন এবং আগামী লোকসভা নির্বাচনের আগে বিহার থেকে বিজেপিকে ধাক্কা দেওয়ার পিছনে থাকতে পারে এক অন্য ভোটের অঙ্কও। যদিও সবটাই জল্পনা।
আসলে, নীতীশ কুমার আর অন্যান্য মুখ্যমন্ত্রীদের মধ্যে অনেকটা তফাৎ রয়েছে। সুবক্তা, তুখড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নীতীশ আর যাই হোক, যতই কম আসন আসুক তাঁর দলের ঝুলিতে, নিজের পদে কিন্তু তিনি অটল! বিহারের রাজনীতিতে শোরগোল, ইস্তফা, নতুন সরকারের ঢক্কানিনাদের মধ্যেও তিনি আছেন তাঁর মধ্যেই। এই গেলাম আর এই এলাম, এমন খেলার মধ্যেই নিজেকে দিব্যি বজায় রেখেছেন তিনি। আজ এই বন্ধু, কাল ওই বন্ধু করেও নিজে থাকেন একই, এটা নীতিশ ছাড়া অথবা এরাজ্যের মুকুল-সম নেতারা ছাড়া আর কে বা কারা ভাল বুঝবেন!






