বারবার তিনবার! ঘর-ভাঙা নীতীশের চালে এবার কোনদিকে বিহার
ওয়াকিবহাল মহলের বক্তব্য, ঘন ঘন ইউ টার্নের জন্য নীতীশের জনপ্রিয়তা কমেছে। ২০১৩ সালে বিহারে যে দাপট ছিল তাঁর, আজ ২০২২-এ এসে সেই জায়গায় নেই তিনি।

অনেক দিন ধরে বেসুরো গাইছিলেন, আর তখন থেকেই জল্পনা মাথাচাড়া দেয়। তাহলে আবার কি বিহারে পালাবদল? নীতীশ কুমারের হাত ধরে সেটাই হলো। তৈরি হলো নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ। বলাই বাহুল্য, গত বিধানসভা নির্বাচনে ভালো স্কোর করেও সরকার গড়তে পারেননি আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব। বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার গড়েন নীতিশ। কিন্তু তা স্থায়ী হলো না। অনেক দিন ধরে বিজেপির সঙ্গে তাঁর মান-অভিমানের পালা চলছিল। ফলে তিনি এনডিএ-তে কতদিন বসত করবেন, তা নিয়েও জল্পনা শুরু হয়। নীতীশের ইস্তফার সঙ্গে সঙ্গে বিহারের রাশ চলে গেল লালুর পরিবারের হাতেই। কীভাবে?
বিজেপির সঙ্গ ছেড়ে ইস্তফা দিলেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার। গলা তুলে সদ্য পুরনো জোট শরিকের বিরুদ্ধে বললেন, "বিজেপির সঙ্গে কাজ করা মুশকিল হয়ে যাচ্ছিল।" ইস্তফা দিয়ে রাবড়ি দেবীর বাসভবনে যান নীতীশ। সূত্র বলছে, আবার কংগ্রেসের সমর্থনে বিহারে লালু-নীতীশ বা তেজস্বী-নীতীশ পার্টনারশি হতে পারে। তেজস্বী এবং রাবড়ি দেবীর কাছে ২০১৭-র 'ভুল'-এর জন্য ক্ষমাও চান নীতীশ। বিহারে তেতো ওষুধ গিলতে হলো বিজেপিকে। গেরুয়া শিবিরের সঙ্গ ছেড়ে ইস্তফা দিলেন নীতীশ, যিনি আবার আরজেডি-র সমর্থনে ফের বিহারের কুর্সিতে বসতে চলেছেন। সূত্রের খবর, নয়া জোট সরকারে উপমুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন লালুপুত্র তেজস্বী। ২০১৭ সালে আরজেডির সঙ্গ ছাড়েন নীতীশ। এ-যাত্রায় তিনি তেজস্বীকে বলেন, ২০১৭ সালে যা হয়েছিল ভুলে যান, নয়া অধ্যায় শুরু করা যাক।
অগ্নিপথ নিয়ে সবচেয়ে বেশি আগুন জ্বলেছিল বিহারে। সেই আগুন কেন প্রশমিত করেনি সরকার? দলের অন্দরেই ক্ষোভ দানা বাঁধছিল। এদিকে গত বিধানসভা নির্বাচনে বিহারের জেডিইউ-র ফল নীতীশকে জোটে ভালো থাকতে দেয়নি। ক্রমশই খারাপ হচ্ছিল বিজেপির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কোনও বিশেষ দল নয়, প্রায় সব জাতীয় এবং আঞ্চলিক দলই নতুন নতুন রিসর্ট রাজনীতির অধ্যায় সংযোজিত করছে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায়।
কয়েক মাস আগে রাষ্ট্রীয় জনতা দলের দেওয়া ইফতার পার্টিতে যোগ দেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার। বিহারের রাজনৈতিক মহলের একাংশের অভিযোগ, জোটসঙ্গী বিজেপির সঙ্গে নানা বিষয়ে নীতীশের বিবাদ চলছে। তার অন্যতম ইফতারে যোগ। সেই ইফতারের আয়োজক আবার আরজেডি। যাদের সঙ্গে বিজেপির আবার আদায়-কাঁচকলায় সম্পর্ক।
নীতীশ কুমারের জেডিইউ-র সঙ্গে বিজেপির স্নায়ুর লড়াই অনেকদিন ধরেই টের পাচ্ছিল রাজনৈতিক মহল। সম্প্রতি দুই শিবিরের সম্পর্কের চিড় আরও আলগা হয়। আগুনে ঘৃতাহুতি, নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন নীতি-আয়োগের বৈঠকেও যোগ দেননি নীতীশ। সম্পর্ক খারাপের সূত্রপাত আরও আগে।
একবার সেই দিকে নজর দেওয়া যাক। গত বিধানসভা নির্বাচনে ৭৫টি আসন পেয়ে একক বৃহত্তম দল হয়েছিল তেজস্বীর আরজেডি। বিজেপি পেয়েছিল ৭৪ আসন। সংযুক্ত জনতা দল পেয়েছিল ৪৩ আসন, গতবারের চেয়ে ২৮ কম। অন্যদিকে বিজেপি গতবারের চেয়ে ২১ আসন বেশি পেয়েছিল। অর্থাৎ জেডিইউ-র ব্যর্থতা ঢেকে দিয়েছে বিজেপি। কংগ্রেস পেয়েছিল ১৯ আসন, গতবারের চেয়ে আট কম। বলাই বাহুল্য, একক বৃহত্তম দল হয়েও সরকার গড়তে পারেননি তেজস্বী। তার ওপর এই ফল বলছে, গতবারের চেয়ে ২৮ আসন কম পেয়ে বিজেপির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছেন নীতীশ। মুখ্যমন্ত্রী হয়েও এ যে তাঁর পক্ষে স্বস্তিদায়ক নয়, তা বলাই বাহুল্য। সমীকরণ আর ক্ষোভ-বিক্ষোভ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল, তাতে আগামী দিনে পাটলিপুত্র কোনও সমীকরণের জন্ম দেয় কি না, সেই নিয়ে জল্পনা ছিল। ভালো রেজাল্ট করেও সরকার গড়তে পারেননি তেজস্বী। ফলে তার মধ্যে না-পারার আগুন ধিকিধিকি জ্বলছিল, একথাও বলা বাহুল্য যে, তিনিও কি সুযোগ খুঁজছিলেন না?
সম্প্রতি নীতীশের অভিযোগ, বিজেপি ভেতরে ভেতরে তাঁর দল ভাঙানোর চেষ্টা করছে। যেমনটা হয়েছে মহারাষ্ট্রে শিবসেনার ক্ষেত্রে। এটা কি তেজস্বীর জন্য হাতেগরম সুযোগ নয়? আরজেডি-র সরকারে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে বিহারের রাশ চলে গেল লালুর পরিবারের হাতেই। কারণ উপমুখ্যমন্ত্রী হলেও স্কোর বোর্ড আগেই বেশি নম্বর দিয়ে রেখেছে। বলাই বাহুল্য, তিনি অ্যাডভান্টেজে থাকবেন।
নীতীশ হাত ছাড়ায় বিহার নিয়ে '২৪-এর আগে বিজেপি যে ভালোরকম ধাক্কা খেল, তা বলাই যায়। তিনি উদ্ধব ঠাকরে নন, বিজেপির হাত ছেড়ে গেরুয়া শিবিরকে সেই বার্তাই দিলেন নীতীশ কুমার। রাজনৈতিক মহলের দাবি, গত কয়েক দিন ধরে একটা পালাবদলের আঁচ পাওয়া যাচ্ছিল পাটনা-র রাজনীতির অলিন্দে। বিশেষ করে, সংযুক্ত জনতা দল ভাঙার অভিযোগ উঠছিল বিজেপির বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক মহলের দাবি, ঠিক যেভাবে মহারাষ্ট্রে পালাবদল ঘটিয়েছে গেরুয়া শিবির, ঠিক সেই অঙ্কেই এগোচ্ছিল পাটনা। অবশেষে বর্ষীয়ান নীতীশের কাছে আপাতত প্রথম রাউন্ডে পিছিয়ে গেল বিজেপি। '২৪-এর আগে এটা কি বিজেপির জন্য বড় ধাক্কা নয়?
রাজনৈতিক মহল বলছে, নীতীশ কুমার এমন একজন নেতা, যাঁর রাজনীতিতে স্থায়ী কোনও বন্ধু বা শত্রু নেই। অতীতে ক্ষমতার জন্য নাটকীয়ভাবে শরিক বদল করেছেন। বিহারে বিজেপির সঙ্গে মিলে শাসন করাকালীনই তিনি এনডিএ ছেড়েছিলেন। আরজেডি-র সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেন। পরে আবার আরজেডিকে ছেড়ে বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেন। বিশেষজ্ঞদের আরও বক্তব্য, সেই সময় বিজেপির সঙ্গ ছেড়ে এবং আরজেডির সঙ্গে জোট করে বিহারে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিলেন নীতীশ। জেডিইউ 'জুনিয়র পার্টনার’ হওয়া সত্ত্বেও নীতীশ কুমারকে মুখ্যমন্ত্রী করেছিল বিজেপি। তবে ওয়াকিবহাল মহলের বক্তব্য, ঘন ঘন ইউ টার্নের জন্য নীতীশের জনপ্রিয়তা কমেছে। ২০১৩ সালে বিহারে যে দাপট ছিল তাঁর, আজ ২০২২-এ এসে সেই জায়গায় নেই তিনি। কেরিয়ার গ্রাফ নিয়ে সাপ লুডো খেলছেন না তো নীতীশ! এই আবহে বিহারের রাজনীতিতে বিরোধী নেতা হিসেবে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকটাই গড়ে তুলেছেন তরুণ তেজস্বী। তাই লালুর গড়ে পাটলিপুত্রের আত্মসমর্পণ?






