কিউবা দখলে কোন ফন্দি আঁটছেন ট্রাম্প?
Cuba fuel crisis: কিউবাকে দখলে আনতে ট্রাম্প কী কৌশল নিচ্ছেন? একদিকে চাপ, অন্যদিকে আলোচনার ইঙ্গিত—এই দ্বিমুখী নীতি কতটা কার্যকর হতে পারে? এতে কি কিউবার শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আসবে, নাকি পরিস্থিতি আরও জটিল ও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও কিউবাকে কেন্দ্র করে তাঁর আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতির নতুন অধ্যায় শুরু করেছেন। দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় ফিরে তিনি যে সর্বোচ্চ চাপের কৌশল নিয়েছেন, তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য এখন কিউবা। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখলে বোঝা যায়, এটি শুধু একটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপোড়েন নয়, বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক লড়াইয়ের অংশ। এতে জড়িয়ে আছে রাশিয়া, লাতিন আমেরিকা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও।
চলতি বছরের শুরু থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন কিউবার বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে শুরু করে। বিশেষ করে তেলের উপর নির্ভরশীল কিউবার অর্থনীতিকে দুর্বল করার লক্ষ্যেই নেওয়া হয় সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ—এক ধরনের ‘ডি ফ্যাক্টো’ তেল অবরোধ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এমনকী হুমকি দেয়, যে কোনো দেশ যদি কিউবাকে তেল সরবরাহ করে, তাহলে সেই দেশের উপর শুল্ক আরোপ করা হবে। এর ফলে মেক্সিকোর মতো দেশও কিউবায় তেল পাঠানো বন্ধ করে দেয়। এর ফলে ভয়াবহ জ্বালানি সংকটে পড়ে দেশটি।
এই অবরোধের প্রভাব খুব দ্রুত সাধারণ মানুষের জীবনে পড়ে। বিদ্যুৎ বিভ্রাট, পরিবহন সংকট, হাসপাতালের পরিষেবায় ব্যাঘাত—সব মিলিয়ে কিউবার পরিস্থিতি ক্রমশ সঙ্কটের রূপ নেয়। দেশজুড়ে ব্ল্যাকআউট এবং খাদ্য ও ওষুধের ঘাটতি দেখা দেয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Hungary: ট্রাম্প-সমর্থিত ও পুতিনঘনিষ্ঠ ভিক্টর অরবান কি চাপের মুখেও হাঙ্গেরির নির্বাচন জিততে পারবেন? দুর্নীতি, রুশযোগ, ইইউ সংঘাত এবং বিরোধী পিটার ম্যাগিয়ারের উত্থান—এই সব ইস্যু কি অরবানের ‘ম্যাজিক’ ভেঙে দেবে, নাকি আবারও ক্ষমতা ধরে রাখবেন তিনি?
যদিও রাশিয়ার একটি ৭,৩০,০০০ ব্যারেলের তেলবাহী জাহাজকে কিউবায় যেতে দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে বিস্ময়কর হলেও ট্রাম্প এটিকে ব্যতিক্রম হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। বাস্তবে এটি দেখায়, কিউবার উপর চাপ বজায় রেখেও পরিস্থিতি পুরোপুরি ভেঙে পড়তে দিতে চান না তিনি।
এই দ্বিমুখী কৌশল—একদিকে চাপ, অন্যদিকে দরকষাকষির সুযোগ, ট্রাম্প প্রশাসনের মূল বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে। প্রকাশ্যে কিউবার সরকারকে দুর্বল করার কথা বলা হলেও, পর্দার আড়ালে আলোচনা চালানোর ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। মার্কিন প্রশাসন চাইছে কিউবায় নেতৃত্ব পরিবর্তন, রাজনৈতিক সংস্কার এবং অর্থনৈতিক উন্মুক্ততা। এমনকী বাজেয়াপ্ত সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের দিকেও চাপ দেওয়া হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে কিউবাও কিছুটা নমনীয়তার ইঙ্গিত দিয়েছে। ইতোমধ্যেই কিছু রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে, এবং সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী আরও হাজার হাজার বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে মার্কিন প্রশাসন প্রশ্ন তুলেছে, এই মুক্তির মধ্যে আদৌ রাজনৈতিক বন্দিরা থাকবেন কি না।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Israel Palestine conflict: ইজরায়েলের নেসেটে পাস হওয়া মৃত্যুদণ্ড বিল কেন ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক দমননীতি? গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এটি কি ‘গণসংহার’ কৌশলের অংশ? আন্তর্জাতিক মহলের নীরবতা কি এই বিতর্কিত আইনের পথ আরও সহজ করে দিচ্ছে?
ট্রাম্পের লক্ষ্য শুধু কিউবার বর্তমান সরকারকে চাপে রাখা নয়, দীর্ঘমেয়াদে একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবর্তন ঘটানো। ভেনেজুয়েলায় যা করার চেষ্টা হয়েছিল, কিউবাতেও সেই মডেল প্রয়োগ করতে চাইছে ওয়াশিংটন। অর্থাৎ সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ নয়, কিন্তু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে সরকারকে বদলে দেওয়া।
এখানে একটি বড় প্রশ্ন উঠে আসে, এই কৌশল কতটা কার্যকর? ইতিহাস বলছে, কিউবার উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নতুন নয়। ১৯৬০-এর দশক থেকে চলে আসা এই অবরোধ কিউবার অর্থনীতিকে দুর্বল করলেও সরকারকে সরাতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি কিউবার জাতীয়তাবাদকে আরও জোরদার করেছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকেই কিউবা বহির্ভর অর্থনীতির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার তেলের উপর নির্ভরতা ছিল প্রবল। কিন্তু ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং মার্কিন হস্তক্ষেপের ফলে সেই সমর্থন কমে যাওয়ায় কিউবা এখন অনেক বেশি দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
US Iran relations: সত্যিই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, নাকি এটি নতুন কৌশল? তেল বিক্রি হলেও অর্থের নিয়ন্ত্রণ কেন ওয়াশিংটনের হাতে? বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমাতে গিয়ে কি ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে আরও চাপে ফেলছে আমেরিকা?
এই দুর্বলতার সুযোগই নিতে চাইছেন ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কিউবা এখন 'ব্যর্থ রাষ্ট্র' এবং এটি একটি চুক্তির মাধ্যমে সহজেই পরিবর্তন করা সম্ভব। এমনকী তিনি বন্ধুত্বপূর্ণ দখলের কথাও বলেছেন, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বেশ বিতর্কিত।
তবে এই কৌশলের ঝুঁকিও কম নয়। অতিরিক্ত চাপ কিউবার অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে রাশিয়া ও চিনের মতো দেশগুলি কিউবার পাশে দাঁড়াতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। ইতোমধ্যেই রাশিয়ার তেল সরবরাহ সেই দিকেই ইঙ্গিত করছে।
উল্লেখ্য, ট্রাম্পের কিউবা নীতি এখন দ্বিমুখী—একদিকে চাপ বাড়ানো, অন্যদিকে আলোচনার পথ খোলা রাখা। তবে উদ্দেশ্য একটাই, কিউবার বর্তমান শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা। কিন্তু এই পথে অনেক অনিশ্চয়
তা আছে, আর ঝুঁকিও কম নয়।





