বড় যুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে লেবাননের পরিস্থিতি?

Lebanon crisis: লেবাননে কী ঘটছে? মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনা কি আরও বড় যুদ্ধে রূপ নিতে চলেছে?

inscript
৩ মিনিট
বড় যুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে লেবাননের পরিস্থিতি?

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে যুদ্ধ থামেনি। এখন হামলের নতুন কেন্দ্র, লেবানন। একদিকে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতির কথা ঘোষণা হয়েছে, অন্যদিকে লেবাননে ইজরায়েলের লাগাতার হামলা সেই যুদ্ধবিরতির ভিত্তিকেই নড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে গোটা অঞ্চল এখন এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তার মধ্যে দাঁড়িয়ে।

এই যুদ্ধের শুরু থেকেই পরিষ্কার ছিল, সংঘাত শুধু ইরান বা ইজরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাস্তবেও তাই হয়েছে। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে লেবানন, সিরিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত। বিশেষ করে লেবানন এখন এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় কেন্দ্রগুলির একটি হয়ে উঠেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ইরানের সঙ্গে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি হয়েছে। এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ দু'সপ্তাহ। কিন্তু এই ঘোষণার মধ্যেই রয়েছে বড় অস্পষ্টতা। কারণ আমেরিকা ও ইজরায়েল বলছে, এই যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবানন পড়ছে না। অন্যদিকে ইরান ও মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান দাবি করছে, লেবাননও এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত। এই দ্বন্দ্বই এখন পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এই বিতর্কের মধ্যেই লেবাননে ইজরায়েলের ভয়াবহ হামলা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শতাধিক হামলা চালানো হয়েছে, যার ফলে অন্তত ২৫০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। শুধু সামরিক ঘাঁটি নয়, বিভিন্ন সেতু, রাস্তা—সবকিছুই এই হামলার লক্ষ্য হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ইরান-মার্কিন যুদ্ধবিরতি ও পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রত্যাবর্তন: ভারতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ

Iran US ceasefire: ইরান-আমেরিকা যুদ্ধবিরতিতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা নতুন করে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তার গুরুত্ব বাড়িয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই পরিবর্তিত অবস্থান ভারতের জন্য কি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে? দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্য কি বদলাচ্ছে, নাকি এটি সাময়িক কূটনৈতিক সমীকরণ—এই প্রশ্নই এখন মূল আলোচনায় উঠে আসেছে।

লেবাননের লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। যুদ্ধের শুরু থেকে এখনও পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছেন, আর বহু মানুষ আহত হয়েছেন। শিশুদের অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ—অনেকে পরিবার হারিয়েছে, কেউ আবার যুদ্ধের মাঝেই বড় হয়ে উঠছে।

এই হামলার জবাব দিতে পিছিয়ে নেই হেজবুল্লাহ। তারা ইতোমধ্যেই ইজরায়েলের উত্তরাঞ্চলে রকেট হামলা চালিয়েছে। তাদের বক্তব্য, ইজরায়েল যতদিন লেবাননে হামলা চালাবে, ততদিন তারা আক্রমণ চালিয়ে যাবে। ফলে যুদ্ধবিরতির মধ্যেও সংঘর্ষ থামেনি।

এই পুরো পরিস্থিতিতে ইরানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও তারা সরাসরি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে তারা তাদের কৌশলগত অবস্থান থেকে এক ইঞ্চিও সরেনি। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করে তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চাপ তৈরি করেছে। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের একটি বড় অংশের তেল পরিবাহিত হয়। ইরান এই পথ আংশিকভাবে বন্ধ করে বা নিয়ন্ত্রণে রেখে বিশ্ব অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে গিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। শুধু অর্থনীতি নয়, এই পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক চাপও তৈরি করছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন আর শুধুই একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ইরান সংকট: হুথিরা যেভাবে বদলে দিল যুদ্ধের মানচিত্র

Iran proxy groups Houthis Hezbollah: হুথি বিদ্রোহীদের সরাসরি যুদ্ধে প্রবেশে কি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন মোড় নিয়েছে? ইরান-ইজরায়েল উত্তেজনার মাঝে তেলপথ ও বাণিজ্য কি বড় সংকটে? এই বহুমুখী যুদ্ধ কি বিশ্ব অর্থনীতি ও কূটনীতিতে আরও বড় প্রভাব ফেলতে চলেছে?

অন্যদিকে, যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। মার্কিন প্রশাসন বারবার বলছে, ইরান যদি চুক্তি না মানে, তাহলে আরও বড় সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আবার ইরানও স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করবে না। এই অবস্থানগত দ্বন্দ্বই বোঝাচ্ছে যে এই যুদ্ধবিরতি আসলে একটি অস্থায়ী বিরতি ছাড়া কিছু নয়।

রাজনৈতিকভাবে এই যুদ্ধ আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। ইজরায়েল এখন শুধু প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে নেই, আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করেছে। তারা লেবাননে ‘বাফার জোন’ তৈরি করতে চাইছে, যাতে হেজবোল্লাহর মতো গোষ্ঠীগুলিকে সীমান্ত থেকে দূরে রাখা যায়। কিন্তু এই কৌশল আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবাধিকারের দিক থেকে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

এদিকে, ইরানের ভেতরেও পরিস্থিতি সহজ নয়। যুদ্ধের শুরুতেই তাদের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ায় দেশজুড়ে শোক এবং ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই সঙ্গে এক ধরনের প্রতিরোধের মনোভাবও তৈরি হয়েছে। অনেকেই এটাকে ‘পরাজয়’ নয়, ‘প্রতিরোধের লড়াই’ হিসেবে দেখছেন।

এই যুদ্ধের আরেকটি বড় দিক হলো, এটি যেভাবে সাধারণ মানুষের জীবনকে বদলে দিচ্ছে। শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য সরবরাহ—সব জায়গায়। স্কুল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, হাসপাতালে হামলা করা হচ্ছে, মানুষ চিকিৎসা পাচ্ছে না। এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে পুরো একটি প্রজন্মকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কূটনৈতিক স্তরেও চেষ্টা চলছে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশ, যেমন ফ্রান্স, ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন—সবাই চাইছে এই যুদ্ধবিরতি আরও বিস্তৃত হোক এবং লেবাননকেও এর আওতায় আনা হোক। কিন্তু বাস্তবে এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

লেবাননই এখন এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। পরিস্থিতি যদি আরও খারাপ হয়, তাহলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। আর যদি কূটনৈতিক সমাধান হয়, তাহলে হয়তো এই ভয়াবহ সংঘাত থেকে কিছুটা মুক্তি মিলবে। কিন্তু আপাতত যুদ্ধ থামেনি, শুধু তার রূপ বদলেছে। আর এই পরিবর্তিত যুদ্ধই আগামী দিনের মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? সরকার বদলায়, কেন বদলায় না মন?

Rabindranath Tagore Targeted in Bangladesh: বাংলাদেশে বারবার কেন নিশানা হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? হাসিনা থেকে ইউনূস, সরকার বদলালেও কেন থামছে না তাঁর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার মুছে ফেলার চেষ্টা? জাতীয় সঙ্গীতের স্রষ্টাকেই কেন বারবার প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়তে হচ্ছে?

যন্তর মন্তরে ঢুকে বিক্ষোভ, পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে সিজেপি-র দুই নেতা

Jantar Mantar protest: যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের জেরে সিজেপি নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠাল আদালত। নির্বাচন কমিশন, এসআইআর এবং প্রতিবাদের অধিকার ঘিরে বাড়ছে বিতর্ক।

দিল্লিতে মহিলা বিক্ষোভকারীদের হেনস্থার অভিযোগ, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে উঠছে যে সব প্রশ্ন

Delhi protest: দিল্লিতে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ ঘিরে মহিলা আন্দোলনকারীদের একাংশ পুলিশের বিরুদ্ধে হেনস্থা ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন। এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা ও প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন।

২৩ দিনের অনশন থেকে জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন, রাজপথই নেহা বোরার হয়ে ওঠার সাক্ষী

Neha Bora: ২৩ দিন ধরে অনশন করে যেমন তিনি সংবাদমাধ্যমের নজরে এসেছিলেন, তেমনই সম্প্রতি দিল্লির রাজপথে পুলিশের বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও তাঁকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।