ইরান সংকট: হুথিরা যেভাবে বদলে দিল যুদ্ধের মানচিত্র
Iran proxy groups Houthis Hezbollah: হুথি বিদ্রোহীদের সরাসরি যুদ্ধে প্রবেশে কি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন মোড় নিয়েছে? ইরান-ইজরায়েল উত্তেজনার মাঝে তেলপথ ও বাণিজ্য কি বড় সংকটে? এই বহুমুখী যুদ্ধ কি বিশ্ব অর্থনীতি ও কূটনীতিতে আরও বড় প্রভাব ফেলতে চলেছে?
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের মানচিত্র গত কয়েক সপ্তাহে দ্রুত বদলে গিয়েছে। ইরানকে কেন্দ্র করে যে সংঘাত শুরু হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে বহু-মাত্রিক আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সরাসরি যুদ্ধে প্রবেশ ঘটনাটিকে আরও জটিল এবং বিপজ্জনক করে তুলেছে। কারণ, এটি কেবলমাত্র আরেকটি যুদ্ধক্ষেত্র তৈরির বিষয় নয়; এর প্রভাব পড়তে পারে গোটা অঞ্চলের শক্তির সমীকরণে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতিতে এবং ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সম্পর্কের উপরও।
হুথিরা দীর্ঘদিন ধরেই ইয়েমেনের একটি শক্তিশালী সামরিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী। ২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখলের পর থেকে তারা দেশের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের আদর্শিক অবস্থান স্পষ্টভাবে ইরান-ঘনিষ্ঠ এবং তারা নিজেদের 'অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স'-এর অংশ বলে মনে করে। ফলে ইরান যখন সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তখন হুথিদের অংশগ্রহণ অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল। তবে তারা শুরুতে কিছুটা অপেক্ষা করেছিল, সম্ভবত পরিস্থিতি বোঝার জন্য, কিংবা নিজেদের কৌশলগত অবস্থান শক্ত করার জন্য। মার্চের শেষ সপ্তাহে হুথিরা যখন সরাসরি ইজরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে, তখনই বোঝা যায় যে এই যুদ্ধ ধীরে ধীরে এমন এক বড় সংঘাতে পরিণত হচ্ছে, যেখানে একাধিক দেশ জড়িয়ে পড়ছে।
এই ঘটনার তাৎপর্য বুঝতে হলে প্রথমেই দেখতে হবে, হুথিদের ক্ষমতা কতটা। তারা শুধু স্থলযুদ্ধে সীমাবদ্ধ নয়; ড্রোন, মিসাইল এবং সমুদ্রপথে আক্রমণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেও লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। অতীতে গাজা যুদ্ধের সময় তারা লোহিত সাগরে বহু বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছিল, যার ফলে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধাক্কা লাগে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Iran Israel conflict: ইরান সংকটে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ গালিবাফ ও আরাঘচি? এই দুই ব্যাক্তিই কি ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছেন?
এবারের পরিস্থিতি আরও জটিল। কারণ, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালী, ইতোমধ্যেই পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে ইরান। এর সঙ্গে যদি হুথিরা বাব এল-মান্দেব প্রণালীতে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ একসঙ্গে ঝুঁকির মুখে পড়বে। হরমুজ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তেল পরিবাহিত হয়, আর বাব এল-মান্দেব হলো ইউরোপ-এশিয়া বাণিজ্যের একটি প্রধান রুট। এই দুই পথই যদি অচল হয়ে যায় বা ঝুঁকির মুখে পড়ে, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়বে—তেলের দাম বাড়বে, পণ্য পরিবহন ব্যাহত হবে, এবং মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।
ইতোমধ্যেই তার প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধের উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। এর ফলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ভারত-সহ উন্নয়নশীল দেশগুলিও চাপের মুখে পড়তে পারে, কারণ জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। তবে এই ঘটনাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি যুদ্ধকে একটি 'মাল্টি-ফ্রন্ট' সংঘাতে পরিণত করছে। আগে যেখানে ইরান ও ইজরায়েল (এবং তাদের মিত্ররা) মূলত সরাসরি বা সীমিতভাবে লড়াই করছিল, এখন সেখানে ইয়েমেন থেকে হুথিরা, লেবানন থেকে হিজবুল্লাহ, এবং অন্যান্য গোষ্ঠীর জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এই ধরনের বহু-মুখী যুদ্ধ সাধারণত আরও দীর্ঘস্থায়ী এবং অনিয়ন্ত্রিত হয়ে ওঠে। কারণ, এতে একাধিক পক্ষের স্বার্থ জড়িত থাকে, এবং কোনো একক কূটনৈতিক সমাধান সহজে সম্ভব হয় না। হুথিদের প্রবেশ সেই ঝুঁকিকেই বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এর ফলে নতুন করে অস্থির হয়ে উঠতে পারে। বহু বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের পর ২০২২ সালে কিছুটা শান্তি ফিরেছিল। কিন্তু এখন হুথিদের এই পদক্ষেপ সেই শান্তি প্রক্রিয়াকে ভেঙে দিতে পারে। বিশেষ করে সৌদি আরব, যারা আগে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করেছে, তারা আবার সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে, যদি তাদের তেল স্থাপনা বা বাণিজ্যপথ হুমকির মুখে পড়ে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Middle East oil conflict: কেন মোহাম্মদ মোসাদ্দেক-এর জাতীয়করণ ভেঙে দিল সিআইএ-এমআই৬-এর চক্রান্ত? কীভাবে ক্ষমতায় এলেন খামেনি? আজ ইরান কি শেষ ফ্রন্টিয়ার, নাকি নতুন সংঘর্ষের সূচনা?
এখানেই কূটনৈতিক সমীকরণ আরও জটিল হয়ে ওঠে। একদিকে ইরান হুথিদের মতো গোষ্ঠীগুলিকে ব্যবহার করে আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াতে চাইছে, অন্যদিকে সৌদি আরব ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই বিস্তার ঠেকাতে চাইছে। এভাবেই ধীরে ধীরে এই সংঘাত একটি বড় ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠছে।
তবে হুথিদের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে ইরানের নির্দেশে হয়েছে, এমন সরলীকরণ করা যায় না। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, তারা নিজেদের অবস্থানও শক্ত করতে চাইছে। ইয়েমেনের অভ্যন্তরে ক্ষমতা ধরে রাখা, সৌদি আরবের সঙ্গে আর্থিক ও রাজনৈতিক দর কষাকষি, এই সব কারণও তাদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ, হুথিদের এই পদক্ষেপ একাধিক স্তরে কাজ করছে। একদিকে তারা ইরানের পক্ষে একটি সামরিক বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে নিজেদের আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টাও করছে।
যদি হুথিরা কেবল সীমিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখে, তাহলে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে। কিন্তু যদি তারা সমুদ্রপথ অবরোধ বা বৃহৎ আকারের আক্রমণ শুরু করে, তাহলে তা সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতিকে আঘাত করবে এবং আরও দেশকে যুদ্ধে টেনে আনতে পারে। জাতিসংঘ ইতোমধ্যেই সতর্ক করেছে, এই ধরনের উত্তেজনা ইয়েমেনের সংকটকে আরও বাড়িয়ে দেবে এবং দেশটিকে আবার পূর্ণমাত্রার সংঘাতে ঠেলে দিতে পারে।
তবে ওযাকিবহাল মহল বলছে, হুথিদের যুদ্ধে প্রবেশ একটি 'টার্নিং পয়েন্ট'। এটি শুধু যুদ্ধের পরিধি বাড়ায়নি, ঝুঁকিকেও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন আর এটি শুধু ইরান বনাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েলের সংঘাত নয়,এটি একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘর্ষে পরিণত হয়েছএ, যার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে গিয়েও বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিতে পড়তে পারে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, কী ভাবে এই সংঘাতকে সীমাবদ্ধ রাখা যায়। কারণ ইতিহাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে একবার বহু-পক্ষীয় যুদ্ধ শুরু হলে তা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। আর হুথিদের এই পদক্ষেপ সেই আশঙ্কাকেই আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।







