বাম-তৃণমূল নয়, মোদিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারেন এই ব্যক্তিই! কে এই জর্জ সোরোস?
George Soros: জর্জ সোরোস পাউন্ডের দাম কমিয়ে দিয়ে সবচেয়ে বেশি অর্থ লাভ করেন। ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ডের মেরুদণ্ড ভেঙেছেন জর্জই।

বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তিত্ব কে? ভ্লাদিমির পুতিন? জো বাইডেন? কিম জং-উন? নরেন্দ্র মোদি? পরিচিত নামের মধ্যে ঘোরাফেরা করলে নিজেরই ছায়ার সঙ্গে ধাক্কা খেতে হবে। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তি সমস্ত মহাদেশকে চাইলে হেলায় নড়বড়ে করে দিতে পারেন, করেওছেন। পুতিনকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা থেকে শুরু করে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ভেঙে ফেলা- সমস্ত কিছুর নেপথ্যে থাকা মানুষটি সম্প্রতি আদানি-হিন্ডেনবার্গ বিতর্কেও সামনের সারিতে এসেছেন। বিলিয়নেয়ার-জনহিতৈষী জর্জ সোরোস। 'জাতীয়তাবাদের বিস্তারের মোকাবিলা করতে' এবং তাঁর ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শক্তিকে শক্তিশালী করার জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলায় ব্যয় করেছেন জর্জ সোরোস। শাসনভার পরিবর্তনে সমর্থন ও টাকা জোগানোর অভিযোগে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সমালোচিতও তিনি।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রচেষ্টা থেকে গণ অভিবাসনের মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে নড়বড়ে করে দেওয়া, আরব স্প্রিং প্রতিবাদ গোষ্ঠীকে সমর্থন জোগানো এমন নানা কর্মকাণ্ডের জন্য জর্জ সোরোস এবং তাঁর ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনকে 'বিশৃঙ্খলার এজেন্ট' হিসাবেই মনে করে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সরকার এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলি। জর্জ সোরোসই সেই ব্যক্তি যিনি ১৯৯৭ সালে এশিয়ায় আর্থিক সঙ্কট সৃষ্টি করেছিলেন।
জর্জ সোরোস পাউন্ডের দাম কমিয়ে দিয়ে সবচেয়ে বেশি অর্থ লাভ করেন। ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ডের মেরুদণ্ড ভেঙেছেন জর্জই। ব্রিটিশ মুদ্রা পাউন্ডকে কমিয়ে ১ বিলিয়ন ডলার লাভ করেন তিনি। ১৯৯৭ সালে, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড এবং দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি ভেঙে পড়ে এবং মালয়েশিয়া নিজের ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ মন্দার সম্মুখীন হয় জর্জের কারণেই। ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সঙ্কটের সময় জর্জ সোরোস থাইল্যান্ড এবং মালয়েশিয়ার মুদ্রার সাপেক্ষে অভাবনীয় এক বাজি ধরেন। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মহম্মদ জর্জ সোরোসকেই এই সঙ্কটের জন্য দায়ী করেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Leftist Lobby aganist Adani says RSS : আদানির আসলে কোনও দোষই নেই! বামপন্থীরাই একের পর এক প্রচার চালিয়ে তাঁর ইমেজ ভেঙে দিচ্ছে!
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ীই, এশিয়ার সেই আর্থিক সঙ্কটের কারণে বেশ কয়েকটি দেশে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় সেই প্রথম রাষ্ট্রপতি পদে একজন বিরোধী প্রার্থী জয়ী হন। ইন্দোনেশিয়ায়, তিন দশকের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পর সুহার্তো যুগের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু কোন ক্ষমতার বলে জর্জ সোরোস বিভিন্ন রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন সরকারে বদল ঘটিয়ে ফেলেন?
জর্জ সোরোসের ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন দাবি করে যে তাঁর দল সারা বিশ্বের ১২০ টিরও বেশি দেশে ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের মূল্যবোধের প্রচারে সহায়তার কাজ করে৷ সোরোস তাঁর বিপুল সম্পদের কিছু অংশ ব্যবহার করে ১৯৮৪ সালে ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১৭ সালের এক তথ্য বলছে, সোরোস সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সংস্থাটিকে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার দিয়েছেন।
২০২০ সালে সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে একটি বক্তৃতায়, "জাতীয়তাবাদের বিস্তারের মোকাবিলায়" সোরোস আরও ১ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। উল্লেখযোগ্য হলো, ওই বক্তৃতায় তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সমালোচনা করেন। সোরোস বলেছিলেন, "সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনাটি ঘটেছে ভারতে। সেখানে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একটি হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র তৈরি করছেন, আধা-স্বায়ত্তশাসিত মুসলিম অঞ্চল কাশ্মীরে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আরোপ করছেন এবং লাখ লাখ মুসলিমের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন।"
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Adani Controversy: "আমি যে রাজনীতির কথা বলি এবং যে মতাদর্শে বিশ্বাস করি তাতে আদানি গ্রুপের আর্থিকভাবে সমর্থন করা কোনও পুরস্কার পেয়ে আমি খুশি হতে পারব না।"
২০১৬ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার স্পুটনিক দাবি করে যে সোরোসের ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। স্পুটনিকের দাবি ছিল, ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন এবং জর্জ সোরোস নিজের সম্পদ এবং প্রভাবকে ব্যবহার করে বিশ্বব্যাপী বিশৃঙ্খলার বীজ পুঁতে চলেছে যাতে বিশ্বের দুর্ভোগ থেকে আখেরে তারা লাভবান হন এবং আন্তর্জাতিক স্তরে নব্য উদারবাদী ধারণাগুলি জাঁকিয়ে বসে।
শুধু রাশিয়ায় নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির নেপথ্যে সোরোসকেই দায়ী করা হয়। ২০১১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে ওয়াল স্ট্রিট-বিরোধী বিক্ষোভের টাকা জোগানোর অভিযোগ ওঠে জর্জ সোরোসের বিরুদ্ধে। সোরোস এবং বিক্ষোভকারীরা এই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করলেও রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, সোরোস এবং অ্যাডবাস্টারদের মধ্যে পরোক্ষ আর্থিক যোগসূত্র মিলেছে। অ্যাডবাস্টার আসলে একটি পুঁজিবাদবিরোধী কানাডার দল যারা মূলত বিক্ষোভ শুরু করেছিল।
২০১০ এবং ২০১১ সালে মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকায় গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভ এবং বিদ্রোহ শুরু হয় আরব স্প্রিং ছিল গোঁড়া কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিবাদ। বিক্ষোভকারীরা তিউনিসিয়া ও মিশরে সরকার ফেলে দেয়।
সারা বিশ্বের উল্লেখযোগ্য বিতর্কের মধ্যে সোরোসের নাম এবার জড়িয়েছে ভারতের সঙ্গে। সোরোস জানিয়েছেন, গৌতম আদানির জালিয়াতির অভিযোগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এবং সংসদের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। এই বক্তব্যের পরেই বিজেপি সোরোসকে নিশানা করে আক্রমণ শুরু করে। বিজেপির অভিযোগ, কেবল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিই নন, ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে আঙুল তুলছেন সোরোস। আর এই সমস্তটাই করছেন যাতে তাঁর 'বাছাই করা' লোকজন দেশে সরকার চালাতে পারে।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি বলছেন, ব্যক্তিগত লাভের জন্য দেশের গণতান্ত্রিক স্বার্থকে দুর্বল করতে চাইছেন সোরোস। স্মৃতি বলছেন, "তিনি এমন একটি সরকার চান যা তাঁর জঘন্য পরিকল্পনা বাস্তব করে তুলবে, তাঁর মতানুযায়ী চলবে। তাঁর বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে তিনি, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী মোদির মতো 'টার্গেট' নেতাদের জন্য এক বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ সাহায্য ঘোষণা করেছেন।" ভারতের সমস্ত চোখ, আম জনতা এবং সরকারের, ২০২৪ সালের দিকে। সোরোসের এই 'গণতন্ত্র রক্ষার' প্রচেষ্টা ভারতের সরকার ফেলে দেওয়ার মতো যথেষ্ট শক্তপোক্ত কি? আদানি-হিন্ডেনবার্গ বিতর্ককে সামনে রেখে কি ভারতের ভোটবাক্সে আদৌ কোনও ফারাক গড়তে পারবেন জর্জ সোরোস? দেশে বিজেপির সরকার নানা সময়ই, অন্য রাজ্যের সাংসদ কেনা, সরকার ফেলে দেওয়ার মতো কাজে সফল হয়েছে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা ফেলে দেওয়ার মতো ক্ষমতাবানের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বিজেপি যথেষ্ট ঢাল তরোয়াল সামলে রেখেছে কি?






