দিনে শিক্ষক, রাতে ক্যাবচালক, কেন এমন জীবন এক পিএইচডিধারীর?

PhD lecturer: ড. ই. তিরুমলাই রাজা চেন্নাইয়ের প্রেসিডেন্সি কলেজে চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক। মাসে ৩০ হাজার টাকা বেতনে সংসার চালানো কঠিন হওয়ায় ক্লাস শেষে ক্যাব চালান তিনি। একাধিক উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও স্থায়ী চাকরি না পাওয়ার এই ঘটনা ভারতে চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকতার অনিশ্চয়তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

inscript
৩ মিনিট
দিনে শিক্ষক, রাতে ক্যাবচালক, কেন এমন জীবন এক পিএইচডিধারীর?

ভারতে এখনও বহু মানুষ বিশ্বাস করেন, উচ্চশিক্ষাই একটি স্থায়ী ও সম্মানজনক জীবনের চাবিকাঠি। স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এমফিল কিংবা পিএইচডি—একের পর এক ডিগ্রি অর্জনের পর অনেকেই আশা করেন, বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে স্থায়ী শিক্ষকতার সুযোগ মিলবে। কিন্তু বাস্তবের ছবিটা সব সময় এতটা আশাব্যঞ্জক নয়। সম্প্রতি তামিলনাড়ুর এক শিক্ষকের জীবনসংগ্রামের গল্প সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনে দিয়েছে। ইংরেজি সাহিত্যে পিএইচডি করা এই শিক্ষক কলেজে পড়ানোর পাশাপাশি পরিবারের খরচ চালাতে সন্ধ্যাবেলা ক্যাব চালাতে বাধ্য হচ্ছেন। তাঁর গল্প সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর আবারও আলোচনায় এসেছে ভারতের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

এই শিক্ষকের নাম ড. ই. তিরুমলাই রাজা। তিনি বর্তমানে চেন্নাইয়ের প্রেসিডেন্সি কলেজে চুক্তিভিত্তিক প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। মাসে প্রায় ৩০ হাজার টাকা বেতন পান। কিন্তু এই আয়ে সংসারের সমস্ত খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই কলেজে ক্লাস নেওয়ার পর অবসর সময়ে তিনি ক্যাব চালিয়ে অতিরিক্ত আয়ের চেষ্টা করেন। দিনের এক সময় তিনি ছাত্রছাত্রীদের পড়ান, আরেক সময় যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দেন।

ড. রাজার শিক্ষাগত যোগ্যতার তালিকা দীর্ঘ। ইংরেজি সাহিত্যে পিএইচডির পাশাপাশি তাঁর রয়েছে এমফিল, ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর, মনোবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর, বি.এড. এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের ডিপ্লোমা। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যে ‘ব্ল্যাক হিউমার’। বহু গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিথি বক্তা হিসেবেও আমন্ত্রিত হয়েছেন। এত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও এখনও তিনি একটি স্থায়ী শিক্ষকতার পদ পাননি।

বর্তমান চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি নামাক্কালের একটি কলেজে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কাজ করতেন। তখন তাঁর মাসিক বেতন ছিল প্রায় ২০ হাজার টাকা। পরে প্রেসিডেন্সি কলেজে চুক্তিভিত্তিক প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়ে বেতন কিছুটা বাড়লেও সেটি পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। তাঁর স্ত্রী ও দুই স্কুলপড়ুয়া সন্তান এখনও নামাক্কালেই থাকেন, আর কাজের জন্য তাঁকে চেন্নাইয়ে থাকতে হয়। দুই জায়গায় সংসারের খরচ সামলানো তাঁর জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মাত্র ৫-১০ হাজার টাকা দিয়েই শুরু করুন মাশরুম চাষ, বছরে কোটি টাকার ব্যবসার পথ দেখাচ্ছেন জিথু থমাস

Mushroom Farming at Home: বাড়ি বসেই মাশরুম চাষ করে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব—এই কথাটি শুনলে হয়তো অনেকেরই বিশ্বাস হতে চাইবে না। কিন্তু এই অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখিয়েছেন কেরালার পিরাভোমের এক তরুণ, নাম জিথু থমাস। মায়ের সাথে মাত্র একটা ছোট প্যাকেট মাশরুমের বীজ (স্পন) দিয়ে শুরু করে আজ তিনি প্রতি মাসে ১২ লাখ টাকারও বেশি আয় করছেন! তাঁর এই ১৫ বছরের পথচলা আজ দেশের বহু মানুষের কাছে এক দারুণ অনুপ্রেরণা।

এই ঘটনার কথা প্রথম সামনে আসে একটি ভাইরাল এক্স (আগের টুইটার) পোস্টের মাধ্যমে। ভারতীয় রেলের এক কর্মকর্তা অনন্ত রূপনাগুড়ি ড. রাজার সঙ্গে যাত্রাপথে আলাপের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। তিনি লেখেন, ক্যাব চালাতে চালাতে ড. রাজা নিজের পরিচয় দেন। তখনই তিনি জানতে পারেন, তাঁর চালক আসলে একজন পিএইচডিধারী কলেজ শিক্ষক। সেই পোস্টে ড. রাজার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরা হয়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পোস্টটি হাজার হাজার মানুষের নজর কেড়ে নেয় এবং ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এত উচ্চশিক্ষিত একজন মানুষ যদি জীবিকা নির্বাহের জন্য অতিরিক্ত পেশা নিতে বাধ্য হন, তাহলে ভারতের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র কী? অনেকের মতে, দেশের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে চুক্তিভিত্তিক বা অতিথি শিক্ষক নিয়োগের প্রবণতা বেড়েছে। স্থায়ী পদে নিয়োগের গতি কমে যাওয়ায় বহু যোগ্য শিক্ষক বছরের পর বছর অস্থায়ী চাকরিতে কাজ করছেন। তাঁদের বেতন তুলনামূলক কম, চাকরির নিরাপত্তাও নেই।

ড. রাজার কাজ শুধুমাত্র শ্রেণিকক্ষে পড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন প্রশাসনিক ও একাডেমিক দায়িত্বও তিনি পালন করেছেন। পড়ানোর পাশাপাশি পরীক্ষা পরিচালনা, এনএসএস, ইয়ুথ রেড ক্রস এবং ছাত্রছাত্রীদের দক্ষতা উন্নয়নের নানা কাজেও তিনি নিয়মিত যুক্ত। অর্থাৎ একজন পূর্ণাঙ্গ শিক্ষক হিসেবে যে দায়িত্বগুলি পালন করতে হয়, সেগুলির অনেকটাই তিনি করে চলেছেন। তবুও তাঁর চাকরি এখনও স্থায়ী হয়নি।

এই ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির সংগ্রামের কাহিনি নয়, বরং দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় সমস্যাকেও সামনে এনে দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বহু চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি। উচ্চশিক্ষা, গবেষণা এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তাঁদের অনেকেই আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটান। কেউ টিউশন পড়ান, কেউ অন্য পেশায় যুক্ত হন, আবার কেউ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি চালিয়ে যান স্থায়ী চাকরির আশায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগে দীর্ঘসূত্রিতা এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ভবিষ্যতে আরও বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। এতে একদিকে যেমন শিক্ষকদের পেশাগত নিরাপত্তা কমে, অন্যদিকে মেধাবী গবেষক ও শিক্ষকেরা অন্য পেশায় চলে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে শিক্ষার মানের উপরও।

ড. তিরুমলাই রাজার গল্প অনেকের কাছে অনুপ্রেরণারও। কারণ আর্থিক সংকট থাকা সত্ত্বেও তিনি শিক্ষকতার পেশা ছাড়েননি। নিজের আত্মসম্মান বজায় রেখে অতিরিক্ত পরিশ্রম করে পরিবারকে সমর্থন করার পথ বেছে নিয়েছেন। ক্যাব চালানোকে তিনি লজ্জার নয়, বরং দায়িত্ব পালনের একটি উপায় হিসেবে দেখেছেন। তাঁর এই মনোভাব বহু মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে।

তবে একই সঙ্গে তাঁর গল্প একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে। যদি একজন পিএইচডিধারী, গবেষক এবং অভিজ্ঞ শিক্ষককে জীবিকা নির্বাহের জন্য কলেজের ক্লাস শেষে ক্যাব চালাতে হয়, তাহলে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় যোগ্য শিক্ষকদের জন্য স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ কতটা নিশ্চিত?

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

অরুণাচলে ফের মুখোমুখি ভারত-চিন সেনা, বিরোধের নেপথ্যে কী?

India-China Border: সীমান্ত বিরোধ মেটাতে একের পর এক বৈঠক, সামরিক স্তরে আলোচনা এবং শান্তি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও অরুণাচলে ভারত-চিন উত্তেজনা কেন কমছে না? প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা নিয়ে বিরোধের ইতিহাস কী? চিনের সামরিক আধুনিকীকরণের মোকাবিলায় ভারতের প্রস্তুতি কতটা, আর কূটনীতি কি আদৌ স্থায়ী শান্তির পথ দেখাতে পারবে?

মণিপুরে কেন কুকি শিবিরের নিয়ন্ত্রণ নিল যৌথ বাহিনী?

Manipur SoO camp raid: মণিপুরে SoO চুক্তির আওতায় থাকা কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীর শিবিরে ২৪টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার ও ১৭ জনের গ্রেফতারি কি শান্তিচুক্তির নজরদারি ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে আনছে?

১৩ দিন ধরে অনশনে পড়ুয়ারা, কী হচ্ছে জামিয়ায়?

Jamia Millia Islamia protest: ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে পড়ুয়াদের অনশন ও উত্তেজনার জেরে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় ক্লাস অনলাইনে সরিয়ে নেওয়ায় ক্যাম্পাসের অচলাবস্থা কি আদৌ কাটবে, নাকি প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করবে?

জঁ দ্রেজ, কে আপনি?

Jean Dreze Economic Philosophy: দ্রেজের কাছে দারিদ্র্য দূরীকরণ মানে শুধু দরিদ্র পরিবারকে কিছু আর্থিক সাহায্য দেওয়া নয়। প্রয়োজন কাজের সুযোগ, খাদ্যনিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর এমন একটি সামাজিক ব্যবস্থা, যা মানুষকে নিজের জীবন গড়ে তোলার বাস্তব সুযোগ দেয়। দুই প্রশ্নের সময়ক্ষেত্র আলাদা হলেও দুটির দর্শনগত দিক একই—যেখানে শিক্ষা আনে চেতনা, আর চেতনা আনে বিপ্লব।

অরুণাচলে বাঁধবিরোধী আন্দোলনে সংঘর্ষ, কাঁদানে গ্যাসে আহত একাধিক মহিলা

Arunachal Pradesh: সিয়াং নদীর উপর প্রস্তাবিত বৃহৎ বাঁধ প্রকল্পের বিরোধিতায় ২৩ অক্টোবর, রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় বন্ধের ডাক দেওয়া হয়েছিল। সেই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়।

পুজোর আচার না মানলে... তিন খ্রিস্টান পরবিবারের উপর চড়াও বজরং দল

১৯ অক্টোবর লক্ষ্মী মণ্ডল, তাঁর স্বামী, বনশ্রী মণ্ডল ও তাঁর স্বামী গোপাল মণ্ডল-সহ কয়েকজনকে জোর করে ডিঙ্গল গ্রামের একটি দুর্গাপুজোর মণ্ডপে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্মীয় আচার পালন করতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।

SBI Data Leak: কীভাবে ফাঁস হলো ৩,৮৯৭ গ্রাহকের তথ্য? কীভাবে সুরক্ষিত রাখবেন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট?

SBI Data Leak: SBI-এর ৩,৮৯৭ গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য ডার্ক ওয়েবে ফাঁস হওয়ার ঘটনায় কতটা ঝুঁকিতে আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট? সাইবার প্রতারণা থেকে নিজের টাকা সুরক্ষিত রাখতে কী কী সতর্কতা অবলম্বন করবেন?

নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্যের অভিযোগে পদক্ষেপ করেনি কেন্দ্র, আরটিআইতে সামনে এল চিঠি চালাচালির তথ্য

ECI RTI revelation: নির্বাচন কমিশনের অন্দরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দুই কমিশনারের অসন্তোষ ও মন্ত্রিসচিবকে চিঠি দেওয়ার ঘটনাটি আরটিআই নথিতে কীভাবে প্রকাশ্যে এল, এবং সাংবিধানিক স্বায়ত্তশাসনের স্বার্থে সচিবালয় কেন সরাসরি পদক্ষেপে বিরত থাকল?