দিনে শিক্ষক, রাতে ক্যাবচালক, কেন এমন জীবন এক পিএইচডিধারীর?
PhD lecturer: ড. ই. তিরুমলাই রাজা চেন্নাইয়ের প্রেসিডেন্সি কলেজে চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক। মাসে ৩০ হাজার টাকা বেতনে সংসার চালানো কঠিন হওয়ায় ক্লাস শেষে ক্যাব চালান তিনি। একাধিক উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও স্থায়ী চাকরি না পাওয়ার এই ঘটনা ভারতে চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকতার অনিশ্চয়তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
ভারতে এখনও বহু মানুষ বিশ্বাস করেন, উচ্চশিক্ষাই একটি স্থায়ী ও সম্মানজনক জীবনের চাবিকাঠি। স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এমফিল কিংবা পিএইচডি—একের পর এক ডিগ্রি অর্জনের পর অনেকেই আশা করেন, বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে স্থায়ী শিক্ষকতার সুযোগ মিলবে। কিন্তু বাস্তবের ছবিটা সব সময় এতটা আশাব্যঞ্জক নয়। সম্প্রতি তামিলনাড়ুর এক শিক্ষকের জীবনসংগ্রামের গল্প সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনে দিয়েছে। ইংরেজি সাহিত্যে পিএইচডি করা এই শিক্ষক কলেজে পড়ানোর পাশাপাশি পরিবারের খরচ চালাতে সন্ধ্যাবেলা ক্যাব চালাতে বাধ্য হচ্ছেন। তাঁর গল্প সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর আবারও আলোচনায় এসেছে ভারতের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
এই শিক্ষকের নাম ড. ই. তিরুমলাই রাজা। তিনি বর্তমানে চেন্নাইয়ের প্রেসিডেন্সি কলেজে চুক্তিভিত্তিক প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। মাসে প্রায় ৩০ হাজার টাকা বেতন পান। কিন্তু এই আয়ে সংসারের সমস্ত খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই কলেজে ক্লাস নেওয়ার পর অবসর সময়ে তিনি ক্যাব চালিয়ে অতিরিক্ত আয়ের চেষ্টা করেন। দিনের এক সময় তিনি ছাত্রছাত্রীদের পড়ান, আরেক সময় যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দেন।
ড. রাজার শিক্ষাগত যোগ্যতার তালিকা দীর্ঘ। ইংরেজি সাহিত্যে পিএইচডির পাশাপাশি তাঁর রয়েছে এমফিল, ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর, মনোবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর, বি.এড. এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের ডিপ্লোমা। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যে ‘ব্ল্যাক হিউমার’। বহু গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিথি বক্তা হিসেবেও আমন্ত্রিত হয়েছেন। এত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও এখনও তিনি একটি স্থায়ী শিক্ষকতার পদ পাননি।
বর্তমান চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি নামাক্কালের একটি কলেজে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কাজ করতেন। তখন তাঁর মাসিক বেতন ছিল প্রায় ২০ হাজার টাকা। পরে প্রেসিডেন্সি কলেজে চুক্তিভিত্তিক প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়ে বেতন কিছুটা বাড়লেও সেটি পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। তাঁর স্ত্রী ও দুই স্কুলপড়ুয়া সন্তান এখনও নামাক্কালেই থাকেন, আর কাজের জন্য তাঁকে চেন্নাইয়ে থাকতে হয়। দুই জায়গায় সংসারের খরচ সামলানো তাঁর জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Mushroom Farming at Home: বাড়ি বসেই মাশরুম চাষ করে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব—এই কথাটি শুনলে হয়তো অনেকেরই বিশ্বাস হতে চাইবে না। কিন্তু এই অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখিয়েছেন কেরালার পিরাভোমের এক তরুণ, নাম জিথু থমাস। মায়ের সাথে মাত্র একটা ছোট প্যাকেট মাশরুমের বীজ (স্পন) দিয়ে শুরু করে আজ তিনি প্রতি মাসে ১২ লাখ টাকারও বেশি আয় করছেন! তাঁর এই ১৫ বছরের পথচলা আজ দেশের বহু মানুষের কাছে এক দারুণ অনুপ্রেরণা।
এই ঘটনার কথা প্রথম সামনে আসে একটি ভাইরাল এক্স (আগের টুইটার) পোস্টের মাধ্যমে। ভারতীয় রেলের এক কর্মকর্তা অনন্ত রূপনাগুড়ি ড. রাজার সঙ্গে যাত্রাপথে আলাপের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। তিনি লেখেন, ক্যাব চালাতে চালাতে ড. রাজা নিজের পরিচয় দেন। তখনই তিনি জানতে পারেন, তাঁর চালক আসলে একজন পিএইচডিধারী কলেজ শিক্ষক। সেই পোস্টে ড. রাজার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরা হয়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পোস্টটি হাজার হাজার মানুষের নজর কেড়ে নেয় এবং ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এত উচ্চশিক্ষিত একজন মানুষ যদি জীবিকা নির্বাহের জন্য অতিরিক্ত পেশা নিতে বাধ্য হন, তাহলে ভারতের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র কী? অনেকের মতে, দেশের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে চুক্তিভিত্তিক বা অতিথি শিক্ষক নিয়োগের প্রবণতা বেড়েছে। স্থায়ী পদে নিয়োগের গতি কমে যাওয়ায় বহু যোগ্য শিক্ষক বছরের পর বছর অস্থায়ী চাকরিতে কাজ করছেন। তাঁদের বেতন তুলনামূলক কম, চাকরির নিরাপত্তাও নেই।
ড. রাজার কাজ শুধুমাত্র শ্রেণিকক্ষে পড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন প্রশাসনিক ও একাডেমিক দায়িত্বও তিনি পালন করেছেন। পড়ানোর পাশাপাশি পরীক্ষা পরিচালনা, এনএসএস, ইয়ুথ রেড ক্রস এবং ছাত্রছাত্রীদের দক্ষতা উন্নয়নের নানা কাজেও তিনি নিয়মিত যুক্ত। অর্থাৎ একজন পূর্ণাঙ্গ শিক্ষক হিসেবে যে দায়িত্বগুলি পালন করতে হয়, সেগুলির অনেকটাই তিনি করে চলেছেন। তবুও তাঁর চাকরি এখনও স্থায়ী হয়নি।
এই ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির সংগ্রামের কাহিনি নয়, বরং দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় সমস্যাকেও সামনে এনে দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বহু চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি। উচ্চশিক্ষা, গবেষণা এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তাঁদের অনেকেই আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটান। কেউ টিউশন পড়ান, কেউ অন্য পেশায় যুক্ত হন, আবার কেউ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি চালিয়ে যান স্থায়ী চাকরির আশায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগে দীর্ঘসূত্রিতা এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ভবিষ্যতে আরও বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। এতে একদিকে যেমন শিক্ষকদের পেশাগত নিরাপত্তা কমে, অন্যদিকে মেধাবী গবেষক ও শিক্ষকেরা অন্য পেশায় চলে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে শিক্ষার মানের উপরও।
ড. তিরুমলাই রাজার গল্প অনেকের কাছে অনুপ্রেরণারও। কারণ আর্থিক সংকট থাকা সত্ত্বেও তিনি শিক্ষকতার পেশা ছাড়েননি। নিজের আত্মসম্মান বজায় রেখে অতিরিক্ত পরিশ্রম করে পরিবারকে সমর্থন করার পথ বেছে নিয়েছেন। ক্যাব চালানোকে তিনি লজ্জার নয়, বরং দায়িত্ব পালনের একটি উপায় হিসেবে দেখেছেন। তাঁর এই মনোভাব বহু মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
তবে একই সঙ্গে তাঁর গল্প একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে। যদি একজন পিএইচডিধারী, গবেষক এবং অভিজ্ঞ শিক্ষককে জীবিকা নির্বাহের জন্য কলেজের ক্লাস শেষে ক্যাব চালাতে হয়, তাহলে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় যোগ্য শিক্ষকদের জন্য স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ কতটা নিশ্চিত?






