মাত্র ৫-১০ হাজার টাকা দিয়েই শুরু করুন মাশরুম চাষ, বছরে কোটি টাকার ব্যবসার পথ দেখাচ্ছেন জিথু থমাস
Mushroom Farming at Home: বাড়ি বসেই মাশরুম চাষ করে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব—এই কথাটি শুনলে হয়তো অনেকেরই বিশ্বাস হতে চাইবে না। কিন্তু এই অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখিয়েছেন কেরালার পিরাভোমের এক তরুণ, নাম জিথু থমাস। মায়ের সাথে মাত্র একটা ছোট প্যাকেট মাশরুমের বীজ (স্পন) দিয়ে শুরু করে আজ তিনি প্রতি মাসে ১২ লাখ টাকারও বেশি আয় করছেন! তাঁর এই ১৫ বছরের পথচলা আজ দেশের বহু মানুষের কাছে এক দারুণ অনুপ্রেরণা।
২০১০ সাল। কেরালার যুবক জিথু থমাস পড়াশোনা শেষ করার পর একটি এনজিওতে কাজ শুরু করেন। সেই সময় স্রেফ শখের বশে মায়ের জন্য একটা মাশরুমের বেড তৈরি করে দেন। কিন্তু কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় অনেক ভুলভ্রান্তি হতে থাকে। কিন্তু হাল ছাড়েননি মা-ছেলে। প্রতিটি ভুল থেকে তাঁরা নতুন নতুন জিনিস শিখেছেন।
২০১৯ সালে তাঁরা 'লীনাস মাশরুম ফার্মস' (Leena’s Mushroom Farms) নামে নিজেদের একটি ব্র্যান্ড চালু করেন মা-ছেলে। আজ প্রায় ৫০০০ স্কয়ার ফিটের একটি আধুনিক খামারে ২০,০০০ বেডের ধারণক্ষমতা নিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৫০ থেকে ২০০ কেজি তাজা মাশরুম উৎপাদিত হচ্ছে সেখানে! বর্তমানে এটি একটি সফল প্রফেশনাল অ্যাগ্রিবিজনেস (LLP) হিসেবে দাঁড়িয়ে গিয়েছে, যার বার্ষিক টার্নওভার ৩ কোটি টাকারও বেশি! তাঁদের এই খামারে ১৫ জন কর্মী কাজ করেন, যার মধ্যে ৮০%ই স্থানীয় নারী।
একদিন যে মা-ছেলে বারবার ভুল করতে থাকে, আজ তাঁরাই এত সফল। কীভাবে? মাশরুম চাষে জিথু ও তাঁর মায়ের সফলতার মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে কয়েকটি বিশেষ নিয়মের মধ্যে। তাই, নতুন যারা শুরু করতে চান, তাদের জন্য জিথু কয়েকটি পরামর্শ দেন।
মাশরুম চাষে শুরু করতে হলে, অয়েস্টার মাশরুম (Oyster Mushrooms) দিয়ে শুরু করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। অন্য যেকোনো জাতের চেয়ে এটি খুব দ্রুত বাড়ে এবং প্রথমবার যারা চাষ করছেন, তাঁদের জন্য এটি সামলানো বেশ সহজ হয়।
ভালো ও স্বাস্থ্যকর মাশরুম পাওয়ার আসল রহস্য হলো উন্নত মানের বীজ (Spawn)। বীজ সব সময় কোনো বিশ্বস্ত বিক্রেতা কিংবা অভিজ্ঞ চাষির কাছ থেকেই কেনা উচিত, কারণ নিম্নমানের বীজ আপনার পুরো খামারের ফলনই নষ্ট করে দিতে পারে।
শুরুতেই অনেক টাকা বিনিয়োগ করে বড় খামারের ঝুঁকি না নেওয়াই ভালো। ঘরের বারান্দা, করিডোর কিংবা যেকোনো ছোট জায়গায় মাত্র কয়েকটি গ্রো-ব্যাগ (Grow Bags) দিয়ে চাষ শুরু করা ভালো। ছোটখাটোভাবে শুরু করলে খুব বেশি টাকা লোকসানের ঝুঁকি ছাড়াই পুরো চাষ পদ্ধতিটি ভালোভাবে বুঝে নিতে পারা যাবে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Mahua liquor: পৃথিবীতে ফুল থেকে তৈরি হওয়া হাতেগোনা কয়েকটি অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়ের মধ্যে মহুয়া অন্যতম। এটি শুধু একটি পানীয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতের গভীর জঙ্গল, আদিবাসী সংস্কৃতি এবং এক দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস। কিন্তু জংলি ফুল দিয়ে তৈরি মহুয়া এখন আর স্রেফ ‘কান্ট্রি লিকার’ নয়, বরং হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক লাক্সারি ব্র্যান্ড।
শুরুতেই একদম নিখুঁত ফলের আশা না করাই উচিৎ। প্রথম কয়েকটা মাস মাশরুম কীভাবে বাড়ে তা ভালো করে খেয়াল করে চাষের সাধারণ সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করতে হবে এবং প্রতিবারের ফলন থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে আস্তে আস্তে নিজেকে আরও উন্নত করে তুলতে হবে।
অয়েস্টার মাশরুম যেমন দ্রুত বাড়ে, তেমনই এগুলি কিন্তু বেশ নরম আর সংবেদনশীল। তাই তাপমাত্রার সামান্য হেরফের কিংবা পোকা-মাকড়ের আক্রমণ যদি একদম শুরুর দিকে ধরা না পড়ে, তবে তা আপনার পুরো ফলন নষ্ট করে দিতে পারে।
চারপাশের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং মাশরুম বাড়ার জন্য অনুকূল আবহাওয়া—এই দুটি জিনিসই পুরো ফলনে আসল তফাত গড়ে দেয়। নিয়মিত দেখভাল করলে কোনো রকম সংক্রমণ বা ছত্রাকের আক্রমণ ছড়াতে পারে না এবং মাশরুমগুলি বেশ স্বাস্থ্যকরভাবে বেড়ে ওঠে।
মাশরুম চাষ করা খুব একটা কঠিন কাজ নয়, তবে এর জন্য নিয়মিত শৃঙ্খলা বা নিয়মানুবর্তিতা প্রয়োজন। ছোট আকারে চাষ করে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়ে গেলে, ধাপে ধাপে খামারের পরিধি বাড়ানো যায়। ধৈর্য, নিয়মিত অনুশীলন এবং সঠিক পদ্ধতিই হলো সফলতার মূল ভিত্তি।
জিথুর এই দীর্ঘ যাত্রাপথ কিন্তু মসৃণ ছিল না। কেরালায় দুই দুইবারের ভয়াবহ বন্যা এবং এরপর কোভিড-১৯ অতিমারির মতো বড় বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁদের পরিবারকে। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা আর আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে তাঁরা সেই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠেন।
কেরালার মতো গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় মাশরুমের জন্য পারফেক্ট আবহাওয়া তৈরি করতে জিথু তাঁর ফার্মে 'ফ্যান অ্যান্ড প্যাড টেকনোলজি' (Fan and Pad Technology) বা এভাপোরেটিভ কুলিং সিস্টেম ব্যবহার করেছেন। এটি এমন এক প্রযুক্তি, যেখানে একদিকের ভেজা প্যাডের মধ্য দিয়ে বাতাস টেনে অন্যদিকের শক্তিশালী এক্সহস্ট ফ্যান দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। এর ফলে বাইরের আবহাওয়া যেমনই হোক না কেন, খামারের ভিতরের তাপমাত্রা (২০-২৮°C) এবং আর্দ্রতা (৮৫-৯৫%) একদম নিয়ন্ত্রণে থাকে। সাধারণ এসির তুলনায় এতে বিদ্যুৎ খরচ অনেক কম হয় এবং সারা বছর নিশ্চিত ফলন পাওয়া যায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Made in India A Titan Story: আমাজন এমএক্স প্লেয়ারে (Amazon MX Player) রিলিজ হওয়া ৬ এপিসোডের এই সিরিজটি মাত্র তিন সপ্তাহেই বাজিমাত করেছে। ওরম্যাক্স মিডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী, ১ কোটি ৩৭ লক্ষেরও বেশি ভিউ নিয়ে এটি এই বছরের অন্যতম সফল এবং সবচেয়ে বেশি দেখা ভারতীয় ওয়েব সিরিজ হয়ে উঠেছে।
আপনি যদি জিথুর গল্পে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের বাড়ির বারান্দা বা ছোট কোনো ঘরে অয়েস্টার মাশরুম চাষ করতে চান, তবে নিচে দেওয়া সহজ ধাপগুলি অনুসরণ করতে পারেন:
প্রথমে বাজার থেকে ভালো জাতের অয়েস্টার মাশরুমের বীজ (গ্রেইন স্পন) কিনে নিন। এর সঙ্গে মাশরুমের খাবার বা সাবস্ট্রেট হিসেবে লাগবে শুকনো ধানের খড়। খড় খুবই সস্তা এবং নতুনদের জন্য সবচেয়ে ভালো। এ ছাড়া লাগবে মাশরুম চাষের বিশেষ ব্যাগ বা প্লাস্টিকের বালতি (ড্রিল করে ছিদ্র করা)।
খড় জীবাণুমুক্ত করা
ধানের খড়গুলিকে প্রথমে ছোট ছোট করে (৪-৫ ইঞ্চি) কেটে নিতে হবে। এরপর সেগুলি গরম জলে (৬৫-৮০°C) ১ থেকে ২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে ভালো করে সেদ্ধ বা জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে। সেদ্ধ করার পর খড়গুলি জলপাই রঙের হয়ে যাবে। এবার জল ভালো করে ঝরিয়ে নিয়ে একটু ঠান্ডা করে নিন। খড় কতটুকু ভেজা থাকবে তা বোঝার উপায় হলো—হাতে নিয়ে চাপ দিলে যেন জল চুঁইয়ে না পড়ে, কিন্তু হাতটা যেন ভেজা ভেজা লাগে।
বীজ মেশানো
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Waguv Kashmir: ‘ওয়াগুভ’ কাশ্মীরের ঐতিহ্যবাহী এক ধরনের মাদুর বা গালিচা। প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো এই শিল্পে কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতির ছোঁয়া থাকে না। পুরোপুরি প্রাকৃতিকভাবে তৈরি এই মাদুর বোনার মূল উপাদান হলো শুকনো ধানের খড় আর কাশ্মীরের বিভিন্ন জলাভূমি থেকে সংগ্রহ করা এক বিশেষ ধরনের লম্বা ঘাস বা নলখাগড়া, যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘পেইচ’।
যে জায়গায় কাজ করবেন, সেটি যেন একদম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়। এবার জীবাণুমুক্ত করা খড়ের সঙ্গে ভালো করে মাশরুমের বীজ মিশিয়ে দিন (সাধারণত মোট খড়ের ওজনের ৫-১০% বীজ মেশাতে হয়)। এরপর মিশ্রণটি প্লাস্টিকের ব্যাগে ভালো করে চেপে চেপে ভরে মুখটা আটকে দিন এবং ব্যাগের গায়ে ছোট ছোট কয়েকটা ছিদ্র করে দিন।
অন্ধকার ঘরে রাখা
তৈরি করা এই ব্যাগগুলিকে একটি অন্ধকার ও সামান্য গরম (২০-২৪°C) জায়গায় ১৪ থেকে ২১ দিনের জন্য রেখে দিন। এই দিনগুলিতে মাশরুমের মাইসেলিয়াম বা সাদা সুতোর মতো অংশ পুরো খড়ে ছড়িয়ে পড়বে। যখন দেখবেন পুরো ব্যাগটি ধবধবে সাদা হয়ে গিয়েছে, তখন বুঝবেন এটি পরবর্তী ধাপের জন্য তৈরি।
আলো-বাতাসে আনা ও ফলন
ব্যাগটি সাদা হয়ে যাওয়ার পর সেটিকে এমন জায়গায় রাখুন যেখানে হালকা আলো (সরাসরি রোদ নয়) এবং প্রচুর তাজা বাতাস পাওয়া যায়। ব্যাগের আর্দ্রতা বজায় রাখতে দিনে অন্তত দুবার পরিষ্কার জল স্প্রে করুন। ৭ দিনের মধ্যে ছোট ছোট মাশরুমের পিন বের হতে দেখাবে এবং ২-৩ দিনের মধ্যেই সেগুলি পুরোপুরি বড় হয়ে যাবে।
ফসল সংগ্রহ
মাশরুমের উপরের ছাতার মতো অংশটি যখন চ্যাপ্টা হতে শুরু করবে, ঠিক তার আগেই গোড়া থেকে হালকা মুচড়ে মাশরুম তুলে নিন। একবার তৈরি করা একটা খড়ের ব্যাগ থেকে আপনি অন্তত ২ থেকে ৩ বার মাশরুম সংগ্রহ করতে পারবেন।
মাশরুম চাষের সুবিধা হলো, এতে খুব অল্প জায়গায় এবং নামমাত্র খরচে মাত্র ৩ থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যেই পুষ্টিকর ও সুস্বাদু ফসল পাওয়া যায়। মাশরুমে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন ও ভিটামিন ডি থাকে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে দারুণ কার্যকরী।
জিথু থমাসের জীবনের গল্প আমাদের শেখায় যে, কোনো কাজই ছোট নয়। নিজের ঘরের বারান্দা থেকে মাত্র ৫-১০ হাজার টাকা খরচ করে শুরু করা একটা ছোট শখও যে ধৈর্য, নিয়মানুবর্তিতা আর সঠিক প্রযুক্তির হাত ধরে কোটি টাকার লাভজনক ব্যবসায় রূপ নিতে পারে—জিথু ও তাঁর মা লিনা থমাস তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আপনিও যদি শুরু করতে চান, তবে আজই ছোট্ট করে ২-৩টি ব্যাগ দিয়ে আপনার মাশরুম চাষের যাত্রা শুরু করে দিতে পারেন।









