বহু দশক পর কেন সরাসরি আলোচনায় ইজরায়েল ও লেবানন?
Israel-Lebanon Direct Talks: ইজরায়েল ও লেবানন কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবার সরাসরি আলোচনায় বসল কেন? সীমান্ত সংঘাত, হিজাবুল্লার ভূমিকা, যুদ্ধবিরতি এবং মার্কিন মধ্যস্থতার মধ্যে কী বদল ঘটল? এই বৈঠক কি পশ্চিম এশিয়ায় নতুন কূটনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে?
ইজরায়েল ও লেবাননের মধ্যে সরাসরি বৈঠক বহু দশক ধরেই কার্যত অসম্ভব বলে মনে করা হত। কারণ, দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, সীমান্তে প্রায়ই সংঘর্ষ হয়, আর লেবাননের শক্তিশালী সশস্ত্র সংগঠন হিজাবুল্লাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বহু বছর ধরেই চলছে। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে ওয়াশিংটনে দুই দেশের প্রতিনিধিদের সরাসরি আলোচনায় বসা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিয়োর উদ্যোগে ওয়াশিংটনে এই বৈঠক হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন আমেরিকায় নিযুক্ত ইজরায়েল ও লেবাননের রাষ্ট্রদূতরা। এটিকে দুই দেশের মধ্যে ১৯৯৩ সালের পর প্রথম বড়সড় উচ্চপর্যায়ের সরাসরি যোগাযোগ বলে মনে করা হচ্ছে।
এই বৈঠকের পিছনে রয়েছে গত কয়েক মাসের ভয়াবহ সংঘর্ষ। ২০২৬ সালে ইরান, ইজরায়েল এবং আমেরিকাকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেই সংঘর্ষে লেবাননের হিজবুল্লা ইজরায়েলের বিরুদ্ধে রকেট হামলা চালায়। পাল্টা ইজরায়েল দক্ষিণ লেবানন ও বেইরুতের নানা জায়গায় বড় আকারের বোমাবর্ষণ শুরু করে। এর ফলে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং বহু মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Strait of Hormuz crisis: হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রো নৌ অবরোধ করছে। এই পদক্ষেপে কি বিশ্ব জ্বালানি বাজারে আবারও বড় সংকট তৈরি হবে? বাড়বে যুদ্ধের আশঙ্কা? নাকি এটি কেবল কূটনৈতিক চাপের কৌশল, যার লক্ষ্য ইরানকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনা?
এই পরিস্থিতিতে লেবানন চাইছে যুদ্ধবিরতি, মানবিক সাহায্য এবং সীমান্তে স্থিতিশীলতা ফিরুক। অন্যদিকে ইজরায়েল বলছে, তারা কোনো স্থায়ী সমাধানের কথা ভাববে না যতক্ষণ না হিজাবুল্লাকে নিরস্ত্র করার জন্য স্পষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ইজরায়েলের দাবি, লেবাননের মাটিতে হিজাবুল্লার উপস্থিতিই সীমান্তে অশান্তির মূল কারণ।
এই বৈঠকে তাৎক্ষণিক কোনো শান্তিচুক্তি হয়নি। তবে দুই পক্ষই জানিয়েছে, আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুই দেশ 'উভয় দেশের নিরাপত্তা' নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা শুরু করতে সম্মত হয়েছে। অর্থাৎ সীমান্ত, নিরাপত্তা, যুদ্ধবিরতি, হিজাবুল্লার ভূমিকা এবং ভবিষ্যতে বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়গুলি নিয়ে ধাপে ধাপে কথা এগোতে পারে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Iran-US Peace Talks: ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টার বৈঠকেও কেন ভেঙে গেল ইরান-আমেরিকা শান্তি আলোচনা? ইউরেনিয়াম ইস্যু, নিষেধাজ্ঞা নাকি আঞ্চলিক প্রভাব—কোন মতভেদ সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াল?
এই আলোচনার আরেকটি বড় দিক হলো, লেবাননের ভিতরেও এখন হিজাবুল্লারর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বহু মানুষ মনে করছেন, ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা এই সংগঠনটি লেবাননকে বারবার যুদ্ধে টেনে আনছে। ফলে লেবাননের সরকারও এখন আগের তুলনায় বেশি করে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার কথা বলছে। তারা চাইছে, দক্ষিণ লেবাননের নিরাপত্তা সেনাবাহিনীর হাতে থাকুক এবং আন্তর্জাতিক প্রস্তাব অনুযায়ী সীমান্ত এলাকা থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে সরানো হোক।
তবে এই আলোচনার সামনে বড় বাধাও রয়েছে। হিজাবুল্লা ইতোমধ্যেই জানিয়েছে, তারা এই বৈঠককে সমর্থন করে না। তাদের বক্তব্য, ইজরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা লেবাননের স্বার্থবিরোধী। ফলে সরকারের অবস্থান ও হিজাবুল্লার অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট ফারাক দেখা যাচ্ছে।
এর পাশাপাশি লেবাননের সাধারণ মানুষের মধ্যেও সন্দেহ রয়েছে। কারণ, অতীতের যুদ্ধবিরতি চুক্তি বহুবার ভেঙেছে। রাষ্ট্রসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীও আগের চুক্তি লঙ্ঘনের বহু অভিযোগ নথিভুক্ত করেছে। তাই অনেকেই মনে করছেন, শুধু বৈঠক হলেই শান্তি ফিরবে না। বাস্তবে সীমান্তে গোলাগুলি বন্ধ হওয়া এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখানোই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
তবু আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এই বৈঠক মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। কারণ, কয়েক দশক ধরে শত্রুতাপূর্ণ সম্পর্ক থাকা দুই দেশ অন্তত প্রথমবার মুখোমুখি বসে কথা বলছে। শান্তির পথ এখনও অনেক দূরের, কিন্তু আলোচনার টেবিলে বসাটাই আপাতত সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।





