কংগ্রেস ছাড়লেন গুলাম নবি আজাদ, ২০২৪ এর আগে হাতমুক্ত হবে দেশ?
Ghulam Nabi Azad resigned from Congress: কেন হাত ছাড়লেন এই বর্ষীয়ান নেতা?

সুনীল জাখর, হার্দিক প্যাটেল, কপিল সিব্বল, গুলাম নবি আজাদ...
এরপর কে?
লাইনে কি আনন্দ শর্মা?
২৪ আখবর রোডে এখন ভাঙনের চোরা স্রোত। কংগ্রেসের ভাঙা তরী মেরামতের সম্ভাবনা ক্রমশই ম্মাল হয়ে আসছে। হাত শিবিরে এখন ঘরে-বাইরে কালো মেঘ। সুনীল জাখর, হার্দিক প্যাটেল, কপিল সিব্বল আগেই দল ছেড়েছেন। তারপর সেই ফাটল আরও চওড়া হয়েছে গুলাম নবি আজাদের সৌজন্য। দিন কয়েক আগে তিনি জম্মু কাশ্মীরের প্রচার কমিটি থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। সেই ক্ষত মেরামতির চেষ্টা করেনি হাই কমান্ড। ফল আর একটা উইকেটের পতন। এদিকে কিছুদিন আগে হিমাচল প্রদেশ কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন আনন্দ শর্মা। সামনেই হিমাচল প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচন। তার আগে আনন্দ শর্মার এই পদত্যাগ দলের কাছে বড় ধাক্কা বলেই মনে করছেন হিমাচল প্রদেশের কংগ্রেস নেতাদের একাংশ। তিনি আবার দলত্যাগ করেন কিনা এবং বিজেপিতে যান কিনা, তানিয়েও আলোচনা চলছে জোরদার। এই অবস্থায় রাহুলের নেতৃত্বকে দুষে দল ছাড়লেন গুলাম নবি আজাদ। ইঙ্গিতটা আগেই ছিল, কেন হাইকান্ড প্রবীণ, অভিজ্ঞ নেতাদের রাখার চেষ্টা করছে না, এটাই প্রশ্ন। শতাব্দী প্রাচীন দলের এটা কি শিশুসুলভ আচরণ নয়? যাওয়ার আগে সেই দিকে আঙুল তুললেন আজাদ।
কেন হাত ছাড়লেন
রাহুল গান্ধীকে বিঁধে কংগ্রেসের `হাত’ ছাড়লেন বর্ষীয়ান নেতা গুলাম নবি আজাদ। কংগ্রেসের সব পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন তিনি। শুক্রবার কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীকে পদত্যাগপত্রে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন তিনি। লিখেছেন,
'দেশের জন্য যা ভালো, তা করতে ব্যর্থ হয়েছে কংগ্রেস।'
পাঁচ পাতার পদত্যাগপত্রে গুলাম নবি লিখেছেন,
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
২০২৪-কে সামনে রেখে বিরোধীরা যখন ঘুঁটি সাজাতে ব্যস্ত, তখন কংগ্রেসের এ কী হাল! রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বারবার বলছেন, এক্ষেত্রে কংগ্রেসকে বড় ভূমিকা নিতে হবে।
গোটা সাংগঠনিক নির্বাচনী প্রক্রিয়াই একটা প্রহসন।
এরপরে রাহুলকে নিশানা করেন তিনি। বলেন,
এই সব ঘটেছে তাঁর জন্য, কারণ, গত ৮ বছর যিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি একজন `অপরিণত ব্যক্তিত্ব’।
এমনকী বিভিন্ন নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবির জন্য রাহুলকে কাঠগড়ায় তুলেছেন আজাদ।
রাহুলকে নিশানা করে গুলাম লিখেছেন,
অপরিণত হওয়ার সবচেয়ে জ্বলন্ত উদাহারণগুলির মধ্যে একটি হল, সংবাদমাধ্যমের সামনে রাহুলের সরকারি অধ্যাদেশ ছেঁড়া...। এই ধরণের শিশুসুলভ আচরণ প্রধানমন্ত্রী ও ভারত সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে ইউপিএ সরকারের পরাজয়ের নেপথ্যে যে অবদানগুলি রয়েছে, তার মধ্যে এটি অন্যতম।
কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ দিনের সম্পর্কের কথা যেমন পদত্যাগপত্রে তুলে ধরেছেন, গুলাম নবি আজাদ, তেমনই দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে `নিবিড় সম্পর্কের’ প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন।
জি ২৩ গ্রুপ ও বিরোধী মঞ্চ
দিন কয়েক আগে জম্মু ও কাশ্মীরের প্রচার কমিটি এবং রাজনৈতিক প্যানেল থেকে ইস্তফা দেন গুলাম নবি আজাদ। এবার দলত্যাগ করলেন। ২০২০ সালের অগাস্টে যে ২৩ জন নেতা সোনিয়াকে চিঠি দিয়ে দলীয় নির্বাচন এবং স্থায়ী সভাপতি নিয়োগের দাবি জানিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন আনন্দ শর্মা এবং আজাদ দু’জনেই। এবার কয়েক দিনের মধ্যে দুই জনেই দলীয় পদ ছাড়লেন। তাই প্রশ্ন, আবারও কি কংগ্রেসে শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মাথাচাড়া দিচ্ছে বিক্ষোভ? গুলাম নবি আজাদের পর আনন্দ শর্মা কী করেন, তাই নিয়ে বেশি করে প্রশ্ন মাথাচাড়া দিয়েছে।
দলের ওয়ার্কিং কমিটিতে ইতিমধ্যে বিরোধী মঞ্চ তৈরি হয়েছে। প্রবীণ নেতাদের নিয়ে তৈরি হয়েছে জি২৩ গ্রুপ। এঁরা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সমালোচক বলেই পরিচিত। এই গ্রুপে ভূপিন্দর সিং হুডা, মণীশ তিওয়ারি, গুলাম নবি আজাদ (ছিলেন), আনন্দ শর্মার নাম রয়েছে। ওয়ার্কিং কমিটির এই গ্রুপ ব্লক থেকে দলের সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত নির্বাচনের মাধ্যমে দল গঠনে জোর দেওয়ার দাবি গত কয়েক বছর ধরে করে আসছে। এই বিক্ষুব্ধ নেতাদের মধ্যে দলের নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। অনেকেই বলছেন, নেহরু-গান্ধী পরিবারের বাইরে কাউকে স্থায়ী সভাপতি করা হোক। এক্ষেত্রে তা করা হোক নির্বাচনের মাধ্যমে।
বেশ কয়েকদিন আগেই সমাজবাদী পার্টির সমর্থন নিয়ে নির্দল হিসেবে রাজ্যসভায় গিয়েছেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কপিল সিব্বল। তিনি আসন্ন নির্বাচনে কংগ্রেসের পরাজয়ের আশঙ্কা করেই হাত ছেড়ে সাইকেলে সওয়ার হন বলে ময়নাতদন্তে জানা যায়। প্যাটেলরা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর জেনেও হার্দিকের মতো যুবনেতাকে ধরে রাখতে পারেনি কংগ্রেস। বারবার বিদ্রোহের সুর শোনা গেছে রাজস্থানের প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী তথা কংগ্রেস নেতা সচিন পাইলটের গলায়। এরপর আনন্দ শর্মার পদত্যাগ? সবমিলিয়ে শতাব্দী প্রাচীন দলের অন্দরে ডামাডোল।
`হামকো ভি ডুবা দেগা’
প্রশান্ত কিশোর কংগ্রেসকে ভরাডুবি থেকে বাঁচাতে পারতেন কিনা, তার উত্তর দিত সময়। তবে সে সম্ভাবনাও এখন আর নেই। প্রায় কংগ্রেস দলে যোগ দিয়ে ফেলেছিলেন ভোট কুশলী প্রশান্ত কিশোর। জোরালো হয়ে উঠেছিল গুঞ্জন। তবে, শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বনিবনা না হওয়াতেই সেই পরিকল্পনা ভেস্তে গিয়েছিল বলে মনে করা হয়। পরে কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার প্রসঙ্গ উঠতেই রীতিমতো হাত জোড় করে পিকে জানালেন, তিনি কখনও আর কংগ্রেস দলের সঙ্গে কাজ করবেন না। কেন? প্রশান্ত বলেন, ‘হামকো ভি ডুবা দেগা’ (আমাকেও ডুবিয়ে দেবে)! তাঁর মতে, কংগ্রেস দল নিজেও ডুববে এবং তাদের সঙ্গে যারা যারা হাত মেলাবে, তাদের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ডুববে। এর আগে অবশ্য দু-দু’বার কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার খুব কাছাকাছি এসেছিলেন পিকে। ২০২১ সালে তিনি গান্ধী পরিবারের সদস্যদের সামনে কংগ্রেসকে ফের শক্তিশালী করার বিষয়ে একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিলেন। সূত্রের খবর, সেই সময় তিনি কংগ্রেস দলের একজন ‘অ-গান্ধী’ কার্যনির্বাহী সভাপতি বা সহ-সভাপতি নিয়োগের সুপারিশ করেছিলেন। পাশাপাশি রাহুল গান্ধীকে দলের সংসদীয় বোর্ডের প্রধান করার কথা বলেছিলেন। চলতি বছরে তিনি আবার কংগ্রেসের বিশিষ্ট নেতাদের সামনে, শতাব্দী-প্রাচীন দলটিকে পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে ৬০০ টি স্লাইড দেখিয়ে একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিলেন। শোনা যায়, সেই পরিকল্পনা নিয়ে কংগ্রেস নেতারা বহু আলোচনা করলেও, কাজের কাজ কিছু হয়নি। অর্থাৎ বিভিন্ন দলকে যিনি নির্বাচনী হার্ডল পার করিয়েছেন, এক্ষেত্রে তিনিও ব্যর্থ।
অর্থাৎ এই মৃতসঞ্জিনবীও কাজ এল না শতাব্দীপ্রাচীন দলের ক্ষেত্রে। রাহুল-প্রিয়ঙ্কা ম্যাজিক ভেস্তে যাওয়ার পর খোদ দলের হাল ধরেন সোনিয়া। তিনিও ভাঙন ঠেকাতে পারছেন না। পারছেন না দলকে ভেন্টিলেশন থেকে বের করে আনতে। প্রশান্ত কিশোরের প্রেসক্রিপশন ছুঁয়েও দেখেনি কংগ্রেস। এখন ২০২৪ এর আগে শতাব্দীপ্রাচীন এই দলের জন্য আরও খারাপ কিছু অপেক্ষা করছে না তো? অর্থাৎ গঙ্গাপ্রাপ্তি!







