দলত্যাগী কপিল সিব্বল থেকে পদত্যাগী আনন্দ শর্মা, ২০২৪-এর আগেই গঙ্গাপ্রাপ্তি কংগ্রেসের?
২০২৪-কে সামনে রেখে বিরোধীরা যখন ঘুঁটি সাজাতে ব্যস্ত, তখন কংগ্রেসের এ কী হাল! রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বারবার বলছেন, এক্ষেত্রে কংগ্রেসকে বড় ভূমিকা নিতে হবে।

আমার ভাঙ্গা তরী ছেড়া পাল
চলবে আর কত কাল,
ভাবি শুধু একা বসিয়া, রে দয়াল,
এভাবে আর চলবে কতকাল।...
২৪ আকবর রোডে এখন কান পাতলে হয়তো শোনা যাবে এই ধুন। কংগ্রেসের ভাঙা তরী মেরামতের সম্ভাবনা ক্রমশই ম্লান হয়ে আসছে। হাত শিবিরে এখন ঘরে-বাইরে কালো মেঘ। সুনীল জাখর, হার্দিক প্যাটেল, কপিল সিব্বল আগেই দল ছেড়েছেন। তারপর সেই ফাটল আরও চওড়া হয়েছে গুলাম নবি আজাদের সৌজন্যে। দিনকয়েক আগে তিনি জম্মু-কাশ্মীরের প্রচার কমিটি থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। সেই ক্ষত মেরামতির চেষ্টা করেনি হাইকমান্ড। ফলে আর একটা উইকেট পড়ব পড়ব করছে। হিমাচল প্রদেশ কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দিলেন আনন্দ শর্মা। সামনেই হিমাচল প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচন। তার আগে আনন্দ শর্মার এই পদত্যাগ দলের কাছে বড় ধাক্কা বলেই মনে করছেন হিমাচল প্রদেশের কংগ্রেস নেতাদের একাংশ। তিনি বিজেপিতে যোগ দেবেন কি না, তা নিয়ে দিল্লির বাতাসে চলছে গুঞ্জন, হাওয়া গরম। (এই লেখা শেষ হওয়া পর্যন্ত বিজেপিতে যোগ দেননি আনন্দ শর্মা। তবে রাজনীতির পাশা যে-কোনও সময় ঘুরে যেতে পারে।)
সূত্র মারফৎ জানা গিয়েছে, কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীকে চিঠিতে আনন্দ লিখেছেন, তাঁকে না জানিয়েই আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছে দল। নির্বাচন সংক্রান্ত আলোচনা থেকেও বাদ দেওয়া হয়েছে তাঁকে। আহত হয়েছে তাঁর আত্মসম্মান, যা 'আপসহীন'। যদিও বলেছেন, দলীয় প্রার্থীর হয়ে প্রচার করবেন তিনি।
অক্টোবরে হিমাচল প্রদেশে বিধানসভা নির্বাচন। ২৬ এপ্রিল রাজ্য কংগ্রেসের পর্যবেক্ষক কমিটির প্রধানের পদে বসানো হয় প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আনন্দকে। ওই রাজ্যে কংগ্রেসের অন্যতম শীর্ষ নেতা তিনি। ১৯৮২ সালে বিধানসভা ভোটে প্রথমবার জিতেছিলেন। ১৯৮৪ সালে তাঁকে রাজ্যসভার প্রার্থী করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। সেই থেকেই রাজ্যসভায় আনন্দ।
দিনকয়েক আগে জম্মু ও কাশ্মীরের প্রচার কমিটি এবং রাজনৈতিক প্যানেল থেকে ইস্তফা দিয়েছেন গুলাম নবি আজাদ। ২০২০ সালের অগাস্টে যে ২৩ জন নেতা সোনিয়াকে চিঠি দিয়ে দলীয় নির্বাচন এবং স্থায়ী সভাপতি নিয়োগের দাবি জানিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন আনন্দ এবং আজাদ দু’জনেই। এবার কয়েকদিনের মধ্যে দুই জনেই দলীয় পদ ছাড়লেন। তাই প্রশ্ন, আবারও কি কংগ্রেসে শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মাথাচাড়া দিচ্ছে বিক্ষোভ?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এখন দেখার, প্রবীণ কংগ্রেস নেতা গুলাম নবি আজাদ ঠিক কোন রাজনৈতিক পদক্ষেপ করেন।
দলের ওয়ার্কিং কমিটিতে ইতিমধ্যে বিরোধী মঞ্চ তৈরি হয়েছে। প্রবীণ নেতাদের নিয়ে তৈরি হয়েছে জি২৩ গ্রুপ। এঁরা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সমালোচক বলেই পরিচিত। এই গ্রুপে ভূপিন্দর সিং হুডা, মণীশ তিওয়ারি, গুলাম নবি আজাদ, আনন্দ শর্মার নাম রয়েছে। ওয়ার্কিং কমিটির এই গ্রুপ ব্লক থেকে দলের সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত নির্বাচনের মাধ্যমে দল গঠনে জোর দেওয়ার দাবি গত কয়েক বছর ধরে করে আসছে। এই বিক্ষুব্ধ নেতাদের মধ্যে দলের নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। অনেকেই বলছেন, নেহরু-গান্ধী পরিবারের বাইরে কাউকে স্থায়ী সভাপতি করা হোক। এক্ষেত্রে তা করা হোক নির্বাচনের মাধ্যমে।
আনন্দ শর্মা দল ছেড়ে বিজেপিতে যাবেন কি না, এই নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। তিনি কংগ্রেসে থাকবেন বলে দাবি করলেও, এই নিয়ে জল্পনার কারণ আছে। কারণটা কী?
আনন্দ শর্মা অভিমান চাপতে না পেরে বলেন, "আমি ৫১ বছর আগে কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলাম এবং আপনি আমাকে অপমান করেছেন। আমি এবং গুলাম নবি আজাদ কিছু বিষয় উত্থাপন করেছিলাম, শুধুমাত্র এই কারণে আমাকে অপমান করা হচ্ছে? কংগ্রেসের পুনর্নবীকরণ এবং পুনরুজ্জীবনের জন্য মৌলিক ছিল আমাদের উত্থাপিত ইস্যুগুলো। আমি তৃণমূল স্তরের নেতা, তাই আমি হিমাচল ফিরে যাচ্ছি।"
আনন্দ শর্মা আরও বলেন, "আমি একজন কংগ্রেসম্যান। আজীবন কংগ্রেসেই থাকব আমি। কিন্তু আমার মতো একজন সিনিয়র নেতার সঙ্গে কেউ কথা বলবে না? এখনও কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। আমি সোনিয়া গান্ধীকে চিঠি পাঠিয়েছিলাম। আমার তাঁকে সম্মান করি। আমি তাঁর জবাবের অপেক্ষায় রয়েছি।"
কংগ্রেসের আরও একটা উইকেটের পতনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না রাজনৈতিক মহল। 'বিক্ষুব্ধ’ কংগ্রেস নেতা তথা প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আনন্দ শর্মাকে নিয়ে বিজেপি-র সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডার সাম্প্রতিকতম মন্তব্যে গুঞ্জন জোরালো হয়েছে। হিমাচল প্রদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনীদের এক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পর বিজেপি সভাপতি ‘বিশেষ বন্ধু’ আনন্দ শর্মাকে নিয়ে মন্তব্য করেছেন। আনন্দ শর্মাও নাড্ডার মতো এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী। সম্প্রতি তিনি রাজ্যের দলীয় পদ ছেড়েছেন। এদিন আনন্দ শর্মাকে নিয়ে নাড্ডা বলেন, “আনন্দ শর্মা ব্যক্তিগতভাবে আমার বন্ধু। ব্যক্তিগত কারণে তিনি এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেননি। কংগ্রেসের পদ থেকে ইস্তফা দেওয়া একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। তিনি বিজেপিতে যোগ দিতে চান, সেই নিয়ে এখনও কিছু বলেননি।” পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পর আনন্দ শর্মাকে নাড্ডার এই মন্তব্য নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
বেশ কয়েকদিন আগেই সমাজবাদী পার্টির সমর্থন নিয়ে নির্দল হিসেবে রাজ্যসভায় গিয়েছেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কপিল সিব্বল। সিব্বলের হাত ছেড়ে সাইকেলে সওয়ার হওয়া নিয়ে ময়নাতদন্ত হয়েছে তখনই। প্রবীণ এই রাজনীতিবিদের এই সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে বিশ্লেষকদের মন্তব্য, "চব্বিশের ভোটে বিজেপি-বিরোধী লড়াইয়ে কংগ্রেস পিছিয়ে পড়ছে, সেটা বুঝতে পারছেন সিব্বলের মতো নেতা। উত্তরপ্রদেশে যেহেতু সমাজবাদী পার্টি ভালো ফল করেছে, তাই সাধারণ নির্বাচনে লড়াইয়ের মতো জায়গায় থাকবেন তিনি। দক্ষ রাজনীতিবিদের মতো এই সিদ্ধান্ত।"
বারবার বিদ্রোহের সুর শোনা গেছে রাজস্থানের প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী তথা কংগ্রেস নেতা শচীন পাইলটের গলায়। ঘটনা চরমে ওঠে ২০২০ সালে। রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলটের বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করে ১৮ জন বিধায়ককে নিয়ে রিসর্টে গিয়ে থেকেছিলেন। পরে হাইকমান্ডের হস্তক্ষেপে সাময়িক অশান্তি মিটলেও ক্ষোভের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে। মরুরাজ্যে দুর্গ সামলাতে আসরে নামেন সোনিয়া-রাহুল। মুখের কথায় চিঁড়ে ভিজবে? দেখা যাক।
কংগ্রেস নেতা মণীশ তিওয়ারিও বেসুরো। সাম্প্রতিক আনন্দ শর্মার এই পদক্ষেপ হাত শিবিরের চাপ বাড়াবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
২০২৪-কে সামনে রেখে বিরোধীরা যখন ঘুঁটি সাজাতে ব্যস্ত, তখন কংগ্রেসের এ কী হাল! রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বারবার বলছেন, এক্ষেত্রে কংগ্রেসকে বড় ভূমিকা নিতে হবে। লড়াই তো পরের কথা। কংগ্রেস তো ঘর সামলাতেই পারছে না। কংগ্রেসের এখন ভেন্টিলেশন প্রাপ্তির দশা! কোন চিকিৎসায় কাজ দেবে, মাথা চুলকেও রেমিডি খুঁজে পাচ্ছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। শতাব্দীপ্রাচীন দলের গঙ্গাপ্রাপ্তি ঘটবে না তো? বালাই ষাট!







