ভোটের ফল বেরোতেই উত্তপ্ত হবে বাংলা? ভোটগণনার আগেই ৬০ দিনের নিষেধাজ্ঞা কলকাতা পুলিশের
West Bengal election counting: ভোটগণনার আগেই কলকাতার গুরুত্বপূর্ণ অংশে টানা ৬০ দিনের নিষেধাজ্ঞা কেন? প্রশাসন কি ফল ঘোষণার পর অশান্তির আশঙ্কা দেখছে? ভোট শেষ হলেও বাংলার রাজনৈতিক উত্তাপ কি তবে কমেনি? গণনার আগে এই কড়াকড়ি কি শুধুই নিরাপত্তা, নাকি বড় সংঘর্ষের পূর্বাভাস?
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। এখন সবার নজর ৪ মে-র গণনার দিকে। কিন্তু গণনার আগে কলকাতার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশে টানা ৬০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করল কলকাতা পুলিশ। শহরের কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক অঞ্চল, প্রশাসনিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর এলাকা এবং কয়েকটি গণনাকেন্দ্র ঘিরে এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, ভোট-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা এতটাই তীব্র যে প্রশাসন আগেভাগেই কঠোর বার্তা দিতে চাইছে?
কলকাতা পুলিশের জারি করা নির্দেশ অনুযায়ী, ৩ মে থেকে ১ জুলাই পর্যন্ত বউবাজার, হেয়ার স্ট্রিট এবং হেডকোয়ার্টার্স ট্র্যাফিক গার্ড সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েত, মিছিল, সভা, বিক্ষোভ, ধর্না কার্যত নিষিদ্ধ থাকবে। শুধু তাই নয়, লাঠি, আগ্নেয়াস্ত্র বা অন্য কোনো বিপজ্জনক বস্তু বহন করাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কলকাতা পুলিশ জানিয়েছে, 'বিশ্বস্ত সূত্রে' তারা এমন তথ্য পেয়েছে যে ভোটগণনাকে কেন্দ্র করে সহিংস বিক্ষোভ, জনশৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং যান চলাচলে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটতে পারে। সেই কারণেই ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারায় এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গণতন্ত্রের এই প্রতিফলন আমরা কোথায় দেখতে পাই? এর উত্তর আমাদের সকলের জানা। নির্বাচনের সময় বা সহজভাবে বললে ভোটের ময়দানেই এর প্রকৃত প্রকাশ ঘটে। আর এই ভোটে জনগণের স্বচ্ছল ও সক্রিয় অংশগ্রহণ ও মত প্রদান এবং প্রতিনিধি (পক্ষান্তরে শাসক) নির্বাচনের দ্বারাই এর মোক্ষলাভ ঘটে বলে অন্তত ভাবা হয়। সেটা লোকসভা ভোট হতে পারে বা বিধানসভা ভোট বা পঞ্চায়েত ভোট বা কর্পোরেশন ভোট বা অন্য যেকোনো প্রকার ভোট।
ভোটগণনার মাত্র একদিন আগে এই নির্দেশ দেওয়া হলো। এর আগে শহরের দু'টি স্ট্রংরুমে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ইভিএমের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিয়ে অভিযোগ তোলা হয়েছিল। বিরোধী দলগুলিও গণনাকেন্দ্রের নিরাপত্তা, গণনা কর্মীদের নিয়োগ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকাকে ঘিরে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। এমনকী তৃণমূল ইতোমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে গণনাকর্মী হিসেবে কেবল কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের নিয়োগের বিরোধিতা করেছে। অর্থাৎ গণনার আগে প্রশাসনিক উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক অবিশ্বাস— দুটোই চরমে।
দুই দফার ভোটে রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে সংঘর্ষ, বুথ দখলের অভিযোগ, ভুয়ো ভোট, কেন্দ্রীয় বাহিনী বনাম রাজ্য পুলিশের ভূমিকা নিয়ে টানাপোড়েন— সবই সামনে এসেছে। নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার ১৫টি বুথে পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দিয়েছে। এর অর্থ, কমিশন নিজেও স্বীকার করছে ভোটপ্রক্রিয়া সর্বত্র নির্বিঘ্ন ছিল না। ফলে গণনার দিন ফল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থকদের রাস্তায় নেমে পড়া, জয়-পরাজয়কে ঘিরে সংঘর্ষ কিংবা প্রশাসনিক ভবনের সামনে বিক্ষোভ—এই সবই বাস্তব আশঙ্কা হিসেবে দেখছে পুলিশ।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal SIR controversy: এসআইআরের নামে লক্ষ লক্ষ ভোটার বাদ, তবু রেকর্ড ভোটদান—এ কি গণতন্ত্রের উৎসব, না নাগরিকত্ব হারানোর আতঙ্কে বুথমুখী বাংলা? ভোটার তালিকা থেকে নাম মুছে যাওয়ার ক্ষোভ কি শেষ পর্যন্ত বিজেপির দিকেই ফিরবে?
কারণ গত কয়েক মাস ধরে কলকাতার বিভিন্ন স্পর্শকাতর এলাকায় ধারাবাহিকভাবে একই ধরনের ৬০ দিনের নিষেধাজ্ঞা জারি করতে দেখা গিয়েছে। মার্চ মাসেও কেন্দ্রীয় কলকাতার একই অংশে এমন নিষেধাজ্ঞা ছিল, তার মেয়াদ শেষ হতেই ফের নতুন করে আদেশ এল। তার আগে ভবানীপুর-কালিঘাট, আলিপুরের মতো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলও একইভাবে নিষিদ্ধ এলাকার আওতায় আনা হয়েছিল।
উল্লেখ্য, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আগেই ঘোষণা করেছিলেন, ভোটের পরও পশ্চিমবঙ্গে ৬০ দিন কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন থাকবে। তাঁর বক্তব্য ছিল, ভোট-পরবর্তী হিংসা রুখতেই এই সিদ্ধান্ত। তার কয়েক দিনের মধ্যেই কলকাতা পুলিশের এই ৬০ দিনের নিষেধাজ্ঞা যেন রাজ্য প্রশাসনের তরফে সমান্তরাল নিরাপত্তা বলয় তৈরি করল।
উল্লেখ্য, দীর্ঘদিনের শাসক দলের ভবিষ্যৎ, বিরোধী শিবিরের ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—এই প্রশ্নে রাজ্যজুড়ে তীব্র স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। গণনার দিন যদি ফলাফল প্রত্যাশাবিরোধী হয়, তাহলে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, রাস্তায় নেমে শক্তি প্রদর্শন—সবই অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। কলকাতার কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক অঞ্চল, লালবাজার, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দফতর, ব্যাঙ্ক, গণমাধ্যম অফিস—সবই এই এলাকায়। ফলে এখানকার সামান্য অশান্তিও দ্রুত রাজনৈতিক সংঘর্ষে পরিণত হতে পারে।
প্রশাসন বুঝিয়ে দিতে চাইছে, ফল ঘোষণার পরে রাস্তায় শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ সীমিত থাকবে। কিন্তু একই সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত আরেকটি বার্তাও দিচ্ছে, ভোট শেষ হলেও পশ্চিমবঙ্গ এখনও স্বাভাবিক নির্বাচনী-পরবর্তী অবস্থায় পৌঁছয়নি। অবিশ্বাস, আশঙ্কা এবং সংঘর্ষের সম্ভাবনা এতটাই প্রবল যে গণতান্ত্রিক উৎসবের পরই শহরকে নিরাপত্তার কাঁটাতারে মুড়ে ফেলতে হচ্ছে। ৪ মে ফল ঘোষণার পর বাংলার রাজনীতি কতটা অশান্ত হতে পারে, সেই আশঙ্কাই এখন প্রশাসনের সবচেয়ে বড় চিন্তা।






