প্রশান্ত বর্মন: ‘ফেরার’ অভিযুক্তই জামিনে মুক্ত, উঠছে যে সব প্রশ্ন

Prashant Barman bail: চার্জশিটে যদি সত্যিই নাম না থাকে, তাহলে হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত জামিন চাইতে গেলেন কেন প্রশান্ত বর্মন? আদালতের নির্দেশ এড়িয়ে এতদিন ‘ফেরার’ ছিলেন কীভাবে? আবার পুলিশই বা তাঁকে পলাতক বলল কোন ভিত্তিতে? নিউটাউনে গ্রেফতারের পর ফের উঠছে স্বপন কামিল্যা খুন মামলার একাধিক প্রশ্ন।

inscript
৩ মিনিট
প্রশান্ত বর্মন: ‘ফেরার’ অভিযুক্তই জামিনে মুক্ত,  উঠছে যে সব প্রশ্ন

নিউটাউনের রাস্তায় বেপরোয়া গাড়ির গতি। পথচারীকে ধাক্কা। প্রত্যক্ষদর্শীদের ধাওয়া। তারপর পুলিশের হাতে আটক এক ব্যক্তি। সাধারণ দুর্ঘটনার খবর হিসেবে শুরু হলেও, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে। কারণ, গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে ছিলেন রাজগঞ্জের অপসারিত বিডিও প্রশান্ত বর্মন। সেই প্রশান্ত বর্মন, যাঁর নাম দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে রয়েছে দত্তাবাদের স্বর্ণ ব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যা অপহরণ ও খুন মামলায়। যাঁকে নিয়ে হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত আইনি লড়াই হয়েছে। যাঁকে পুলিশের চার্জশিটে 'পলাতক' বলা হয়েছিল। অথচ, নিউটাউনে গ্রেফতারের পর তাঁকেই আবার দ্রুত জামিনও পেতে দেখা গেল। ১০০০ টাকার বন্ডের বিনিময়ে জামিন পেলেন প্রশান্ত।

ঘটনার সূত্রপাত সোমবার (২৫ মে) রাতে। অভিযোগ, মদ্যপ অবস্থায় দ্রুত গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিলেন প্রশান্ত বর্মন। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়ি এক পথচারীকে ধাক্কা মারে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, দুর্ঘটনার পর পালানোরও চেষ্টা হয়। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় কয়েকজন এবং এক স্কুটি চালক ধাওয়া করে গাড়িটি আটকে দেন। এরপর পুলিশ এসে তাঁকে আটক করে।

মঙ্গলবার (২৬ মে) বারাসাত আদালতে তাঁকে তোলা হলে নাটক আরও ঘনীভূত হয়। প্রথমে মুখ ঢেকে আদালতে ঢোকানো হয় প্রশান্তকে। পরে আবার স্বাভাবিকভাবেই তাঁকে আদালত চত্বরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৮১ ধারা এবং মোটর ভেহিকল আইনের ১৮৪ ও ১৮৫ ধারায় মামলা হয়। অর্থাৎ, মূল অভিযোগ ছিল বেপরোয়া ও মত্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো। এই ধারাগুলি জামিনযোগ্য হওয়ায় আদালতে তাঁর আইনজীবী জামিনের আবেদন করেন এবং বিচারক সেই আবেদন মঞ্জুরও করেন। এখান থেকেই উঠে আসে বড় প্রশ্ন।

এই প্রশান্ত বর্মনের বিরুদ্ধেই দত্তাবাদের স্বর্ণ ব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যা অপহরণ ও খুন মামলায় দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত চলছে। বিধাননগর পুলিশের চার্জশিটে তাঁকে 'পলাতক' বলা হয়েছে। শুধু তাই নয়, কলকাতা হাইকোর্ট তাঁকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছিল। সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে তিনি সুপ্রিম কোর্টেও গিয়েছিলেন। সেখান থেকেও তাঁকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়। অথচ অভিযোগ, তিনি সেই নির্দেশ মানেননি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
‘দাবাং’ প্রশান্ত বর্মনের ভাইরাল ভিডিয়ো ঘিরে কেন প্রশ্নের মুখে পুলিশ?

Prashant Barman: প্রশান্ত বর্মনকে চার মাস ধরে খুঁজে পাচ্ছিল না পুলিশ, ইকোপার্কের দুর্ঘটনার পর সাধারণ মানুষ কীভাবে তাঁকে ধরে ফেললেন? মত্ত অবস্থায় গাড়ি চালানোর অভিযোগ, ভাইরাল ভিডিয়ো আর পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ঘিরে উঠছে একের পর এক প্রশ্ন। তবে কি প্রশাসনের চেয়ে এখন বেশি সক্রিয় সাধারণ মানুষই?

যদি তাঁর বিরুদ্ধে সত্যিই কোনো গ্রেফতারযোগ্য অভিযোগ না থাকে, তাহলে প্রথমে হাইকোর্টে এবং পরে সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে জামিন বা সুরক্ষার আবেদন করার প্রয়োজন পড়ল কেন? একজন ব্যক্তি আদালতের দ্বারস্থ হন সাধারণত তখনই, যখন তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতার বা আইনি পদক্ষেপের আশঙ্কা থাকে। তাহলে এতদিন ধরে যে আইনি লড়াই চলল, তার ভিত্তি কী ছিল?

দ্বিতীয় প্রশ্ন, যদি সত্যিই তাঁকে গ্রেফতার করার মতো পর্যাপ্ত আইনি ভিত্তি না থাকে, তাহলে এতদিন তাঁকে 'পলাতক' বলা হলো কেন? পুলিশের চার্জশিটে কেন তাঁর নামের পাশে 'ফেরার' তকমা জুড়ল? আদালত কেন আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিল? একজন মানুষ কি শুধুই রাজনৈতিক কারণে মাসের পর মাস 'পলাতক' হিসেবে চিহ্নিত থাকতে পারেন?

তৃতীয়ত, প্রশান্ত বর্মনকে আগের সরকারের আমলে বিডিও পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছিল। যদি গোটা বিষয়টাই 'সেটিং'-এর খেলা হয়, তাহলে সরকার বদলের পরও কেন তাঁর বিরুদ্ধে সেই অবস্থান বহাল থাকল? নতুন প্রশাসন কেন তাঁকে নিয়ে আগের সমস্ত অভিযোগ খারিজ করেনি? নিউটাউনের ঘটনায় ধরা পড়ার পরও কেন আবার শোনা যাচ্ছে, স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুন মামলায় তাঁকে হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানাতে পারে পুলিশ?

একদিকে একটি দাবি উঠছে যে চার্জশিটে নাকি তাঁর নামই ছিল না। অন্যদিকে পুলিশের তরফেই বলা হয়েছে, চার্জশিটে তাঁকে 'পলাতক' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই দুই দাবির মধ্যে স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে। যদি নাম না-ই থাকে, তাহলে তাঁকে আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হলো কীসের ভিত্তিতে? আবার যদি নাম থেকে থাকে, তাহলে নিউটাউনে ধরা পড়ার পর সেই মামলায় তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার করা হলো না কেন?

কোনো ব্যক্তি এক মামলায় জামিন পেলেই, অন্য মামলায় তাঁকে গ্রেফতার করা যাবে না, এমন নয়। নিউটাউনের ঘটনায় তিনি জামিন পেয়েছেন কারণ সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে আনা ধারাগুলি জামিনযোগ্য। কিন্তু স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুন মামলায় যদি তাঁর বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট, চার্জশিট বা তদন্তজনিত প্রয়োজন থেকে থাকে, তাহলে আলাদা প্রক্রিয়ায় তাঁকে সেই মামলায় হেফাজতে নেওয়ার আবেদন করতেই পারে পুলিশ। একটি মামলায় জামিন পাওয়া মানেই অন্য সমস্ত অভিযোগ থেকে মুক্তি নয়।

তবুও প্রশ্ন থাকছে। কারণ, জনমানসে এখন সবচেয়ে বড় সংকট বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে। একদিকে পুলিশ দীর্ঘদিন ধরে বলছে অভিযুক্ত পলাতক। অন্যদিকে সেই ব্যক্তিকেই নিউটাউনের রাস্তায় প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে। আবার গ্রেফতারের পর দ্রুত জামিনও মিলছে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ তৈরি হচ্ছে, তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে?

রাজনৈতিক পরিসরেও এই ঘটনা নতুন করে তর্ক উস্কে দিয়েছে। একপক্ষের দাবি, গোটা ঘটনাই আগের সরকারের তৈরি 'ন্যারেটিভ'। অন্যপক্ষ বলছে, যদি সবটাই সাজানো হতো, তাহলে আদালত থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত বিষয়টি গড়াত না।

এখন দেখার, তদন্ত শেষ পর্যন্ত কোথায় পৌঁছয়। নিউটাউনের ঘটনায় দায় কতটা প্রমাণিত হয়, স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুন মামলায় পুলিশের হাতে কী প্রমাণ রয়েছে, এবং আদালত ভবিষ্যতে কী অবস্থান নেয়।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ডানাছাঁটা ট্রাম্প-নেতানিয়াহু, বিশ্ব রাজনীতি কোন দিকে যাবে?

Trump midterm defeat: আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির পরাজয় এবং ইজরায়েলের নির্বাচনে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো—দুটি ঘটনাই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই পরাজয়ের পর ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী হবে? আমেরিকা-ইজরায়েল সম্পর্কের সমীকরণ কি বদলাবে? আর বিশ্ব রাজনীতিতে তার প্রভাবই বা কতটা পড়বে?

ট্রাম্পের হারের ৫ কারণ: কেন মুখ ফিরিয়ে নিলেন মার্কিন ভোটাররা?

US Midterm Elections: আমেরিকার মিডটার্ম নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেল ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি।জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি থেকে শুরু করে ট্রাম্পের নীতি—রিপাবলিকানদের ভরাডুবির পাঁচটি মূল কারণ কী কী?

পিস বন্ড কী, কেন দিতে হয়? নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ঔপনিবেশিক আমলের আইন

Peace Bond: শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করলেই কি দিতে হবে পিস বন্ড? AISA-র জাতীয় সভাপতি নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে বিতর্কে ঔপনিবেশিক আমলের প্রতিরোধমূলক আইন। ব্রিটিশ আমল থেকে স্বাধীন ভারত, CrPC থেকে BNSS—কীভাবে বদলেছে এই আইনি ব্যবস্থা? কেন কাউকে ১০ হাজার টাকার মুচলেকা দিতে বলা হয়? কী বলছে আইন?

রামলীলা ময়দানের সভায় ভিড় দেখাতে এআই ছবি? কতটা সত্যি?

Ramlila Maidan AI image controversy: দিল্লির রামলীলা ময়দানে ১ নভেম্বরের ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সমাবেশে ভিড় ও এআই ছবি ব্যবহার নিয়ে বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে বিতর্ক তুঙ্গে। ভাইরাল ছবিগুলোর সত্যতা কী?

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।