অভয়ার জন্যই ভোট দিল বাংলার মেয়েরা?
West Bengal Election 2026: লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী সব থাকা সত্ত্বেও কেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মহিলা ভোটব্যাঙ্ক ভাঙল? অভয়া আন্দোলনের ক্ষোভেই কি বাংলার মেয়েরা এ বার বিজেপির দিকে ঝুঁকল?
অভয়ার জন্যই ভোট দিল বাংলা! ২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে আপাতত যে ফল সামনে আসছে, তাতে একটাই বড় প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে, মহিলারা কি এ বার আর একজোট হয়ে তৃণমূলকে ভোট দিলেন না? ভোটের অঙ্ক অন্তত সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। পানিহাটিতে জয় পেলেন অভয়ার মা রত্না দেবনাথ। মেয়ের ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এ বিজেপি প্রার্থী হন তিনি। আর তাঁর সিদ্ধান্তে পাশে দাঁড়াল পানিহাটি-সহ সারা বাংলার মা-বোনেরা। ২৮,৮৩৬ ভোটে তৃণমূল প্রার্থী তীর্থঙ্কর ঘোষকে হারিয়ে জিতলেন রত্না দেবনাথ। তাঁর প্রাপ্ত ভোট ৮৭,৯৭৭।
এবার রেকর্ড হারে ভোট পড়েছে, আর সেই ভোটে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের অংশগ্রহণ ছিল স্পষ্টতই বেশি। কিন্তু বহু বছর ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে ঝুঁকে থাকা মহিলা ভোটব্যাঙ্ক, তৃণমূলকে প্রত্যাখ্যান করেছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এই নির্বাচনে দুই দফা মিলিয়ে মোট ভোট পড়েছে ৯২.৪৭ শতাংশ, যা স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গে সর্বোচ্চ। পিআইবি-র তথ্য বলছে, প্রথম দফায় মহিলা ভোটদানের হার ৯২.৬৯ শতাংশ, দ্বিতীয় দফায় ৯২.২৮ শতাংশ। গত কয়েক নির্বাচনের ট্রেন্ড বজায় রেখে এবারও মহিলাদের ভোটে অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। সাধারণত বলা হয়ে থাকে, বেশি ভোট পড়া মানে শাসকের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, এই ভোটেও সেই ব্যাখ্যাই মিলছে।
এই ফল আরও তাৎপর্যপূর্ণ কারণ, বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-এ বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ গিয়েছিল। তার মধ্যে বড় অংশই মহিলা। বিভিন্ন সমীক্ষা বলছে, বাদ পড়া ভোটারদের প্রায় ৬১ শতাংশের বেশি মহিলা। অর্থাৎ প্রশাসনিক জটিলতা, নাম বাদ পড়ার আতঙ্ক—সব কিছুর পরও যে বিপুল সংখ্যক মহিলা ভোট দিতে পেরেছেন, তাঁরা ভোটকেন্দ্রে গিয়েছেন স্পষ্ট রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েই।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal Assembly Election 2026: মীনাক্ষী, দীপ্সিতা, আফরিন—প্রচারে যাঁদের সামনে রেখেছিল বামেরা, গণনাযে কেন পিছিয়ে সেই তরুণ মুখরাই? বাংলায় কি এখনও বামেদের জন্য জায়গা তৈরি হলো না?
এক সময় মহিলা ভোটাররাই ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য শক্তি। কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার— এই সব প্রকল্প শুধু সরকারি অনুদান নয়, তৃণমূলের সঙ্গে একটা সম্পর্কও তৈরি করেছিল মহিলাদের সঙ্গে। বিশেষ করে ২০২১ সালে দুর্নীতি, কাটমানি, দলীয় সন্ত্রাস নিয়ে বিরোধীদের প্রবল আক্রমণের মাঝেও লক্ষ্মীর ভাণ্ডার তৃণমূলকে বড় রক্ষাকবচ দিয়েছিল।
কিন্তু দেখা যাচ্ছে, পাঁচ বছরে সেই সমীকরণেও ফাটল ধরেছে। প্রকল্পের টাকা মিললেও নিরাপত্তা, সম্মান, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে অনেক বেশি। একের পর এক ধর্ষণ, নারী নির্যাতন ও শ্লীলতাহানির ঘটনায় বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কিছু মন্তব্য তীব্র বিতর্ক তৈরি করেছিল। বিরোধীরা সেই ক্ষোভকে লাগাতার রাজনৈতিক হাতিয়ার করতে চেয়েছে। ফলে আত্মসম্মান ও নিরাপত্তার প্রশ্নও মহিলা ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
এই জায়গাতেই ‘অভয়া’ ইস্যু বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এক তরুণীর ন্যায়বিচারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে নারীর নিরাপত্তাহীনতার প্রতীকে পরিণত হয়। শহর থেকে জেলা, মহিলাদের মধ্যে এই ঘটনার অভিঘাত ছিল অনেকটাই। শাসক কি সত্যিই মহিলাদের পাশে রয়েছে? এই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে এসেছে।
পানিহাটির মতো কেন্দ্রে এত ভোট পড়া সেই আবেগেরই ইঙ্গিত দেয়। রাতদখল, মিছিল, প্রতিবাদ— এসব শুধু একটি ঘটনার বিচার চাওয়া ছিল না; এর মধ্যে জমে ছিল দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস। অভয়ার মা (রত্না দেবনাথ)-কে ঘিরে জনসমর্থন, তাঁকে নিয়ে ব্যক্তিগত কদর্য আক্রমণের বিরুদ্ধে সহানুভূতি, এসবও নারী ভোটকে নীরবে প্রভাবিত করেছে। পানিহাটি কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী রত্না দেবনাথেরই জয় হলো।
পশ্চিমবঙ্গের ভোটে কি তবে বিজেপির উত্থানের নেপথ্যে সেই ‘অভয়া’ ক্ষোভই বড় চালিকাশক্তি হলো?






