যত কোপ মুঘল সাম্রাজ্যের উপর! পাঠ্যক্রম থেকে ঠিক কী কী বাদ দিল NCERT?
NCERT Mughal Chapter Removed: মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পরে তৎকালীন সরকার কর্তৃক আরএসএস-এর উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার অংশও বাদ দিয়েছে এনসিইআরটি।

NCERT অর্থাৎ ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং বলেছে, মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস স্কুলে পড়ার তেমন দরকার নেই। বাতিলের খাতায় পড়েছেন বাবর থেকে শাহজাহান সক্কলেই। দ্বাদশ শ্রেণির ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তক থেকে মুঘল সাম্রাজ্যের কিছু কিছু অধ্যায় মুছে ফেলার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতেই উত্তরপ্রদেশ সরকার জানিয়েছে, এইবার থেকে সরকারি স্কুলে এনসিইআরটি-র দশম শ্রেণির ইতিহাসের নতুন পাঠ্যপুস্তকটিই পড়ানো হবে। কারণ সেই বইগুলিতে এই শিক্ষাবর্ষ থেকে মুঘল সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। উত্তরপ্রদেশ দু'হাত খুলে এই সিদ্ধান্তকে বুকে টেনে নিলেও সিলেবাস থেকে মুঘল ইতিহাস মুছে ফেলার এই পদক্ষেপকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন বিভিন্ন মহলই তীব্র সমালোচনা করছে।
যত রাগ গিয়ে পড়ল কেন মুঘলদের উপর? উত্তর জানাই, তাও একবার রেখে ঢেকে রাষ্ট্র কী বলছে দেখা যাক। গত বছর সিলেবাসকে আরও যুক্তিযুক্ত করার অংশ হিসেবে এনসিইআরটি নাকি এই পদক্ষেপ করেছে। তাই দেশের ইতিহাসকে আরও 'যুক্তিসম্মত' করতে 'অপ্রাসঙ্গিক' হিসেবে পাঠ্যপুস্তক থেকে মুঘল সাম্রাজ্যের কিছু অংশ বাদ দিয়ে ফেলেছে তারা। ২০২২ সালের গোড়ার দিকেই এই পরিবর্তনগুলির মধ্যে অনেকগুলিই ঘোষণা করা হয়ে গিয়েছিল। সেন্ট্রাল বোর্ড অব সেকেন্ডারি এডুকেশন বা CBSE গত এপ্রিল মাসে পাঠ্যক্রমকে যৌক্তিক করার কথা জানিয়েছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, CBSE-এর অধীনে স্কুলগুলি ছাড়াও, কিছু রাজ্য বোর্ডও NCERT-র পাঠ্যপুস্তক ব্যবহার করে।
ঠিক কোন কোন অধ্যায় মুছে ফেলা হচ্ছে?
‘কিংস অ্যান্ড ক্রনিকলস’, দ্য মুঘল কোর্ট (১৬ এবং ১৭ শতক)' বই থেকে 'থিম অব ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি-পার্ট ২' অধ্যায় বাদ পড়ে যাচ্ছে। জাগরণ জোশের একটি প্রতিবেদন বলছে, একাদশ শ্রেণির সিলেবাস থেকে, মধ্য ইসলামিক ভূমি, সাংস্কৃতিক সংঘর্ষ, এবং শিল্প বিপ্লবের মতো অধ্যায়গুলিও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও, দ্বাদশ শ্রেণির সিভিক বিষয়টি থেকে স্বাধীনতার সময়কাল থেকে ভারতের রাজনীতি, জনপ্রিয় আন্দোলনের উত্থান, একদলীয় আধিপত্যের যুগের মতো অধ্যায়গুলি মুছে ফেলা হয়েছে। এছাড়াও দশম শ্রেণির গণতান্ত্রিক রাজনীতি-২ পাঠ্যপুস্তক থেকে ‘গণতন্ত্র ও বৈচিত্র্য’, ‘জনপ্রিয় সংগ্রাম ও আন্দোলন’, ‘গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ’-এর মতো অধ্যায়গুলো বাদ দেওয়া হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
শুধুই গুজরাত দাঙ্গা ছেঁটে ফেলা নয়, একইসঙ্গে সিবিএসই-র একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং ইতিহাসের সিলেবাস থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে মুঘল দরবার, কোল্ড ওয়ার, অ্যাফ্রো-এশিয়ান ইসলামিক সাম্রাজ্য-সহ আরও একাধিক বিষয়।
মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পরে তৎকালীন সরকার কর্তৃক আরএসএস-এর উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে দশম শ্রেণির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ্যপুস্তকে একটি অংশ ছিল। সেই অনুচ্ছেদটিও সরিয়ে দিয়েছে এনসিইআরটি।
কেন এই বাতিল অভিযান? কী বলছে NCERT?
এনসিইআরটির পরিচালক দীনেশ প্রসাদ সাকলানি অবশ্য বলছেন কিচ্ছু বাদ দেওয়া হয়নি। সিবিএসই বই থেকে মুঘল সম্পর্কিত কোনও অধ্যায় বাদ দেওয়া হয়নি, পুরোটাই 'মিথ্যা'। তাঁর দাবি, কোভিডের কারণে পড়ুয়াদের উপর চাপ বেড়ে যাওয়াতে পড়াশোনাকে আরও নিবিড় ও যুক্তিসঙ্গত করতে গত বছরই সিলেবাস যৌক্তিককরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। এনসিইআরটি প্রধান আরও জানিয়েছেন, বিশেষজ্ঞ কমিটি ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির বইগুলি পরীক্ষা করে দেখেছে। ওই কমিটির সুপারিশ, এই কিছু অধ্যায় যদি বাদ দেওয়া হয় তবে বাচ্চাদের জ্ঞানে তেমন প্রভাব পড়বে না উল্টে অপ্রয়োজনীয় বোঝা সরানো যেতে পারে। এনসিইআরটির দাবি, এতে এত বিতর্কের কী আছে? অতিরিক্ত যা, তা ছেঁটে ফেলাই তো ভালো!

- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Prasant Kishor on BJP Defeat : বছর গেলেই ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের মহারণ। সব মিলিয়ে রাজনৈতিক দলগুলিও নিজেদের নীল নকশা তৈরি করে নিচ্ছে।
দীনেশ প্রসাদ সাকলানি আরও জানিয়েছেন, এখনও পড়ুয়ারা এনসিইআরটি-র সপ্তম শ্রেণির বইয়ে মুঘলদের ইতিহাস পড়ছে। একাদশ শ্রেণির বইয়ের দ্বিতীয় ভাগে মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস পড়ানো হচ্ছে এবং দ্বাদশ শ্রেণির বইতে মুঘলদের ইতিহাসের ২ টি অধ্যায় ছিল, যার মধ্যে নয় নম্বর বিষয়টি গত বছরই সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আটটি বিষয় এখনও পড়ানো হচ্ছে। এই বছর কোনও বই থেকে কোনও অধ্যায় সরানো হয়নি, দাবি তাঁর।
"আমরা NEP অর্থাৎ জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০২০ অনুযায়ী কাজ করছি। এটি একটি রূপান্তর পর্ব। NEP 2020 বিষয়বস্তুর ভার কমানোর কথা বলে। আমরা তাই বাস্তবায়ন করছি। স্কুল শিক্ষার জন্য NCF বা ন্যাশনাল কারিকুলাম ফ্রেমওয়ার্ক গঠন করা হচ্ছে। NEP অনুযায়ীই ২০২৪ সালের পাঠ্যপুস্তকগুলি ছাপা হবে। আমরা এখনই কিছু বাদ দিইনি,” বলছেন NCERT-এর প্রধান।
ইতিহাস বদলে দিতে চাইছে বিজেপি, কী বলছেন বিরোধীরা?
সে NCERT যতই বলুক কিচ্ছু বাদ দেওয়া হয়নি, বিজেপি নেতাদের উচ্ছ্বাস বলছে ঘটনা আসলে কী! বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র NCERT-এর পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন। সংশোধিত পাঠ্যপুস্তক বিষয়ক একটি ভিডিও রিটুইট করে তিনি লিখেছেন, “এনসিইআরটি থেকে মুঘলদের মিথ্যা ইতিহাস মুছে ফেলা এক দুর্দান্ত সিদ্ধান্ত। চোর, পকেটমার এবং দুই পয়সার গুণ্ডাদের মুঘল সালতানাত এবং ভারতের সম্রাট বলা হতো। আকবর, বাবর, শাহজাহান, আওরঙ্গজেব ইতিহাসের বইয়ে নেই, ডাস্টবিনে আছে।"
অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমেন (এআইএমআইএম) প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি বলছেন, একদিকে চিন ভারতের বর্তমানকেই মুছে ফেলার পথে, আর এনসিইআরটি পাঠ্যক্রম থেকে মুঘল ইতিহাস মুছে দিয়ে অতীতকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করছে। অরুণাচল প্রদেশে চিনের নাম পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে ওয়াইসি বলেছেন, "একদিকে মোদি সরকার এনসিইআরটি সিলেবাস থেকে মুঘলদের মুছে ফেলছে, অন্যদিকে চিন, যার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদি জি ২০ ইন্দোনেশিয়ার বৈঠকে করমর্দন করেছিলেন, সে আমাদের বর্তমানকেই মুছে দিচ্ছে।” আবার রাজ্যসভার সাংসদ কপিল সিবাল কেন্দ্রের সরকারকে আক্রমণ করে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী মোদির ভারতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, আধুনিক ভারতের ইতিহাস ২০১৪ থেকে শুরু হওয়া উচিত।
ঘটনা যাই হোক, সরকার যখন একচ্ছত্র ক্ষমতার লক্ষ্যে এগোয়, সর্বাগ্রে সে ইতিহাস বিস্মৃত করতে চায় মানুষকে। মানুষের শিক্ষাতেই প্রথম কোপ পড়ে। দেশের কেন্দ্র সরকার যে দলের, অর্থার ভারতীয় জনতা পার্টি ঠিক কোন কোন কারণে এক বিশেষ ধর্মের শাসকদের ইতিহাস মুছে ফেলতে চাইছে, কেন বিরোধিতার মুখ বন্ধে আরএসএসের নিষেধাজ্ঞাজনিত বিষয় বাদ করে দিতে চাইছে, সহজেই অনুমেয়। ইতিহাস গুলিয়ে দিলে বাকি দখলদারি অনেক সহজ, মসৃণ!





