দলবদলুদের হাতেই বিজেপির রাশ? আদি বিজেপি তৃণমূলের 'ভূত' দেখছে
Bengal BJP: ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টার মধ্যেই বঙ্গের বিজেপিকে ঘিরে ধরছে বিতর্ক আর বেজায় অস্বস্তি। কিন্তু কেন?

বহুদিন যাবৎ চুপ ছিলেন তিনি। একদা দলের অর্থাৎ গেরুয়া শিবিরের ঠোঁটকাটা 'ছোট দিলীপ' মুখ খুলছিলেন না একেবারেই। যেন বিমর্ষ, চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলেন বিজেপির সায়ন্তন। অবশেষে বোমা বিস্ফোরণ! সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে সায়ন্তনের লেখা একটি চিঠি। যা দেওয়া হয়েছে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জগৎপ্রকাশ নাড্ডাকে উদ্দেশ্য করে। আর সেই চিঠির বয়ান প্রকাশ্যে আসতেই ফের সৌমিত্র খাঁ-অস্বস্তি ছাড়িয়ে বেজায় বিড়ম্বনায় পড়েছেন সুকান্ত, শুভেন্দুরা। ঠিক কী লেখা হয়েছে ওই চিঠিতে?
সায়ন্তন লিখেছেন, দলবদলু নেতারাই দল চালাচ্ছেন। তৃণমূল থেকে আসা এক শ্রেণির নেতার অঙ্গুলিহেলনে চলছে বঙ্গের বিজেপি। তাঁর দাবি, এই অবস্থায় যেন মনে হচ্ছে, তৃণমূলের দুই শিবিরের লড়াই চলছে। সায়ন্তন উল্লেখ করেছেন, ১৯৮০ থেকে ২০১৯-এর সময়কালে বিজেপি কর্মীদের অবদানের কথাও।
যদিও এই চিঠি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করেননি সায়ন্তন। এদিকে বঙ্গ বিজেপি সভাপতি সুকান্ত মজুমদার বলছেন, দলে গুরুত্ব পাচ্ছেন সকলেই।
কিন্তু পুরনো বিজেপি নেতার এই আক্ষেপের পরে ফের তৈরি হয়েছে বিতর্ক। একের পর এক ইস্যুতে শাসক তৃণমূলের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিতের মধ্যেই এই প্রকার চাপে পড়েছে গেরুয়া শিবিরও।
প্রসঙ্গত, তথাগত রায়ের একের পর এক মন্তব্য-বানে বারবার বিদ্ধ হয় বিজেপি। বিতর্ক বাড়ান এই প্রবীণ বিজেপি নেতা। ঠিক এই আবহেই কয়েকদিন আগেই মুখ খুলেছেন বিষ্ণুপুরের বিজেপি সাংসদ সৌমিত্র। তিনি বলেন, অযোগ্যরা দল চালাচ্ছেন। আমি মানি না সুকান্ত মজুমদারকে। যদিও তাঁর ইঙ্গিতে প্রশংসা ছিল দিলীপ ঘোষ এবং শুভেন্দু অধিকারীর। এদিকে একের পর এক জেলা নেতৃত্বের ক্ষোভের মুখেও পড়েছে বিজেপি। কেন্দ্রীয় নেতারা, রাজ্যের পর্যবেক্ষকরা হাল ধরতে চাইলেও বারবার অস্বস্তি বেড়েছে সুকান্ত মজুমদারের বিজেপির ঘরে। একবার তথাগত, একবার সৌমিত্র, ফের সায়ন্তন-বিষাদে জর্জরিত হয়েছে মুরলীধর সেন লেনের গেরুয়া বাড়ি। এদিকে একা সুগ্রীবে রক্ষা না দিয়েই কিছুদিন আগেই মুখ খুলেছেন দিলীপ ঘোষ। সুকান্ত মজুমদারের নাম না করেই আক্রমণ শানিয়েছেন ফের। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টার মধ্যেই বঙ্গের বিজেপিকে ঘিরে ধরছে বিতর্ক আর বেজায় অস্বস্তি। কিন্তু কেন?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বঙ্গ বিজেপি-র অন্যতম প্রবীণ এক নেতা ইনস্ক্রিপ্ট-কে বলছেন, "আসলে এত বড় বড় ইস্যু। দলের অবস্থান। সঙ্গে আসল তৃণমূল-বিরোধী কে, সিপিআইএম না বিজেপি; এর একটা রাজনৈতিক যুদ্ধের মধ্যে দলের অভ্যন্তরে এই বিতর্ক মানানসই নয়। তবে এর কারণ হিসেবে মনেহয়, রাজ্যের নেতৃত্বের প্রতি সামগ্রিকভাবে অসন্তোষ। দলের কিছু একনিষ্ঠ কর্মীকে গুরুত্ব না দেওয়া। এর ফল ভুগতে হচ্ছে।''
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Saumitra Khan: রাজনৈতিক রাতের শান্তির ঘুমের আগেই ফের আড়মোড়া ভেঙেছেন বিজেপি সাংসদ সৌমিত্র খাঁ।
যদিও রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি অন্য।
'প্রবীণদের উপেক্ষা'
একদা এই রাজ্যে নুইয়ে পড়া বিজেপি যখন প্রায় নেই তখন থেকেই ময়দানে ছিলেন সায়ন্তনের মতো নেতারা। লড়াই, ত্যাগ, নানা বিপদ উপেক্ষা করেই এগিয়েছেন। কিন্তু এখন সেক্ষেত্রেও সাধিত হয়েছে পরিবর্তন। ক্রমশ বাড়ছে উপেক্ষার বহর। আর যা থেকেই প্রকাশিত হচ্ছে এই ক্ষোভ!
আদি বনাম নব্য
দলের একটা বড় অংশের কর্মী, সায়ন্তনের মতো নেতারা আজ খানিকটা কোণঠাসা। তাঁদের পাত্তা না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে দলের অন্দরেই। দলের এক শ্রেণীর নেতাদের ইন্ধনে ক্রমশ বিজেপি কর্মীদের একটা পুরোনো অংশ নিষ্ক্রিয় হয়েছেন। ঠিক সেই জায়গায় উঠে এসেছেন একটা নবীন গোষ্ঠী। যাঁরা প্রায় প্রত্যেকেই অন্য দল থেকে আসা। বিশেষত, তৃণমূল থেকে আসা।
'দলবদলু নেতা'
তৃণমূল থেকে আসা নেতারা, বিশেষত শুভেন্দু অধিকারীর মতো নেতারা আজ দলের সর্বেসর্বা। তাঁদের হাতেই দলের রাশ। ঠিক এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে আদি বিজেপি-র কাছে এই নবীন অনুষঙ্গ মানিয়ে নেওয়া বেশ কঠিন!
'দিলীপ এফেক্ট'
দিলীপ ঘোষ-গোষ্ঠী, এবং দিলীপের মতো একাধিক বিজেপি নেতা, যাঁরা এক সময় দলের রাজ্য শাখার নীতি নির্ধারক ছিলেন। তাঁদের ক্রমশ সরে যাওয়া বা সরিয়ে দেওয়ার কৌশল, দলের অন্দরে অসন্তোষ বৃদ্ধি করেছে।
'সুকান্ত-বিরোধ'
সুকান্ত মজুমদারের নেতৃত্ব মেনে না নেওয়া। দলের রাজ্য সভাপতিকে নিয়ে অসন্তোষ। তাঁকে পছন্দ না করা একটি গোষ্ঠীর ইন্ধন এই অসন্তোষে থাকতে পারে বলেও মত অনেকের।
যদিও সৌমিত্র, সুকান্তের প্রতি অসন্তোষ ব্যক্ত করেও বলেছেন শুভেন্দু অধিকারীর কথা। অর্থাৎ, এক ঢিলে দুই পাখি মেরে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন সুকান্ত নয়, শুভেদু শ্রেষ্ঠ! আবার সায়ন্তনের মতো নেতারা বলছেন ভিন্ন কথা। বিজেপি-র আদিকাল থেকে থাকা নেতার দাবি, একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয় দলের সার্বিক নীতির বিরুদ্ধে। অর্থাৎ দল যা করছে, যে পন্থা নিয়ে চলছে তা ঠিক নয়, দাবি তাঁর। এখানে সৌমিত্র এবং সায়ন্তন উবাচে পার্থক্য সূচিত হলেও আদতে দুই নেতাই যে বঙ্গের বিজেপি নেতৃত্বের কাজ নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন, যা নিয়ে অচিরেই সৃষ্টি হচ্ছে ব্যর্থ বঙ্গ বিজেপি-র প্রাধান্য। তা স্পষ্ট হয়েছে আবার। আর এখানেই স্পষ্ট হচ্ছে বিজেপি-র অন্দরের কাঁটা। যা বারবার বদলে দিচ্ছে বঙ্গের গেরুয়া শিবিরের চলার গতিপথ। তৃণমূল বিরোধিতা এবং সিপিআইএম-কে ছাপিয়ে যাওয়ার রাস্তা ধরে বেশি করে এগিয়ে আসছে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আর দলীয় অন্দরের অশান্তির গাড়ি। যা ঠিক কতটা অক্সিজেন দেবে বিজেপি-কে এই প্রশ্ন তুলে দেওয়ার সঙ্গেই ফের নুইয়ে পড়া বিজেপি-র দিকেই ইঙ্গিত করছে কী! প্রশ্ন উঠছে, উত্তর দেবে সময়।







