বাবরির স্বপ্ন ফেরি টাকার বিনিময়ে? বাংলার মুসলিম সমাজ ভোট দেবে হুমায়ুন কবীরকে?
Humayun Kabir Factor: পশ্চিমবঙ্গে হুমায়ূন কবীর কি সত্যিই নতুন বিকল্প হয়ে উঠতে পারবেন? তৃণমূলের দখলে কি ফাটল ধরেছে, আর এই পরিস্থিতিতে বিজেপি কতটা সুবিধা পেতে পারে? ভোটারদের মনোভাব ঠিক কোন দিকে?
পশ্চিমবঙ্গের ভোট রাজনীতিতে মুসলিম ভোট দীর্ঘদিন ধরেই একটি নির্ণায়ক শক্তি। রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ মুসলিম হওয়ায়, এই ভোট কোন দিকে যাবে তা অনেক সময়েই নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করে দেয়। এতদিন এই ভোটের বড় অংশ একতরফাভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে গেলেও, সাম্প্রতিক সময়ে সেই সমীকরণে ফাটল দেখা যাচ্ছে। এই ফাটলের কেন্দ্রেই উঠে আসছেন হুমায়ুন কবীরের নাম । ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, মুসলিম সমাজ কি তাঁকে ভোট দেবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই দেখতে হবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু অসন্তোষ জমা হয়েছে। বিশেষ করে ওয়াকফ সংক্রান্ত নীতিগত অবস্থান বদল, স্থানীয় স্তরে উন্নয়নের অসমতা, এবং কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত মুসলিম সমাজের একাংশের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করেছে। এই অস্বস্তিতেই মানুষ বিকল্প খুঁজছে।
এই পরিস্থিতেই উঠে এসেছেন হুমায়ূন কবীর। একসময় তৃণমূলের নেতা থাকা এই রাজনীতিক এখন নিজের দল গড়ে তুলেছেন এবং নিজেকে মুসলিম সমাজের স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। তাঁর ‘বাবরি মসজিদ’ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি মুসলিম সমাজের একাংশে আবেগের সঞ্চার করলেও, তা নিয়ে সমানভাবে প্রশ্নও উঠছে। অনেকেই মনে করছেন, এটি ধর্মীয় আবেগকে কেন্দ্র করে তৈরি একটি রাজনৈতিক কৌশল, যার লক্ষ্য ভোটব্যাঙ্কে প্রভাব ফেলা।
এই বিতর্ক আরও তীব্র হয় যখন তাঁর সঙ্গে আসাদউদ্দিন ওয়েইসির দল AIMIM-এর জোটের প্রসঙ্গ সামনে আসে। যদিও সেই জোট দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, তবুও শুরুতেই তা মুসলিম ভোট বিভাজনের আশঙ্কা তৈরি করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, মুসলিম ভোট যদি বিভক্ত হয়, তাহলে তার সরাসরি লাভ পেতে পারে বিজেপি। এই আশঙ্কার কারণে অনেক ভোটার এখন কৌশল করে ভোট দিতে চাইছেন, অর্থাৎ যে দল বিজেপিকে হারাতে পারবে, তারা সেই দলকেই সমর্থন করছেন।
এই প্রেক্ষাপটে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রসূন আচার্য-র মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, হুমায়ূন কবীরের পক্ষে এক বা দুইটির বেশি আসনে জেতা প্রায় অসম্ভব। তিনি বলেন,
মুসলিম ভোটাররা এবার অত্যন্ত সচেতনভাবে ভোট দেবেন। বিশেষ করে এসআইআর প্রক্রিয়ায় নাম বাদ যাওয়ার ঘটনার পরে, তাদের মধ্যে একটি স্পষ্ট মনোভাব তৈরি হয়েছে—যে দল বিজেপিকে হারাতে সক্ষম, তাকেই ভোট দেওয়া হবে। সে তৃণমূল, সিপিএম, কংগ্রেস বা আইএসএফ যেই হোক না কেন।
প্রসূন আচার্যের মতে,
হুমায়ূন কবীরকে অনেক মুসলিম ভোটার সন্দেহের চোখে দেখছেন। কারণ, তিনি প্রকাশ্যে বিজেপির সঙ্গে পোস্ট-পোল জোটের সম্ভাবনার কথা বলেছেন। এই অবস্থান মুসলিম ভোটারদের একাংশের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের যুক্তি, যে রাজনৈতিক শক্তিকে তারা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করেন, তার সঙ্গে কোনোভাবে হাত মেলানো যায় না। ফলে এই মনোভাব হুমায়ূনের বিরুদ্ধে যেতে পারে।
তবে তিনি এটাও বলেন, সম্পূর্ণভাবে হুমায়ূনকে খারিজ করা যাবে না। বিশেষ করে তাঁর নিজের প্রভাববলয়ে, যেমন বেলডাঙা বা রেজিনগর এলাকায়, তিনি কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারেন। স্থানীয় স্তরে অর্থের প্রভাবও ভোটে ভূমিকা নিতে পারে বলে তাঁর মত। কিন্তু রাজ্যজুড়ে সেই প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তিনি খুব কমই দেখছেন।
একই সুর শোনা যায় সাংবাদিক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্যের বক্তব্যেও। তাঁর পর্যবেক্ষণ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হুমায়ূনের প্রভাব কমেছে। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, গত কয়েক সপ্তাহে মুসলিম সমাজের বড় অংশের মধ্যে তাঁর উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ শুরুতে যে আবেগ তৈরি হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে বাস্তবতার মুখে পড়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এই বিশ্লেষণকে আরও গভীরতা দেন সমাজকর্মী আসিফ ফারুক। দীর্ঘদিন ধরে পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা এই সমাজকর্মীর মতে,
হুমায়ূন কবীর মূলত ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। ‘বাবরি মসজিদ’ ইস্যু, যা মুসলিম সমাজের কাছে অত্যন্ত সংবেদনশীল, তাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
আসিফ ফারুকের বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে, বাংলার মুসলিম সমাজের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক মনোভাব। তাঁর মতে, মুর্শিদাবাদ, মালদহ বা উত্তরবঙ্গের মুসলিমরা সাধারণত ধর্মভিত্তিক রাজনীতি পছন্দ করেন না। তারা বরাবরই ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির প্রতি আস্থা রেখেছেন। কংগ্রেস, সিপিএম বা তৃণমূল—এই ধারার দলগুলির প্রতি তাদের ঝোঁক বেশি। ফলে শুধুমাত্র ধর্মীয় আবেগের উপর ভিত্তি করে রাজনীতি করলে তা দীর্ঘমেয়াদে সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তিনি আরও বলেন,
বেলডাঙায় বাবরি মসজিদ ইস্যু ঘিরে যে রাজনীতি হয়েছিল, তা অনেকেই এখন ভাঁওতাবাজি হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। সাম্প্রতিক কিছু ভিডিও প্রকাশের পর সেই ধারণা আরও জোরদার হয়েছে বলে তাঁর মত। এই ধরনের রাজনীতি মুসলিম সমাজের প্রকৃত সমস্যার সমাধান করে না, তা পরোক্ষভাবে বিজেপির সুবিধা করে দেয় বলেও তিনি মনে করেন।
এই সমস্ত বিশ্লেষণ একসঙ্গে রাখলে একটি স্পষ্ট চিত্র সামনে আসে। মুসলিম সমাজের মধ্যে এখন তিনটি প্রবণতা কাজ করছে। একদল এখনও তৃণমূলের সঙ্গেই থাকতে চাইছে, কারণ তারা মনে করে বিজেপিকে হারাতে গেলে শক্তিশালী দলকেই সমর্থন করতে হবে। অন্য একটি অংশ বিকল্প খুঁজছে, কারণ তারা মনে করছে তাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। আর তৃতীয় একটি অংশ এখনও দ্বিধায়, তারা শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত নেবে।
ফলত হুমায়ূন কবীর কিছু ভোট অবশ্যই পাবেন। বিশেষ করে তাঁর নিজস্ব প্রভাববলয়ের এলাকায় তিনি একটি ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারেন। কিন্তু গোটা রাজ্যে মুসলিম ভোটকে একত্রিত করার মতো অবস্থানে তিনি এখনও পৌঁছতে পারেননি। তাঁর উপস্থিতি ভোট বিভাজনের আশঙ্কা তৈরি করছে তা ঠিক। সবচেয়ে বড় বিষয়, মুসলিম ভোটারদের মধ্যে একটি প্রবল ‘স্ট্র্যাটেজিক’ মানসিকতা কাজ করছে। তারা শুধু আবেগের ভিত্তিতে নয়, বাস্তব রাজনৈতিক হিসাব কষে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছেন। এই বাস্তবতা হুমায়ূনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।







