এই ফ্রান্স যেন ২০১৪-র জার্মানি! বিশ্বকাপের শেষ ধাপ পেরোতে পারবেন মেসিরা?

Fifa World Cup 2022 : আবার একটা সুযোগ। আবার একটা স্বপ্ন। এবার কি পূরণ হবে? নাকি আবার ২০১৪-র পুনরাবৃত্তি?

Aritra Som
৩ মিনিট
এই ফ্রান্স যেন ২০১৪-র জার্মানি! বিশ্বকাপের শেষ ধাপ পেরোতে পারবেন মেসিরা?

২০১৪ এবং ২০২২ – মাঝে কেটে গিয়েছে আটটি বছর। এই আট বছরে অনেক জল বয়ে গিয়েছে নদীতে, করোনা এসেছে। লকডাউন, নিউ নর্মালের জীবনের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে বিশ্ব। এই আটটি বছর পর আরও একটি জিনিস ঘটতে চলেছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ফের সেমি ফাইনালের গণ্ডি টপকে ফাইনালে আর্জেন্টিনা। ২০২২ ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপে চলছে মেসির বিজয়রথ। হাতে গোনা কয়েকদিন পরই কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামের মাটি দেখবে মহারণ। ২০১৮-র বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্সের বিপরীতে জীবনের শেষ বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচটি খেলতে নামবেন লিওনেল মেসি। আবার একটা সুযোগ। আবার একটা স্বপ্ন। এবার কি পূরণ হবে? নাকি আবার ২০১৪-র পুনরাবৃত্তি?

ঠিক আট বছর আগের একটি রাতের কথা। তখনও বহাল তবিয়তে বেঁচে আছেন মারাদোনা। ব্রাজিলের মাটিতে আর্জেন্টিনার জয় চেয়েছিলেন তিনি। চেয়েছিলেন মেসিও। সেমি ফাইনালে টাই ব্রেকারে রবেন, ভ্যান পার্সি, স্নেইডারদের নেদারল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছয় আর্জেন্টিনা। সে ছিল এক স্বপ্নের রাত। আর্জেন্টিনার ভক্তদের আনন্দের কান্না, ফের স্বপ্নপূরণ হওয়ার আশা, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিল অনুকূলে। কিন্তু বাধ সাধল জার্মানি। মুলার, সোয়াইন্সটাইগার, লাম, ক্লোজের প্রবল শক্তিধর জার্মানি। মাঠে নেমে মেসিকে বোতলবন্দি করে রাখার সবরকম প্রয়াস করেছিল। মেসিও যে সেভাবে দাগ কাটতে পারেছিলেন, তেমনটা নয়। তবুও বেশকিছু সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেগুলো কাজে লাগাতে পারেননি হিগুইনরা।

অন্যদিকে পরিবর্ত হিসেবে নেমে শেষ মুহূর্তে দুরন্ত গোল করেন জার্মানির মারিও গোৎজে। ওই একটি গোলে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে সমস্ত স্বপ্ন, সমস্ত আশা। দূর থেকে বিশ্বকাপ দেখে মাঠ ছাড়তে হয় মেসিদের। গোল্ডেন বলের পুরস্কার পেলেও মেসি ছিলেন মনমরা। কোনওদিনও মারাদোনা হতে পারবেন না তিনি, জানিয়ে দিয়েছিল তাঁর সমর্থকরাও।

তবুও লড়াই নেমে এসেছিল নিজের ভঙ্গি নিয়েই। ২০১৮-র আর্জেন্টিনা বনাম নাইজেরিয়া ম্যাচে অসুস্থ শরীরেও উপস্থিত ছিলেন মারাদোনা। ওই ম্যাচে তাঁর ছবি, তাঁর আশা, চিৎকার, উল্লাস ধরা থেকে গিয়েছে ক্যামেরার রিলে। কিন্তু সেবারও মেসিরা পারেননি। কাপ জিতে চলে যায় ফ্রান্স। ২০১৯-র কোপা আমেরিকাও হাতছাড়া হয় মেসিদের। তারপর আসে ২৫ নভেম্বর, ২০২০-র দিনটি। সোশ্যাল মিডিয়ায়, খবরের চ্যানেলে ভেসে ওঠে একটাই খবর। মারাদোনা আর নেই। বড়ো অসময়ে চলে গেলেন ’৮৬-র আর্জেন্টিনার স্বপ্নের কারিগর।

তারপর থেকে আর্জেন্টিনা দলটিকে একটু প্রত্যক্ষ করতে হবে। দেশের হয়ে তাঁর ফলাফল অত্যন্ত খারাপ, এর জবাব দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগলেন মেসি। পাশে পেলেন ডি মারিয়া, ডিবালা, ডে পল, আলভারেজ, এমি মার্তিনেজদের মতো খেলোয়াড়দের। তারপর এল ২০২১ সাল। ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জয়, ইতালিকে হারিয়ে ফাইনালিজমা জয় – আর্জেন্টিনা যেন আগ্নেয়গিরি থেকে জেগে ওঠা এক দৈত্য। বিশ্বাস আর ভরসা ফের ফিরে এল। মেসি… হ্যাঁ, পারলে তিনিই পারবেন। আর্জেন্টিনার অলিতে গলিতে এই কথাই ভেসে আসছে।

২০২২ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের সঙ্গে হারার পরও সেই বিশ্বাস ভাঙেনি। তারপর মেক্সিকো, পোল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া – একের পর এক বাধা টপকে মেসিরা আজ ফাইনালে। আবারও একটা ফাইনাল। আর মেসি? এই মেসিকে কেউ যেন চিনতেই পারছেন না। ৩৫ বছর বয়সে যেন নতুন উদ্যমে খেলতে শুরু করেছেন তিনি। বোতলবন্দি করার ছক ভেঙে নতুন ফুল ফোটাচ্ছেন। এবার আর হিগুইন, আগুয়েরো, মাসচেরানো নেই। বদলে আছেন ওটামেন্ডি, জুলিয়ান আলভারেজ, মার্তিনেজ, ডে পল, ম্যাক অ্যালিস্টাররা। যারা নিজেরাও ভরসা যোগাচ্ছেন। সেমি ফাইনালে ২২ বছরের আলভারেজ মনে করিয়েছেন মারাদোনাকে। আশা যেন এবার আরও তীব্র…

কিন্তু উল্টোদিকে এবার ফ্রান্স। আগের বারের জার্মানির মতোই যেন অপ্রতিরোধ্য। আক্রমণ ভাগে এমবাপে, জিরৌ, ডেম্বেলে, গ্রিয়াজমানদের ফলা। গোলের নিচে অধিনায়ক হুগো লরিস। খেলা যে কোনও সময় বদলে ফেলার ক্ষমতা রাখেন এঁরা। গতবারের চ্যাম্পিয়ন এই ফ্রান্স এবারও যেন অপ্রতিরোধ্য ভঙ্গিতে খেলছে। ঠিক আট বছর আগের জার্মানি। ক্লোজের জার্মানি। ব্রাজিলকে পর্যুদস্ত করে দেওয়া জার্মানি। এবার কি ফ্রান্সের পালা?

আট বছর আগের কথা নিশ্চয়ই মনে করছেন না মেসি। নাকি করছেন? দিয়েগো নেই এবার। কিন্তু তাঁর অদৃশ্য ছায়া যেন গোটা দলটাকে উজ্জীবিত করছে। তবুও একটা ‘কিন্তু’ থেকে গিয়েছে। এমবাপেকে সামলানো যাবে? সুযোগ সন্ধানী জিরৌকে রোখা যাবে? আশা দেখছে আর্জেন্টিনা। ভয়ও পাচ্ছে। তীরে এসে তরীটি যেন না ডুবে যায়। মেসির শেষ বিশ্বকাপ। ব্যর্থ যেন না হয়, প্রার্থনা চলছে নাগাড়ে।

লিখেছেন
Aritra Som
Aritra Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

নারী টেস্টে এত অনীহা কেন, লর্ডসের ইতিহাসও বদলাবে না সেই ছবি?

Women’s Test Cricket: লর্ডসে ভারতের নারী ক্রিকেট দলের ঐতিহাসিক জয় নারী টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ বদলানোর সুযোগ এনে দিয়েছে? এত সাফল্য ও জনপ্রিয়তার পরও কেন এই ফরম্যাটে নিয়মিত ম্যাচ নেই?

শিব-পরশুরামের যুদ্ধবিদ্যা কালারিপায়াট্টু থেকেই জন্ম কুংফুর!

Kalaripayattu Indian Martial Art: ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্যে কালারিপায়াট্টুকে স্রেফ যুদ্ধের কৌশল হিসেবে দেখা হয়নি, বরং এটিকে মানব শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রাণশক্তিকে জাগিয়ে তোলার এক মহান সাধনা বলে মনে করা হয়।

দু'হাজার বছর পুরনো ‘আত্য পাত্যা’: এই খেলাই শিখিয়েছিল যুদ্ধের কৌশল!

Atya Patya Traditional Indian Game: আনুমানিক ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত প্রাচীন তামিল সাঙ্গম সাহিত্য ‘নাটতৃণৈ’-তে এই খেলার প্রথম লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়। অতএব, এই খেলার বয়স প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি। সেখানে বলা আছে, প্রাচীন চোল রাজবংশের সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে নিজেদের ক্ষিপ্রতা, দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষমতা আর শরীরকে এক নিমেষে বাঁকানোর চপলতা বাড়াতে এই খেলায় মেতে উঠত।

১৬ বছর পর ফের ভারতের পথে ললিত মোদী

Lalit Modi return to India: দীর্ঘ সময় পর দিল্লির আপিল ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আর্থিক অনিয়মের বড় অভিযোগ ও জরিমানা বাতিল করে দেওয়ার পরেই এই আলোচনার সূত্রপাত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ললিত মোদী নিজেই স্পষ্ট করেছেন, সমস্ত বড়সড় আইনি জটিলতা কাটার পর ২০২৬ সালের শেষ দিকে অথবা ২০২৭-এর শুরুতেই ফের তিনি ভারতে পা রাখতে চলেছেন।

গোলের আড়ালে ঘৃণার খেলা: ২০২৬ বিশ্বকাপে ট্রাম্প, ফিফা আর ফুটবলের পরাজয়

Trump FIFA World Cup: এই বিশ্বকাপ শুধুই একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; মাঠের লড়াই ছাপিয়ে তা হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনীতি, বর্ণবিদ্বেষ এবং বাণিজ্যিক আধিপত্যের এক জটিল ময়দান।

একটা রাজপুত্তুর যার মুকুট হারিয়ে গিয়েছে

Lionel Messi Retirement: তিনটে ফাইনালের বোঝা। একে একে ছেড়ে যায় সহযোদ্ধারা। রক্তাক্ত মাসচেরানো চলে যান, কুন আগুয়েরোর অসুখ... তবু লিও পড়ে থাকে, আমরা পড়ে থাকি আর কিছুদিন। বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে প্রয়োজন ছিল একজন স্ক্যালোনির, তিনি সেটুকু সেতু নির্মাণের দায়িত্ব নিলেন। আমরা অপেক্ষা করলাম লুসাইলে। আমরা তো কবেই হেরে গিয়েছিলাম, সৌদি আরব শুধু চিনিয়ে দিয়েছিল আশপাশটা।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: যেভাবে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় পরিণত হল ফুটবল

FIFA Revenue 2026: 'কুইন্টেট প্রাইভেট ব্যাংক'-এর সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের অনুঘটক হওয়ার চেয়ে বিশ্বকাপ আসলে একটি শক্তিশালী স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক উদ্দীপক হিসেবেই বেশি কাজ করে। ফিফা, সম্প্রচারকারী সংস্থা, স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড এবং আতিথেয়তা (হসপিটালিটি) ক্ষেত্রগুলি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করলেও, কোম্পানির শেয়ারের দামে সেই ইতিবাচক প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে রাখা বেশ কঠিন।

যখন ইউরোপে নারীরা গৃহবন্দি, তখন অসমে মেয়েরা খেলছিলেন ধোপখেল

Dhop Khel Assam: আহোম রাজাদের রাজপ্রাসাদ থেকে বিহুর মেঠো মাঠ—অসমের মাটিতে একসময় গমগম করত ধোপখেলের আওয়াজ। ফুটবল, কাবাডি আর দূরন্ত নিশানার এই অদ্ভুত রোমাঞ্চকর খেলাটি শুধু পুরুষদের বীরত্ব প্রমাণের লড়াই ছিল না; যখন ইউরোপে নারীদের জীবন ছিল চার দেওয়ালে বন্দি, তখন অসমে মেয়েরাও মাঠে নেমে মেতে উঠতেন ধোপখেলে।