যখন ইউরোপে নারীরা গৃহবন্দি, তখন অসমে মেয়েরা খেলছিলেন ধোপখেল
Dhop Khel Assam: আহোম রাজাদের রাজপ্রাসাদ থেকে বিহুর মেঠো মাঠ—অসমের মাটিতে একসময় গমগম করত ধোপখেলের আওয়াজ। ফুটবল, কাবাডি আর দূরন্ত নিশানার এই অদ্ভুত রোমাঞ্চকর খেলাটি শুধু পুরুষদের বীরত্ব প্রমাণের লড়াই ছিল না; যখন ইউরোপে নারীদের জীবন ছিল চার দেওয়ালে বন্দি, তখন অসমে মেয়েরাও মাঠে নেমে মেতে উঠতেন ধোপখেলে।
রঙালী বিহুর সকাল। ঢোলের বাদ্যি আর বাঁশির সুরে চারপাশ মাতোয়ারা। গ্রামের খোলা মাঠে ততক্ষণে ভিড় জমতে শুরু করেছে। মাঝবয়সি প্রবীণ থেকে শুরু করে একদম একরত্তি শিশু—সবার নজর মাঠের মাঝখানে। সেখানে লাল-নীল পতাকায় ঘেরা একটা ১২৫ মিটার লম্বা আর ৮০ মিটার চওড়া মাঠ। একদল তরুণ উন্মুখ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতের তালু ডলছে, কেউ বা লাফিয়ে গা গরম করে নিচ্ছে। তাদের চোখ মাঠের এক কোণে রাখা নরম কাপড়ের তৈরি একটা বিশেষ বলের দিকে। অসমের মেঠো ধুলোয় আজ আবার জমে উঠবে এক প্রাচীন লড়াই, যার নাম—ধোপখেল।
আজ থেকে কয়েকশো বছর আগে ১২২৮ সালে চাওলুং সুকাফা যখন তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে অসমে পা রেখেছিলেন, তখন থেকেই এই খেলার শুরু হয়। পরবর্তীতে আহোম রাজাদের আমলে এই ধোপখেল এক অদ্ভুত মর্যাদা পেয়ে যায়। রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে যখন এই খেলা বসত, তখন রাজা রুদ্র সিংহ কিংবা শিব সিংহের মতো পরাক্রান্ত শাসকেরা সিংহাসনে বসে উপভোগ করতেন তরুণদের সাহসিকতা। তবে এটা শুধুই বিনোদন ছিল না! আহোম রাজারা ছিলেন ভারী শেয়ানা। খেলা দেখতে দেখতেই তাঁরা বুঝে যেতেন কোন তরুণের নজর কতটা নিখুঁত, কার দৌড়ের গতি কেমন, আর কে বিপদের মুখে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারে। মাঠের সেরা খেলোয়াড়টি খেলা শেষে অনেক সময় সোজা জায়গা পেয়ে যেত রাজকীয় সেনাবাহিনীতে! অর্থাৎ, রাজাদের কাছে এটি ছিল যুদ্ধকৌশল আর শরীর ফিট রাখার এক গোপন পাঠশালা।
তবে এই খেলার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিকটা লুকিয়ে ছিল সমাজের এক অন্য ছবিতে। ইতিহাস পাতা ওল্টালে দেখা যায়, আজ থেকে কয়েকশো বছর আগে অর্থাৎ ১৩শ থেকে ১৯শ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে, যখন ইউরোপের রেনেসাঁ কিংবা শিল্প বিপ্লবের প্রাথমিক যুগে নারীদের জীবন ছিল মূলত চার দেওয়ালের ভিতরে বন্দি, বিবাহিত নারীরা ছিলেন স্বামীর আইনি নিয়ন্ত্রণে এবং তাঁদের সামাজিক স্বাধীনতা ছিল অত্যন্ত সীমিত—ঠিক সেই একই সময়ে অসমের মেঠো মাঠে ডানা মেলছিল নারী স্বাধীনতা! তৎকালীন ইউরোপে নারীদের যখন কেবল ঘরের কাজ, সন্তান পালন আর বাধ্য গৃহবধূ হিসেবেই দেখতে অভ্যস্ত ছিল সমাজ, তখন অসমের সবুজ মাঠে প্রথা ভেঙে নেমে পড়তেন মেয়েরা। পুরুষদের পাশাপাশি মেয়েরাও মেতে উঠতেন এই ধোপখেলে।
বিহুর সময়ে মেয়েদের এই ধোপখেল ছিল এক পরম আকর্ষণের জায়গা। অবশ্য মেয়েদের খেলার জন্য নিয়মে কিছুটা নরম ছোঁয়া থাকত। পুরুষদের খেলা ছিল প্রচণ্ড আক্রমণাত্মক আর শারীরিক শক্তির লড়াই, আর মেয়েদের খেলায় বলের আঘাতের তীব্রতা কিছুটা কম রাখা হতো যাতে শারীরিক ঝুঁকি না থাকে। কিন্তু খেলার মূল রোমাঞ্চ আর কাঠামো ছিল একদম একই—সেই ১১ জনের দল, মাঠের সীমানা, বল ছুড়ে দেওয়া, ‘কাটোনি’ শিকার আর ‘কোটা’ করার উত্তেজনা! মেয়েদের এই খেলা কেবল বিনোদন ছিল না, ছিল তাঁদের যৌবন, সাহসিকতা আর শারীরিক সক্ষমতা জাহির করার এক পরম মাধ্যম।
কিন্তু কীভাবে খেলা হয় এই ধোপখেল? কেন একে বলা হয় ফুটবল, কাবাডি আর দূরন্ত এক থ্রোয়িং গেমের অদ্ভুত মিশেল?
মাঠের ভিতরে দুটো দল, প্রতি দলে ১১ জন করে মোট ২২ জন খেলোয়াড়। মাঠের ঠিক মাঝখানে একটা বৃত্ত আঁকা, যাকে স্থানীয় ভাষায় বলে ‘ঘের’। আর চার কোণে পতপত করে উড়ছে চারটে পতাকা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Yubi Lakpi Manipur: ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্য মণিপুরে গেলে ঠিক এমন এক রোমাঞ্চকর খেলার দেখা মিলবে। স্থানীয় মানুষ একে ভালোবেসে ডাকেন 'ইয়ুবি লাকপি'। মেইতেই ভাষায় ‘ইয়ুবি’ মানে নারকেল, আর ‘লাকপি’ শব্দের অর্থ ছিনিয়ে নেওয়া। ফুটবল বা রাগবির আন্তর্জাতিক গ্ল্যামার হয়তো এর নেই, কিন্তু এর প্রতিটা মিনিটে যে আদিম উত্তেজনা লুকিয়ে আছে, তা যেকোনো আধুনিক খেলাকে টেক্কা দিতে পারে।
খেলা শুরু হতেই এক দলের এক তরুণ হাতের সেই কাপড়ের বলটা উঁচু করে ছুড়ে দিল প্রতিপক্ষের অর্ধে। হাওয়ায় ভেসে আসা সেই বল শূন্যেই ধরে ফেলতে পারলে হাততালি, আর না ধরতে পারলে হুশ করে বেরিয়ে গেল সুযোগ! তবে খেলার আসল রোমাঞ্চ লুকিয়ে থাকে মাঠের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বিশেষ খেলোয়াড়কে ঘিরে। তাকে বলা হয় ‘কাটোনি’।
আক্রমণকারী দলের মূল লক্ষ্যই হলো এই কাটোনিকে কাবু করা। দলটির একজন চটপটে তরুণ ছুটতে ছুটতে এসে মাঝের সেই ‘ঘের’-এর মধ্যে দাঁড়ায়। তারপর পুরো শক্তি আর নিখুঁত নিশানায় বলটা ছুড়ে মারে সেই কাটোনির দিকে। উদ্দেশ্য একটাই—বলটা যেন কাটোনির কোমরের নিচের অংশে গিয়ে লাগে। এই আঘাত সফল হলেই চারদিক থেকে চিৎকার ওঠে, “কোটা!”
আর ঠিক এখান থেকেই শুরু হয় ধোপখেলের সবচেয়ে অদ্ভুত নাটকীয়তা!
‘কোটা’ খাওয়া মাত্র কাটোনি তার সক্রিয় ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। সে হয়ে যায় ‘বন্ধা’, অর্থাৎ সোজা কথায় একপ্রকার বন্দি! আর মজার নিয়ম হলো, বন্দি হওয়ার পর তাকে নিজের দল ছেড়ে গিয়ে দাঁড়াতে হয় প্রতিপক্ষের সীমানায়! ভাবুন একবার, আপনি নিজের দলের হয়ে খেলতে এসেছেন, অথচ এখন আপনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে শত্রুপক্ষের উঠোনে!
কিন্তু গল্প তো এখানেই শেষ নয়। এই বন্দি খেলোয়াড়টির মন জুড়ে তখন একটাই চিন্তা—যেকোনো মূল্যে নিজের ঘরে ফিরতে হবে। সে প্রতিপক্ষের ভিড়ে দাঁড়িয়ে লুকিয়ে ফাঁক খোঁজে। প্রতিপক্ষ যখন নিজেদের মধ্যে বল ছুড়ে খেলা চালাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে চিলের মতো ছোঁ মেরে যদি সে বলটা লুফে নিতে পারে, অমনি মারে এক দে-ছুট! একে বলা হয় ‘আউলিয়া’। প্রতিপক্ষের কেউ তাকে ছোঁয়ার আগেই যদি সে বল হাতে দৌড়ে নিজের অর্ধে ফিরে আসতে পারে, তবে সে আবার বেঁচে যায়, ফিরে পায় তার পুরনো ক্ষমতা। তবে ফেরার পথে একটাই শর্ত—মাঠের সীমানা পেরোনো যাবে না, আর কেউ যেন তাকে স্পর্শ করতে না পারে।
এভাবে একের পর এক খেলোয়াড় যখন বন্দি হতে থাকে, পুরো মাঠ জুড়ে তৈরি হয় এক অদ্ভুত দৃশ্যপট। কার দল কোনটা, কে কাকে বাঁচাচ্ছে, আর কে কাকে বল ছুড়ে মারছে—তা বাইরে থেকে দেখে বোঝা দায়! করতে করতে একসময় যদি একটি দলের ১০ জন খেলোয়াড়ই বন্দি হয়ে যায়, তবে মাঠে বেঁচে থাকে শেষ একজন কাটোনি। একলা সেই কাটোনিকে শেষ বল দিয়ে ঘায়েল করতে পারলেই মিলে যায় চূড়ান্ত জয়, যাকে বলা হয় ‘পিরিউঠা’!
আহোম রাজবাড়ির রাজকীয় আঙিনা পেরিয়ে এই খেলা একসময় ঢুকে পড়েছিল গ্রামের মানুষের রক্তে। বিহুর দিনে তরুণদের প্রেম, ভালবাসা আর সাহসিকতা জাহির করার সবচেয়ে বড় মঞ্চ ছিল এই ধোপখেল।
যখন পৃথিবীর বহু উন্নত সভ্যতায় নারীদের খেলার মাঠে নামার কথা কল্পনাও করা যেত না, তখন অসমীয়া সমাজ নারী-পুরুষের এই সমতার বার্তা দিয়েছিল খেলাধুলার মধ্য দিয়েই।
১৮২৬ সালে যখন ব্রিটিশদের হাত ধরে আহোম রাজত্বের সূর্য অস্ত গেল, তখন রাজবাড়ির পৃষ্ঠপোষকতাও বন্ধ হয়ে গেল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফুটবল, ক্রিকেট আর হাতের মুঠোয় থাকা ডিজিটাল স্ক্রিনের ভিড়ে এই মাটির খেলা আজ কিছুটা ম্লান। গ্রামবাংলার অনেক তরুণই হয়তো আজ আর ‘কাটোনি’ বা ‘পিরিউঠা’ শব্দগুলির সঙ্গে পরিচিত নয়। মেয়েদের ধোপখেলও এখন প্রায় বিলুপ্তির পথেই, মাঝে মাঝে কেবল প্রদর্শনী ম্যাচে বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এর দেখা মেলে।
তবে ইতিহাস কি অত সহজে মোছে? আজও যখন অসমের মেঠো মাঠে বিহু উপলক্ষে গ্রামের প্রবীণরা কোনো তরুণকে হাত ধরে টেনে নামিয়ে দেন ধোপখেলের মাঠে, আর কাপড়ের বলটা সজোরে হাওয়ায় ভেসে ওঠে, তখন মনে হয়—না, ঐতিহ্য মরে যায়নি। আহোম রাজাদের বীরত্ব, বিহু উৎসবে মেলবন্ধনের আনন্দ আর অসমের মাটির সোঁদা গন্ধ নিয়ে ধোপখেল আজও বেঁচে আছে, আর বেঁচে থাকবে অসমীয়া সংস্কৃতির প্রতিটি হৃৎস্পন্দনে।






