কেন মিডটার্ম নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?
US Midterm Elections 2026: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা। কেন ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল হয়ে উঠল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা, তাঁর প্রশাসনের নীতি এবং রিপাবলিকান পার্টির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভোটারদের মনোভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। নির্বাচনে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ আসনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পরাজয় এবং ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য বুঝিয়ে দিল, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প যে জনসমর্থন পেয়েছিলেন, তা ধরে রাখা তাঁর পক্ষে সহজ হচ্ছে না। বরং তাঁর নীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষ এখন রিপাবলিকান শিবিরের নির্বাচনী ক্ষতির কারণ হয়ে উঠেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) ভোটার সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ভোটার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষুব্ধ অথবা অসন্তুষ্ট। যাঁরা ভোট দেওয়ার সময় ট্রাম্পের কথা মাথায় রেখেছিলেন, তাঁদের মধ্যে তাঁর বিরোধিতা করার উদ্দেশ্য নিয়ে ভোট দিয়েছেন এমন মানুষের সংখ্যা সমর্থন করার উদ্দেশ্যে ভোট দেওয়া মানুষের প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ, ভোটারদের কাছে এই নির্বাচন অনেকটাই ট্রাম্পের শাসন এবং তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতি সমর্থন অথবা প্রত্যাখ্যানের প্রশ্ন হয়ে উঠেছিল।
এই অসন্তোষের পিছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। নির্বাচনী সমীক্ষায় প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার মনে করেছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিই দায়ী। মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় ফিরেছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু ভোটারদের একাংশের অভিজ্ঞতা সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে মেলেনি। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং বিদেশি পণ্যের উপর শুল্ক আরোপের মতো নীতিও অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে বলে সমীক্ষায় উঠে এসেছে।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হওয়ার আর একটি বড় কারণ তাঁর প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থার অভাব। সমীক্ষায় প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার তাঁর কাজকর্মে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার মনে করেন, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার উপর কংগ্রেসের আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি থাকা প্রয়োজন। আরও প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটারের ধারণা, ট্রাম্প দেশের স্বার্থের চেয়ে নিজের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেন।
এই নির্বাচনে ট্রাম্পের রাজনৈতিক জোটের দুর্বলতা বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়েছে তরুণ এবং হিস্পানিক ভোটারদের মধ্যে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৩০ বছরের কম বয়সি ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্প ও কমলা হ্যারিসের সমর্থন প্রায় সমান ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ওই বয়সি ভোটারদের প্রায় ৭০ শতাংশ নিজেদের এলাকার ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে সমর্থন করেছেন। হিস্পানিক ভোটারদের মধ্যেও একই প্রবণতা দেখা গিয়েছে। ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া হিস্পানিকদের তুলনায় এবার অনেক বেশি মানুষ ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের সমর্থন করেছেন। তাঁদের প্রায় ৭০ শতাংশ মনে করেন, ট্রাম্পের নীতির ফলে মার্কিন অর্থনীতির পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের সাফল্যের পিছনে তরুণ এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ভোটারদের একাংশের সমর্থন বড় ভূমিকা নিয়েছিল। বিশেষ করে অভিবাসী পরিবার থেকে আসা হিস্পানিক ভোটারদের সমর্থন রিপাবলিকানদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক অবস্থান সেই সমর্থনের ভিত দুর্বল করেছে। এই প্রবণতা ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ডেমোক্র্যাটদের জয় এবং রিপাবলিকানদের দুর্গে ধাক্কা
যে রাজ্যগুলিতে ট্রাম্পের প্রভাব শক্তিশালী বলে মনে করা হত, সেখানেও ডেমোক্র্যাটরা সাফল্য পেয়েছেন। জর্জিয়া, নিউ হ্যাম্পশায়ার ও নর্থ ক্যারোলিনার মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজ্যের পাশাপাশি আইওয়া, কানসাস, টেক্সাস এবং সাউথ ক্যারোলিনার মতো রিপাবলিকান-প্রভাবিত রাজ্যেও ডেমোক্র্যাটদের জয় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
জর্জিয়ায় কিশা ল্যান্স বটমস রাজ্যের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। টেক্সাসে জিনা হিনোজোসা তিনবারের রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে হারিয়ে রাজ্যের প্রথম লাতিনা গভর্নর হওয়ার পথে এগিয়েছেন। টেক্সাসের সেনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস তালারিকোর জয়ও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই রাজ্যে ট্রাম্প ১৪ শতাংশের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন।
নর্থ ক্যারোলিনায় প্রাক্তন গভর্নর রয় কুপার সেনেট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। জর্জিয়ায় জন অসফ জয় ধরে রেখেছেন। নিউ হ্যাম্পশায়ারে ক্রিস পাপাস সেনেট নির্বাচনে জয়ী হয়ে মার্কিন সেনেটের প্রথম প্রকাশ্যে সমকামী সদস্য হওয়ার নজির গড়েছেন। ওহাইয়োতে প্রাক্তন সেনেটর শেরড ব্রাউন রিপাবলিকানদের দখলে থাকা আসনটি পুনরুদ্ধার করেছেন। একই রাজ্যে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যামি অ্যাক্টন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী বিবেক রামাস্বামীকে গভর্নর নির্বাচনে পরাজিত করেছেন।
কানসাসেও রিপাবলিকান সেনেটর রজার মার্শালকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিল্টন। অন্যদিকে, সাউথ ক্যারোলিনায় ট্রাম্পের পছন্দের প্রার্থী ডারলিন গ্রাহামের পরাজয় রিপাবলিকান শিবিরের কাছে বড় ধাক্কা। এই ফলাফলগুলির মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে রিপাবলিকান প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করার কৌশল এবার আর কার্যকর হয়নি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে একই সঙ্গে হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং সেনেটের নিয়ন্ত্রণ এক দল থেকে অন্য দলের হাতে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে মাত্র তিনবার—১৯৪৬, ১৯৯৪ এবং ২০০৬ সালে। ২০২৬ সালের নির্বাচন সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ডেমোক্র্যাটরা দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের দিকে এগিয়েছেন। এর ফলে ট্রাম্পের প্রশাসনের উপর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি বাড়তে পারে। এত দিন রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণাধীন কংগ্রেসে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তগুলির বিরুদ্ধে কার্যকর বাধা তৈরি হয়নি। কিন্তু রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গেলে সেই পরিস্থিতি আর থাকবে না।
ডেমোক্র্যাটদের জয় মানেই বিকল্প রাজনীতির উত্থান?
তবে এই নির্বাচনের ফলাফলকে ডেমোক্র্যাট পার্টির প্রতি ব্যাপক জনসমর্থনের নিঃশর্ত প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমেছে, কিন্তু ডেমোক্র্যাটদের নিজেদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এপি-র সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেক ভোটারের কাছেই ডেমোক্র্যাট পার্টির ভাবমূর্তি নেতিবাচক। রিপাবলিকানদের ক্ষেত্রে এই অসন্তোষের পরিমাণ প্রায় ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ, ডেমোক্র্যাটরা তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও তাঁদের রাজনৈতিক সংকট পুরোপুরি কাটেনি।
দলের ভিতরেও মতাদর্শগত বিভাজন রয়েছে। একদিকে রয়েছেন উদারপন্থী ও মধ্যপন্থী নেতারা, অন্যদিকে রয়েছেন প্রগতিশীল বামপন্থীরা। পেনসিলভানিয়ার গভর্নর জশ শাপিরো এবং মেরিল্যান্ডের গভর্নর ওয়েস মুরের মতো মধ্যপন্থী নেতাদের সাফল্য দলের এই অংশকে শক্তিশালী করেছে। অন্যদিকে, ফ্লোরিডায় গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী হিসেবে পরিচিত অ্যাঞ্জি নিক্সনের পরাজয় প্রগতিশীল শিবিরের জন্য ধাক্কা। ফলে ট্রাম্পবিরোধী ভোট এক জায়গায় জমা হলেও ভবিষ্যতে সেই ভোটের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কে করবেন, তা নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলবে।
এই নির্বাচনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, নির্বাচনী কেন্দ্রের সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা জেরিম্যান্ডারিং নিয়ে রিপাবলিকানদের কৌশলের ব্যর্থতা। নিজেদের নির্বাচনী সুবিধা বাড়াতে টেক্সাসে কংগ্রেসের নির্বাচনী কেন্দ্রগুলির সীমানা নতুন করে নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন ট্রাম্প। এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসমও নিজের রাজ্যে একই ধরনের উদ্যোগ নেন। পরে একাধিক ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান-শাসিত রাজ্যে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়।
কাগজে-কলমে কেন্দ্রের সীমানা বদলের ফলে রিপাবলিকানদের প্রায় ন'টি আসন বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই কৌশল প্রত্যাশামতো কাজ করেনি। বিশেষ করে টেক্সাস ও ফ্লোরিডায় হিস্পানিক এবং অন্যান্য অশ্বেতাঙ্গ ভোটারদের সমর্থনের উপর ভরসা করেছিল রিপাবলিকানরা। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল দেখিয়েছে, ২০২৪ সালের মতো এবার তাঁদের সমর্থন ধরে রাখা যায়নি। ফ্লোরিডার তিনটি কংগ্রেসীয় কেন্দ্রে রিপাবলিকানদের জয় নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হলেও সেখানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। অর্থাৎ, নির্বাচনী মানচিত্র নিজেদের সুবিধামতো বদলালেই ভোটারদের মনোভাব নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। তাঁর দ্বিতীয় দফার প্রেসিডেন্সির এখনও প্রায় দু'বছর বাকি। ফলে এই নির্বাচনের ফলাফলকে তাঁর রাজনৈতিক অধ্যায়ের চূড়ান্ত সমাপ্তি বলা যাবে না। তবে এটুকু স্পষ্ট, ক্ষমতায় ফিরে আসার পর যে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব এবং জনসমর্থনের উপর নির্ভর করে তিনি প্রশাসন পরিচালনা করছিলেন, তার ভিত নড়তে শুরু করেছে। মূল্যবৃদ্ধি, যুদ্ধ, অভিবাসন নীতি এবং ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণের বিরুদ্ধে ভোটারদের অসন্তোষ রিপাবলিকানদের নির্বাচনী ক্ষতির অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এই ফলাফল মার্কিন রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করল। ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব কতটা দ্রুত কমবে, আর ডেমোক্র্যাটরা সেই সুযোগকে কতটা স্থায়ী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে পারবেন, আগামী দু'বছরে তারই পরীক্ষা হবে।






