১১ দিনে ৯৭ জনের মৃত্যু! গাজার যুদ্ধবিরতি কি শুধুই প্রহসন?
Gaza Ceasefire: অন্তত ৮০ বারের বেশি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করা হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসেব অনুযায়ী, এগারো দিনে ৯৭ জন নিহত হয়েছেন, বেশির ভাগই শিশু ও নারী।

গাজায় এখনও ইজরায়েলি হামলা চলছে। একের পর এক বিস্ফোরণ, ধসে পড়ছে ঘরবাড়ি, হাসপাতালে এখনও আহতদের ভিড়। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন, “যুদ্ধবিরতি এখনও কার্যকর রয়েছে।” মাত্র এগারো দিনে ৯৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন, এখনও প্রতিদিন গোলাগুলির শব্দে কেঁপে উঠছে আকাশ, তারপরও ট্রাম্পের এই মন্তব্য এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক বিশ্লেষকই বলছেন, এই বক্তব্য আসলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থানকেই স্পষ্ট করছে, গাজার বাস্তবতা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ওয়াশিংটনের কূটনীতি।
ইজরায়েল বলছে, তারা কেবল 'নিরাপত্তা অভিযান' চালাচ্ছে, হামাসের গোপন ঘাঁটি ধ্বংস করছে। অন্যদিকে হামাস অভিযোগ তুলেছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরও ইজরায়েল সাধারণ মানুষের ঘরবাড়িতে হামলা চালাচ্ছে। এর ফলে কাগজে যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি থাকলেও, বাস্তবে গাজা এখনও ধ্বংসের মুখে।
১০ অক্টোবর ২০২৫-এ যুদ্ধবিরতির ঘোষণা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র, মিশর ও কাতারের মধ্যস্থতায় চুক্তি হয় ইজরায়েল ও হামাসের মধ্যে। শর্ত ছিল— দুই পক্ষই অস্ত্রবিরতি মেনে চলবে, গাজার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছতে দেওয়া হবে এবং বন্দি বিনিময়ের প্রক্রিয়া শুরু হবে। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সেই চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও দক্ষিণ গাজায় ইজরায়েল গোলাবর্ষণ করেছে। অন্তত ৮০ বারের বেশি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করা হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসেব অনুযায়ী, এগারো দিনে ৯৭ জন নিহত হয়েছেন, বেশির ভাগই শিশু ও নারী।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Trump Peace Plan & Hamas Response: হামাস জানিয়েছে, তারা গাজায় আটক সব ইজরায়েলি বন্দিকে, জীবিত ও মৃত উভয়কেই, মুক্তি দিতে প্রস্তুত। তবে, হামাস ট্রাম্পের পরিকল্পনার অন্যান্য দিক নিয়ে আরও আলোচনা চায়।
ইজরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, যুদ্ধবিরতির সময়েও হামাস তাদের উপরগুলি চালিয়েছে। সীমান্তের কাছে ড্রোন হামলার অভিযোগও করেছে তারা। ইজরায়েলের বক্তব্য, হামাস যুদ্ধবিরতির সুযোগ নিয়ে তাদের নিরাপত্তা বাহিনীর উপর হামলা চালাচ্ছে। কিন্তু হামাসের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ইজরায়েলই প্রথম চুক্তি ভেঙেছে। তারা বলছে, গাজায় 'সেফ জোন' বলে ঘোষিত এলাকাগুলিতেও ইজরায়েলি বাহিনী নিয়মিত হামলা চালাচ্ছে। হামাসের মুখপাত্রের অভিযোগ, “বাস্তবে ইজরায়েল নতুনভাবে গাজার উপর দমননীতি চালাচ্ছে।” দুই পক্ষের দোষারোপের মাঝে গাজার সাধারণ মানুষ প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছে, আহত হচ্ছে, ঘর হারাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতেই ট্রাম্পের মন্তব্যে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, “যুদ্ধবিরতি এখনও কার্যকর রয়েছে। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও সেটা চুক্তি ভঙ্গ নয়।” তিনি আরও বলেন, “হামাস হামলাগুলো ঘটছে, হয়ত হামাসের নেতৃত্ব নেই, বরং কিছু বিদ্রোহী বা উগ্র গোষ্ঠী দায়ী।” ট্রাম্পের এই মন্তব্য অনেকের কাছেই একপাক্ষিক বলে মনে হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বক্তব্যে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ আড়াল করার চেষ্টা স্পষ্ট।
কিন্তু ট্রাম্পের বক্তব্যের বাইরে গাজার বাস্তব ছবি অনেক ভিন্ন। গাজা শহরে এখনও চলছে তীব্র মানবিক সঙ্কট। হাসপাতালগুলোতে জায়গা নেই। খাবার, জল, ওষুধ— সবকিছুর ঘাটতি। জাতিসংঘ জানিয়েছে, গাজায় অন্তত ১২ লাখ মানুষ এখনও সহায়তার উপর নির্ভরশীল। সীমান্তে অবরোধ ও বোমাবর্ষণের কারণে ত্রাণ পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। একজন স্থানীয় বাসিন্দা টাইমস-কে বলেছেন, “যুদ্ধবিরতি কাগজে আছে, কিন্তু বাস্তবে প্রতিদিনই বোমার শব্দে ঘুম ভাঙে।” আরেকজন বলেন, “আমরা চাই শুধু শান্তি। বাচ্চারা যেন স্কুলে যেতে পারে, হাসপাতাল চালু হোক। কিন্তু এখনও যুদ্ধ আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা।”
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Israel’s killing of journalists: ইজরায়েল ১৯৬৭ সালে দখলদারিত্বের প্রথম দিন থেকেই, মিডিয়া রিপোর্টিংয়ের উপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চেয়েছে। পরে সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণ করতে সেন্সরশিপ আনা হয়।
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বন্দি বিনিময়। হামাসের হাতে থাকা ইজরায়েলি বন্দিদের মুক্তি এবং ইজরায়েলের হাতে থাকা প্যালেস্টাইন বন্দিদের মুক্তি, কিন্তু উভয় প্রক্রিয়াই এখন বন্ধ। উভয় পক্ষই একে অপরকে দায়ী করছে আলোচনার ব্যর্থতার জন্য। পুনর্গঠনের দিকেও অগ্রগতি নেই। যুদ্ধের সময় ধ্বংস হয়েছে শত শত ঘরবাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল। গাজা শহরের বড় অংশই এখন ধ্বংসস্তূপ। কিন্তু পুনর্গঠন শুরু করার মতো স্থিতিশীল পরিবেশ বা নিরাপত্তা পরিস্থিতি কেউই নিশ্চিত করতে পারছে না।
গাজা সীমান্তে 'হলুদ সীমা' (Yellow Line) বা নতুন নিয়ন্ত্রণরেখা তৈরি করেছে ইজরায়েল, এমনটাই অভিযোগ তুলেছে প্যালেস্টাইন প্রশাসন। তাদের দাবি, এই সীমার মধ্যে পড়ে গিয়েছে বহু গ্রাম ও কৃষিজমি, ফলে হাজার হাজার মানুষ এখন ঘরে ফিরতে পারছে না। ইজরায়েল বলছে, এটি শুধু তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা। কিন্তু স্থানীয়দের মতে, এই রেখা আসলে নতুন দখলনীতির সূচনা।
যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতাকারী হিসেবে শান্তি রক্ষার কথা বলছে, কিন্তু তাদের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে ইজরায়েলের পাশে দাঁড়াচ্ছে, কিন্তু গাজার মানবিক সংকট নিয়ে তুলনামূলকভাবে নীরব। মিশর ও কাতার আলোচনার পথে শান্তি ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করছে, তবে দুই পক্ষের অনমনীয় অবস্থান সেই প্রচেষ্টা ব্যাহত করছে।
গাজা শহরের এক স্কুলশিক্ষক টাইমস-কে বলেন, “আমরা শুধু চাই যেন আমাদের সন্তানদের সামনে যুদ্ধের দৃশ্য না আসে। এত মৃত্যু, এত ভয় এটা যেন শেষ হয়।” একজন বৃদ্ধ বলেন, “প্রতিবার যুদ্ধের পর বলে, এবার শান্তি আসবে। কিন্তু আমরা জানি, এই শান্তি কেবল কাগজে লেখা শব্দ।” গাজা এখন সেই কাগজের ভেতর আটকে থাকা এক শহর, যেখানে শান্তি মানে শুধু একটা স্বপ্ন, আর বেঁচে থাকা মানে প্রতিদিনের সংগ্রাম।
বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধবিরতির এই অস্থির অবস্থা থেকে যে কোনো সময় আবার বড় সংঘাত শুরু হতে পারে। এখন দেখার যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল ও হামাসের মধ্যে সত্যিই কি শান্তি চায়, না কি এই চুক্তিও ইতিহাসের আরেকটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা হয়ে থাকবে?






