এখনও দেখি ফিরে, খুঁটিপুজো রয়ে গিয়েছে স্মৃতির সেই ভিড়ে

Ishan Bandyopadhyay
৪ মিনিট
এখনও দেখি ফিরে, খুঁটিপুজো রয়ে গিয়েছে স্মৃতির সেই ভিড়ে

আর কিছু থাক বা না থাক, মাঠ ছিল তখন আমাদের। অল্প খানিক ছড়ানো, স্বল্প খানিক বিস্তৃত, সন্ধে নামার মুখে নাম ধরে ডাকতো মা। দুই হাঁটুতে হালের দশ টাকার কয়েনের সাইজের লালচে ক্ষতচিহ্ন লুকিয়ে আরও কিছুক্ষণ চলত সেই বিকেল ভাঙার উজান, ফুটবলে ক্রিকেটে আর খোপ কেটে কেটে গিজো খেলায়– সে খেলা আজ আর জানে না কেউ।

সে মাঠে ডিসেম্বরে ফিস্ট আর বসে আঁকো প্রতিযোগিতা হতো, মার্চে ন্যাড়াপোড়া। আর হতো পুজো– চাঁদা তুলতে গেলেই অবধারিত প্রশান্তকাকু 'সরস্বতী' বানান আর বন্দনার মন্ত্র জিগাবেন, আর ফুটবল সেনাপতি রিন্টু নির্ঘাত কোন 'স' এর নিচে 'ব' সেটা গুলিয়ে ফেলবে, আর 'আমাদের দাবি মানতে হবে' প্রোপাগান্ডা ডিসমিস হয়ে পাওয়া যাবে মোটে পাঁচ টাকা চাঁদা। 'সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে' উচ্চারণের আগেই আমাদের জিভে নিষিদ্ধ কুলের প্রাণজুড়োনো সেই অনির্বচনীয় স্বাদ– পাপ তো লাগবেই এট্টু!

সরস্বতী আমাদের ডিপার্টমেন্ট, কচিকাঁচার মোনোপলি, তবু বাকি সব পুজোতেও আমরা থাকতাম স্বমহিমায়। মহিমা তখন এমনিতেই বাজার কাঁপাচ্ছে, সুভাষ ঘাইয়ের 'পরদেশ' এর অডিও ক্যাসেট-এর দাম প্রিন্টে বিয়াল্লিশ আছে বাবুদার দোকানে, বাবুদা উদাস হয়ে পঁয়ত্রিশ টাকায় দেবে এরকমই ডিল ফাইনাল, কিন্তু সেটাই বা আসে কোথা থেকে! পঁয়ত্রিশ টাকা! চাট্টিখানি কথা নয়! আর্জেন্টিনা গিয়ে মারাদোনার সঙ্গে দেখা করতে হলে প্লেনেই যেতে হবে এইটুকু তো জানি, পঁয়ত্রিশ টাকায় ভাড়া হবে না এক পিঠের?

সেই 'পরদেশ'-এর 'মেরি মেহবুবা' বাজত পুজোয়, বিশ্বকর্মাপুজো আর দুর্গাপুজো দুটোতেই, তবে সে সব পরের কথা, আমাদের পুজো শুরু হতো এসবের অনেকদিন আগে, ঠিক কোনও একটা মেঘলা দুপুরে যখন ডিফেন্স থেকে ছাপান্নদা'র থ্রু-পাসটা বাঁ পায়ে ধরেই নাড়ু কাটিয়ে নিয়েছে ভাইপোকে ঠিক ডেনিস বার্গক্যাম্পের কায়দায়, এইবার গোল নির্ঘাত– তখনই অচানক হল্ট! পুজো কমিটির সত্য কাকারা হঠাৎ মাঠের মাঝখানে, সঙ্গে নাতিদা, এলাকার কিংবদন্তি পুরোহিত ছিলেন নাতিদার দাদু, সেই পরিচয়ে ক্ষুদিরাম নাম ওভারল্যাপ হয়ে 'নাতি' নাম বিখ্যাত, আমাদের মতো নেহাত বালখিল্যরা সে নামের সঙ্গে 'দা' যোগ করে নিয়েছি। ব্যাপার কী, হঠাৎ এই বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো সিরিয়াস ম্যাচের আবহে দর্শকের ইন্টারভেনশন কেন– তা বুঝে ওঠা তৎক্ষণাৎই, সবুজ এক লম্বা বাঁশ তার মাথায় ধ্বজা বাঁধা, সেটা স্থাপন হবে মাঠের ঈশান কোণে! ও হো, খুঁটিপুজো আজ নাকি? মানে তো পুজো এসে গেলো! গোলটা হল না বটে, বদলে যে মনের মাঝে পেলাম আগমনীর পাসপোর্ট, তাতে যাওয়া যাবে গোল মিসের দুঃখ পেরিয়ে আরও বহু বহু দূর।

আর সেই আমাদের শুরু, ঐ খুঁটিটা পোঁতা হলেই ঠিক জানতাম, বকুনির গ্রাফ এখন থেকেই নামতে শুরু করবে, বাড়িতে কাগজ-কাকু দিয়ে যাবে শুকতারা আর আনন্দমেলার সেই মন মাতানো গন্ধওলা পূজাবার্ষিকী সংখ্যা, দূরের আত্মীয়-স্বজনদের থেকে একে একে আসতে শুরু করবে পুজোর জামা, হ্যাঁ এসবের ফাঁকেই ইস্কুলে হাফ-ইয়ার্লি পরীক্ষাটা আছে বটে, কিন্তু সে আর বিশেষ পাত্তা দিতাম না কেউই, রেজাল্ট তো বেরোবে পুজোর পর!

অথচ, এই অবেলায় বড় হয়ে সে সব মায়াময় দিনরাতের আখ্যান স্মৃতির আটলান্টিক থেকে তুলে আনতে গিয়ে জানতে পারি, খুঁটিপুজো বলে কিছু নেই নাকি শাস্ত্রমতে! যা ছিল, তা হল কাঠামোপুজো, দেবীর আরাধনা করে জন্মাষ্টমীর দিন থেকে বিধিমতে শুরু করা হতো মৃন্ময়ী মাতৃপ্রতিমাকে চিন্ময়ী রূপদানের শুভ কাজ। প্যান্ডেল বানানোর ব্যাপারটাই ছিল না তখন, মণ্ডপ অস্থায়ী হতো না এখনকার মতো। সেই যে ১৭৯০ সালে হুগলির গুপ্তিপাড়ায় বারোজন বন্ধু মিলে প্রথম সর্বজনীন দুর্গাপুজো করলেন, যার থেকে নাম হল 'বারোয়ারি'– তার আগে পর্যন্ত বাবুদের দরদালানেই পুজো হতো মায়ের, 'মণ্ডপ নির্মাণের শুভারম্ভ' হিসেবে তিথি-নক্ষত্র মেনে খুঁটি পুঁতে কাজ শুরু করার কোনও লোকাচার ছিলই না আগে। যুগ বদলেছে যুগের নিয়মে, বড় মানুষের বাড়ির পাকা দালান থেকে নেমে এসে মা আরও বেশি করে হয়ে উঠেছেন সক্কলের, এ পাড়ার সঙ্গে ও পাড়ার কম্পিটিশন শুরু হয়েছে কারা ভাল লাইটিং আনল চন্দননগরের, কাদের উদ্বোধনে টলি পাড়ার মাঝারি নায়ক এসে মাইকে বলে গেল আমি এখানকারই ছেলে, আর সে সব দিন থেকেই খুঁটিপুজো হয়ে উঠল সেই শুরুয়াতের অমোঘ মার্কিং– এসে গেল, পুজো এসে গেল আমাদের!

আমরাও সেরকমই ছিলাম। রোদে, বৃষ্টিতে, হিট উইকেটে, সেম সাইডে, পাশের পাড়ার নাম না জানা লাবণ্যময়ী একজোড়া চোখের অপাঙ্গের একবিন্দু তাকানোতে, সামান্য হাতখরচে, লুকিয়ে নেওয়া কাউন্টারে– ওই একটা খুঁটি বড় শক্ত করে বেঁধে রেখেছিল আমাদের। টেনিদার থেকে আমরাও দিব্যি শিখে নিয়েছিলাম কখন যেন অজান্তেই, খুঁটি ইংরেজি পোস্ট, বানানে দু'খানা 'টি', না হলে শক্ত হবে কী করে!

কতটা শক্ত আর অমোঘ ছিল সেই খুঁটি, এই ভাঙনকাল থেকে যখন তাকাই সেই কল্পলোকসম অতীতে, বেশ বুঝতে পারি‌। সবাই যেন বাঁধা, সবাই যেন ভীষণ ভীষণ আপন, জড়িয়ে-জাপটে গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে সবসময়। সবার বাড়িই যেন আমার বাড়ি, সর্বস্বটাই আমাদের– আর দুর্গাপুজোটা একটু বেশি স্পেশাল, ঠিক যেন নিখুঁত মাপে থার্ড-পকেট হওয়া 'রেড'। পকেটে তো যাবেই, কিন্তু একটু আলাদা রেলা সমেত! খুঁটিপুজোর পর থেকে বাঁশের প্যান্ডেল শুরু হলেই, সেই আলাদা রেলাটুকু মনে হরমোনে নিয়ে 'আমরা সবাই রাজা'। যে সে রাজা নয়, অরণ্যাধিপতি টারজান– আর সে শাখামৃগসম কীর্তিকলাপ দেখে পাড়ার বড়দের সমবেত সন্দেহ, আদৌ ডারউইনের এভোলিউশনের তত্ত্ব ঠিক?

আজ সব পেরিয়ে, খুঁটিপুজো হয় আজও সেই মাঠে, আছে সব, তবু যেন নড়বড়ে খানিক। নাড়ু আর আউটসাইডে ডজে মার্কারকে ছিটকে দেয় না অনেকদিন। প্রশান্তকাকু আর ইহজগতে নেই 'সরস্বতী' বানান ঠিক করে দেওয়ার জন্য। পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা মাইনে পাই অনেকে। তাই হয়তো, সেই পঁয়ত্রিশ টাকা আর পকেটে নেই 'পরদেশ' ক্যাসেটটা কেনার মতো।‌

সে খুঁটি, সে খুঁটিপুজো, সে আশ্চর্য সময়, সত্যি সত্যি অন্য দেশের লাগে...

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।