বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?
GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?
বাংলার খাবারের স্বাদ ও ঐতিহ্য এবার পেতে চলেছে নতুন পরিচিতি। দেশি খাসির মাংস, ইলিশ মাছের বিভিন্ন পণ্য এবং চিংড়ি শুঁটকিকে জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) তকমা দেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। সূত্রের খবর, এই পণ্যগুলির জন্য জমা পড়া আবেদন চলতি মাসের প্রথমার্ধে মঞ্জুর হয়েছে। সব ঠিক থাকলে আগামী দিনে বাংলার এই খাবারগুলি জিআই স্বীকৃতি পেতে পারে। কিন্তু জিআই তকমা আসলে কী? কেন দেওয়া হয় এই স্বীকৃতি? আর বাংলার কোন কোন খাবার রয়েছে এই তালিকায়?
বাংলার কোন কোন খাবার জিআই তকমা পেতে চলেছে?
বাংলার তিন ধরনের মাছ-মাংসের পণ্যের জন্য সম্প্রতি জিআই স্বীকৃতির আবেদন করা হয়েছে।
১. ব্ল্যাক বেঙ্গল গোট মিট বা দেশি খাসির মাংস: বাংলার দেশি ছাগল ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের জন্য পরিচিত। এই জাতের ছাগল ও তার মাংসকে কেন্দ্র করে বাংলার নিজস্ব পরিচিতি তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই পণ্যের জিআই স্বীকৃতির জন্য আবেদন করা হয়েছে।
২. ইলিশ মাছের পণ্য: বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতিতে ইলিশের বিশেষ স্থান রয়েছে। ইলিশের বিভিন্ন পণ্যকে জিআই স্বীকৃতির আওতায় আনার জন্য আবেদন জমা পড়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
GI, red ant chutney: ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলায় কাই চাটনি নামে পরিচিত এই খাবারটি। মূলত আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকার খাবার এই চাটনি।
৩. চিংড়ি শুঁটকি: বাংলার উপকূলবর্তী ও মৎস্যনির্ভর এলাকার খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে শুঁটকি মাছের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। চিংড়ি শুঁটকির স্বতন্ত্র পরিচিতিকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্যও আবেদন করা হয়েছে।
জিআই তকমা কী?
জিআই-এর পুরো নাম জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন (Geographical Indication)। বাংলায় একে বলা হয় ভৌগোলিক নির্দেশক বা ভৌগোলিক পরিচয়। কোনও নির্দিষ্ট এলাকার বিশেষ পণ্য, যার গুণমান, বৈশিষ্ট্য, সুনাম বা পরিচিতির সঙ্গে ওই অঞ্চলের ভৌগোলিক পরিবেশ এবং ঐতিহ্যের সম্পর্ক রয়েছে, তাকে জিআই স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
সহজভাবে বললে, কোনও পণ্য একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের নিজস্ব পরিচিতি বহন করলে এবং সেই পরিচিতির পিছনে ওই এলাকার পরিবেশ, উৎপাদন পদ্ধতি কিংবা দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের ভূমিকা থাকলে, সেই পণ্য জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য হতে পারে। যেমন, বাংলার রসগোল্লা, বর্ধমানের সীতাভোগ ও মিহিদানা কিংবা দার্জিলিং চা নির্দিষ্ট অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত বিশেষ পণ্য হিসেবে পরিচিত।
জিআই তকমা কোনও পণ্যের নামের সঙ্গে সেই অঞ্চলের পরিচিতিকে যুক্ত করে। এর ফলে ক্রেতারা পণ্যটির উৎস সম্পর্কে জানতে পারেন। পাশাপাশি, সংশ্লিষ্ট এলাকার উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের পণ্যের স্বতন্ত্র পরিচিতি তুলে ধরতেও এই স্বীকৃতি সাহায্য করে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
করোনা এবং আরও নানা কারণে মুখ থুবড়ে পড়া ছৌ শিল্পে নিঃসন্দেহে বাড়তি অক্সিজেন জোগাবে ‘জিআই ট্যাগ’।
কারা জিআই তকমা পান?
জিআই স্বীকৃতি কোনও ব্যক্তিকে দেওয়া হয় না। বরং নির্দিষ্ট এলাকার কোনও পণ্য এই স্বীকৃতি পায়। কোনও উৎপাদক সংগঠন, ব্যবসায়ীদের সংগঠন, সমবায়, সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদকদের সংগঠন বা আইন অনুযায়ী যোগ্য কোনও প্রতিষ্ঠান সেই পণ্যের জন্য আবেদন করতে পারে।
আবেদনের সময় পণ্যটির উৎপত্তিস্থল, বিশেষ বৈশিষ্ট্য, উৎপাদন পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার সঙ্গে তার সম্পর্কের প্রমাণ দিতে হয়। এরপর নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ আবেদনটি পরীক্ষা করে। সমস্ত শর্ত পূরণ হলে তবেই জিআই স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
কেন দেওয়া হয় জিআই তকমা?
জিআই স্বীকৃতির মূল উদ্দেশ্য হলো কোনও অঞ্চলের বিশেষ পণ্যের স্বতন্ত্র পরিচিতি রক্ষা করা। এর মাধ্যমে স্থানীয় ঐতিহ্য, উৎপাদন পদ্ধতি এবং পণ্যের সুনামকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Food GI Tags of 2022: কাশ্মীরি জাফরান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১,৬০০ মিটার থেকে ১,৮০০ মিটার উচ্চতায় জন্মায়।
এই তকমা পেলে সংশ্লিষ্ট পণ্যের বাজারে পরিচিতি বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। ক্রেতাদের কাছে পণ্যটির উৎস ও বিশেষত্ব তুলে ধরা সহজ হয়। পাশাপাশি, স্থানীয় উৎপাদক, কারিগর ও ব্যবসায়ীরা নিজেদের পণ্যের পরিচিতি কাজে লাগিয়ে ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর সুযোগ পেতে পারেন।
আবেদনের নেপথ্যে কারা?
এই উদ্যোগে দেশের জিআই বিশেষজ্ঞ রজনী কান্তের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তাঁর বক্তব্য, বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশ এবং চিংড়ির মতো পণ্যের জিআই স্বীকৃতির বিষয়টি নিয়ে আগেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে এবার রাজ্য সরকারের শীর্ষ স্তর থেকে সহযোগিতা পাওয়ার পরে আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে।
রজনী কান্ত জানিয়েছেন, ক্ষুদ্রশিল্প দফতরের প্রধান সচিব অনুপ আগরওয়ালের সঙ্গেও এই বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। নাবার্ডের পূর্বাঞ্চলের দফতর এবং রাজ্যের ক্ষুদ্রশিল্প ও বস্ত্র দফতরও এই উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে বলে সূত্রের খবর।
রাজ্যের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী কল্যাণ চক্রবর্তী জানিয়েছেন, দেশি খাসির মাংস ও চিংড়ি শুঁটকির মতো পণ্যের জন্য আবেদন করা হয়েছে। ইলিশের পণ্যের ক্ষেত্রে একটি বেসরকারি সংগঠন আবেদন জমা দিয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
মাছ-মাংসের বাইরেও জিআই স্বীকৃতির উদ্যোগ
বাংলার ঐতিহ্যবাহী পণ্যগুলিকে জিআই স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ শুধু খাবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কুমোরটুলির দুর্গাপ্রতিমার জন্যও আবেদন করা হয়েছে। রজনী কান্তের আশা, আগামী দু'-তিন মাসের মধ্যে এই প্রতিমা জিআই স্বীকৃতি পেতে পারে।
এ ছাড়াও বাংলার পাটশিল্পের পণ্য এবং চালতাবেড়িয়ার টেরাকোটার জন্য আবেদন করা হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, এই আবেদনগুলির কয়েকটি ইতিমধ্যেই মঞ্জুর হয়েছে। মাছ-মাংসের পণ্যগুলির ক্ষেত্রে আগামী এক বছরের মধ্যে জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার আশা করছেন তিনি।






