ষাটের কোঠায় তৃতীয় বিয়ে: আমির খানের জীবন আমাদের যা শেখায়

Aamir Khan Third Marriage: আমির খান আসলে আমাদের ভিতরের সেই দ্বন্দ্বটাকেই সামনে এনে দেন। তাঁর জীবনকে আদর্শ বলার জন্য নয়, কিংবা অন্ধ অনুকরণ করার জন্যেও নয়; বরং তিনি মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য আসেন যে, মানুষের জীবন সরলরেখায় চলে না।

Anwesa Bandyopadhyay
৩ মিনিট
ষাটের কোঠায় তৃতীয় বিয়ে: আমির খানের জীবন আমাদের যা শেখায়

মুখরোচক খাবারের প্রতি যেরকম ভাবে আমাদের মন টানে, ঠিক সেরকম ভাবেই মুখরোচক খবরের প্রতিও আমাদের মন টানে। আর যদি আমাদের কানে আসে প্রেমের খবর! তাহলে তো কথাই নেই। এই একঘেয়ে নাগরিক জীবনে নতুন কোনো রোমাঞ্চও তো আসে না আর মহাসমারোহে। তাই চারদিকের বর্ষার আবহাওয়ায় প্রতিদিনের চেনা নিয়মের ছকে যখন এক চিলতে স্বাদবদল এনে দিয়েছেন অভিনেতা আমির খান, তখন সেই নিয়ে একটু চর্চা তো অস্বাভাবিক নয়।

আমির খান নিজের কাজের মধ্য দিয়ে হোক বা ‘সত্যমেব জয়তে’-র মঞ্চে— সর্বত্রই আমাদের চেপে রাখা, না-বলতে পারা অবদমিত সত্তাকে বরাবরই প্রশ্ন করে এসেছেন, প্রশ্ন করতে শিখিয়ে এসেছেন। চিরকাল নিজের পথেই হেঁটেছেন। ষাটের কোঠায় পৌঁছেও সমাজকে পাল্টে দেওয়ার স্বপ্ন তাঁর ফুরিয়ে যায়নি। ৬১ বছর বয়সে তৃতীয়বারের মতো ঘর বাঁধলেন তিনি।

এমন ঘটনা পৃথিবীতে একেবারেই বিরল নয়। একটু খোঁজ নিলেই বহু সাধারণ মানুষের জীবনেও এমন গল্প দেখা যাবে। কিন্তু তারকাদের ক্ষেত্রে সামাজিক কৌতুহলটা একটু বেশিই থাকে। যাঁরা নিজের মনের কথা শুনে, সামাজিক নিয়মের গণ্ডি পেরিয়ে কোনো সাহসী সিদ্ধান্ত নেন, তাঁদের নিয়ে চর্চা করতে আমাদের ভালো লাগে। কারণ অনেক সময় সেই আলোচনা আমাদের নিজেদের না-পারা এবং না-করে-ওঠা জীবনের উপর এক অদ্ভুত প্রলেপের কাজ করে।

কিন্তু সেই চর্চা যখন কেবল নিয়মভঙ্গের অভিযোগে এসে থমকে যায়, তখন আমাদের মনটাও একটু অস্বস্তিতে পড়ে। একটু গভীরভাবে নিজের মনের দিকে তাকালে বোঝা যায়, এই অস্বস্তি আসলে অন্যের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের কারণে নয়; বরং তা নিজের অপূর্ণ ইচ্ছা, অবদমিত আকাঙ্ক্ষা আর না-হয়ে-ওঠা জীবনের এক গোপন প্রতিফলন।

আমরা খুব সহজেই বলে ফেলি, "সেলিব্রিটি বলেই সম্ভব হয়েছে।" তারপর শুরু হয় চরিত্রের বিচার, নৈতিকতার মাপকাঠি আর সম্পর্কের হিসাব-নিকাশ। অথচ মনোবিজ্ঞানের ভাষায় মানুষের ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ ও জীবনের লক্ষ্য সময়ের সঙ্গে বদলায়। দীর্ঘ বৈবাহিক সম্পর্কে দুই মানুষের মানসিক চাহিদা একসময় ভিন্ন হয়ে যেতেই পারে। সেই পরিবর্তনকে মেনে নেওয়া সহজ নয়, আর তাই সম্পর্ককে সম্মানের সঙ্গে শেষ করাও ভীষণ কঠিন হয়ে পড়ে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হাতে হাত আমির গৌরীর: হাজির প্রাক্তনরাও

Aamir Khan Gauri Spratt marriage: ৬১ বছর বয়সে এসে তিনি যখন তাঁর দীর্ঘদিনের চেনা, কিন্তু মাঝে হারিয়ে যাওয়া বন্ধু গৌরী স্প্র্যাটকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিলেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই চারদিকে নানা চর্চা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন তাঁর বারবার বিয়ে এবং বিচ্ছেদ নিয়ে। আবার কেউ এর মধ্যে এক নতুন জীবনের আলো দেখছেন।

কোনো বিবাহবিচ্ছেদের প্রকৃত কারণ বাইরে থেকে জানা সম্ভব নয়। আমরা যা দেখি, তা কেবল দৃশ্যমান অংশ। অদৃশ্য অংশে থাকে ব্যক্তিগত ইতিহাস, মানসিক বিকাশ, সম্পর্কের গতিবিদ্যা, যোগাযোগের ভাঙন, কাজের চাপ এবং সময়ের অভাব আর থাকে বহু না-বলা অনুভূতি। বিশেষ করে উচ্চচাপের পেশায় ব্যক্তিগত জীবন ও কাজের ভারসাম্য রক্ষা করাও অনেক সময় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে।

আমার কাছে আমির খানের গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর তৃতীয়বার বিয়ে করা নয়। বরং তাঁর দুই প্রাক্তন স্ত্রীর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ, সম্মানজনক এবং সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রাখার সক্ষমতা। আমির খানের ব্যক্তিগত জীবনকে কোনো রোগনির্ণয়ের ছকে না ফেলে, প্রকাশ্যে আসা তথ্যের ভিত্তিতেই কিছু মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেওয়া যায়।

মানুষের ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ ও জীবনের লক্ষ্য সময়ের সঙ্গে বদলে যায়। দীর্ঘ বৈবাহিক সম্পর্কে কখনো কখনো দুই ব্যক্তির মানসিক চাহিদা ভিন্ন হয়ে যেতে পারে, যার ফলে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়।

আমির খান তাঁর দুই বিবাহবিচ্ছেদের পরও প্রাক্তন স্ত্রীদের সঙ্গে সম্মানজনক ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। মনোবিজ্ঞানে একে পরিণত আবেগীয় নিয়ন্ত্রণ এবং ইতিবাচক সহ-অভিভাবকত্বের উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

অত্যন্ত ব্যস্ত পেশাজীবনে দীর্ঘ সময় কাজের চাপ, জনসমক্ষে থাকা এবং ব্যক্তিগত সময়ের অভাব দাম্পত্য সম্পর্কে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এটি শুধুমাত্র আমির খানের ক্ষেত্রেই নয়, যেকোনো উচ্চ-চাপের পেশায় দেখা যায়।

সফল দাম্পত্যের অন্যতম ভিত্তি হলো খোলামেলা যোগাযোগ, পারস্পরিক সম্মান এবং দ্বন্দ্ব সমাধানের দক্ষতা। এগুলির ঘাটতি থাকলে সম্পর্ক দুর্বল হতে পারে।

বিচ্ছেদের পরও তিনি পরিবার, সন্তান এবং কাজের প্রতি দায়িত্বশীল থেকেছেন। এটি মানসিক স্থিতিস্থাপকতার একটি বড় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

ডিফেন্স নিয়েই তো আমাদের জীবন। কজনই বা নিজেকে সত্যরূপে দেখার চেষ্টা করি? আমরা নিজেদের অসংখ্য অবদমিত ইচ্ছাকে প্রতিদিন একরকম গলা টিপে হত্যা করি। অথচ অন্যের হেরে যাওয়ার গল্পে আমরা সহজেই মজার ভাগীদার হয়ে উঠি। গোলটেবিল বৈঠকে অন্যের না-পারাকে বড় করে দেখিয়ে নিজের খামতিগুলিকে ঢেকে রাখাই যেন নিয়ম। বহু বছরের যত্নে গড়ে তোলা বিশ্বাস আর মূল্যবোধকে রক্ষা করার জন্য আমরা প্রায়ই প্রতিরক্ষামূলক হয়ে উঠি। কারণ সেগুলিতে আঘাত লাগলে নিজের ভিতরের দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

আমির খান আসলে আমাদের ভিতরের সেই দ্বন্দ্বটাকেই সামনে এনে দেন। তাঁর জীবনকে আদর্শ বলার জন্য নয়, কিংবা অন্ধ অনুকরণ করার জন্যেও নয়; বরং তিনি মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য আসেন যে, মানুষের জীবন সরলরেখায় চলে না। সম্পর্ক বদলায়, মানুষ বদলায়, ভালবাসার ভাষাও বদলে যায়। আর সেই পরিবর্তনের মধ্যেও দায়িত্ব, সম্মান, সংলাপ ও মানবিকতা ধরে রাখা সম্ভব—যদি আমরা তা বেছে নিতে পারি।

একথা ঠিক, কয়েক দিনের মধ্যেই এই আলোচনা নতুন কোনো মুখরোচক খবরে চাপা পড়ে যাবে। তবু এমন কিছু ঘটনা আমাদের কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও থামিয়ে দেয়, নিজের মনের দিকে তাকাতে বাধ্য করে। হয়তো সেই আত্মদর্শনের মুহূর্তটুকুই এই খবরের সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

অথর ইজ ডেড, যে লেখে সে আমি নয় এআই?

Caine Prize winning story AI allegations: ১১ অক্টোবর লেখক ও সাংবাদিক ভোহিনি ভারা ‘দ্য আটলান্টিক’-এ একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন—যার শিরোনাম ছিল “Yet Another Literary Prizewinner Seems to Be AI”। সেখানে তিনি জানান, ‘পাংগ্রাম’ নামের একটি এআই-ডিটেকশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে গল্পটি পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে এটি প্রায় পুরোটাই কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত।

জমিদারগিন্নির অপমানের জবাব দিতেই শুরু পাঞ্জা বাড়ির দুর্গাপুজো

Panja family Durga Puja: এক বর্ষামুখর দুর্গাষ্টমীর দিনে জমিদারবাড়ির মহিলারা, জমিদারগিন্নির সঙ্গে, বাড় সিউড়ির দুর্গাপ্রতিমা দর্শনে যান। ফেরার পথে কর্দমাক্ত রাস্তা পেরোনোর সময় দামি শাড়ি কাদা থেকে বাঁচাতে তাঁরা শাড়ির পাড় কিছুটা তুলে হাঁটছিলেন। কথিত আছে, তা দেখে পাড়ার কয়েকজন কটূক্তি করে বলেন— “পাঞ্জা বাড়ির বউ কাপড় উঠিয়ে চলছে!”

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।