হাতে হাত আমির গৌরীর: হাজির প্রাক্তনরাও
Aamir Khan Gauri Spratt marriage: ৬১ বছর বয়সে এসে তিনি যখন তাঁর দীর্ঘদিনের চেনা, কিন্তু মাঝে হারিয়ে যাওয়া বন্ধু গৌরী স্প্র্যাটকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিলেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই চারদিকে নানা চর্চা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন তাঁর বারবার বিয়ে এবং বিচ্ছেদ নিয়ে। আবার কেউ এর মধ্যে এক নতুন জীবনের আলো দেখছেন।
মানুষের জীবন এক অদ্ভুত নদীর মতো। কখন কোন বাঁকে কার সঙ্গে দেখা হবে, তা আগে থেকে বলা মুশকিল। বলিউডের ‘মিস্টার পারফেকশনিস্ট’ আমির খানের জীবনের গল্পটাও ঠিক এইরকম। ৬১ বছর বয়সে এসে তিনি যখন তাঁর দীর্ঘদিনের চেনা, কিন্তু মাঝে হারিয়ে যাওয়া বন্ধু গৌরী স্প্র্যাটকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিলেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই চারদিকে নানা চর্চা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন তাঁর বারবার বিয়ে এবং বিচ্ছেদ নিয়ে। আবার কেউ এর মধ্যে এক নতুন জীবনের আলো দেখছেন।
কিন্তু এই সব আলোচনার গভীরে লুকিয়ে আছে আমির খানের এক নিজস্ব জীবনদর্শন। এক সম্পর্ক থেকে অন্য সম্পর্কে যাওয়ার এই যাত্রাটা কেবলই 'বারবার বিয়ে করা' নয়, এর পিছনে রয়েছে আত্মোপলব্ধি, সততা এবং মানসিক শান্তির এক গভীর খোঁজ।
২৫ বছর পর, এক ভুলবশত দেখার পর নতুন শুরু
আমির খান এবং গৌরীর গল্পটা কোনো সিনেমাটিক ড্রামা নয়, বরং সময়ের সঙ্গে পরিপক্ব হওয়া এক বাস্তব প্রেম। আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগে, ২০০০-এর দশকের শুরুতে বেঙ্গালুরুতে তাঁদের প্রথম দেখা। তখন তাঁরা স্রেফ পরিচিত ছিলেন। এরপর জীবন দুজনকে দুটি আলাদা পথে নিয়ে যায়। কেটে যায় দীর্ঘ দুই দশক।
হঠাৎই ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে এক পারিবারিক সূত্রের মাধ্যমে আবার তাঁদের যোগাযোগ হয়। আমির খান এক পডকাস্টে এই পুনর্মিলন সম্পর্কে বলেছেন:
"গৌরীর আর আমার হঠাৎ করেই ভুলবশত(mistake-এ) দেখা হয়েছিল। তারপর আমরা কানেক্ট করলাম, বন্ধুত্ব হলো, তারপর ভালবাসা এল।"
এই বন্ধুত্ব ও প্রেমকে তাঁরা দীর্ঘদিন আড়ালেই রেখেছিলেন। ২০২৫ সালের মার্চে আমিরের ৬০তম জন্মদিনে প্রথমবার গৌরীকে সবার সামনে আনেন তিনি। আর অবশেষে, ২০২৬ সালের ৫ জুলাই মুম্বইয়ের বান্দ্রায় খুব ঘরোয়া অনুষ্ঠানে আইনিভাবে সই করে নতুন জীবন শুরু করলেন তাঁরা।
থেরাপি, আত্মপ্রেম এবং সম্পর্কের এক 'বেটার ভার্সন'
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Manav Kaul: একটা 'সিআইডি' (CID) সিরিয়ালের এপিসোডে অভিনয় করে যে টাকা পেতেন, তা দিয়ে তিন মাস টেনেটুনে চালাতে হতো। পেট চালাতে বিস্কুট বিক্রি করা, ঘুড়ি ওড়ানো, ব্রেকড্যান্স শেখানোর কাজও করেছেন তিনি।
আমাদের সমাজে বয়স বাড়লে মানুষ ধরে নেয় জীবনের প্রেম-ভালবাসা-বিয়ের সব চ্যাপ্টার বুঝি শেষ। আমিরও একটা সময় তেমনটাই ভেবেছিলেন। ৫৮-৫৯ বছর বয়সে তাঁর মনে হয়েছিল, এই বয়সে নতুন করে আর কাকে পাবেন তিনি? কিন্তু গৌরীকে জীবনে জড়ানোর আগে আমির এক কঠিন মানসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। তিনি টানা চার বছর থেরাপি করিয়েছেন।
আমিরের কথায়, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে নিজে ভিতর থেকে সুস্থ না হলে অন্য কাউকে সুখী করা যায় না। থেরাপির মাধ্যমে তিনি প্রথমে নিজেকে ভালবাসতে শেখেন, নিজের ভুলগুলি বুঝতে পারেন। আর সেই কারণেই গৌরী যখন তাঁর জীবনে এলেন, তখন তিনি আমিরের জীবনের সবচেয়ে পরিপক্ব এবং শান্ত রূপটি দেখতে পেয়েছিলেন।
বিয়েতে ব্যর্থ, কিন্তু ডিভোর্সে সফল
আমির খানের সম্পর্কগুলির সবচেয়ে বড় এবং ইতিবাচক দিক হলো প্রাক্তনদের প্রতি তাঁর সম্মান। রীনা দত্ত এবং কিরণ রাও— এই দুই প্রাক্তন স্ত্রীর সঙ্গেই আমিরের ডিভোর্স হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়নি। আমির নিজেই গর্ব করে বলেন যে তিনি হয়তো স্বামী হিসেবে ব্যর্থ হয়েছেন, কিন্তু ডিভোর্সের পর বন্ধুত্ব বজায় রাখতে সফল।
আজও রীনা এবং কিরণ আমিরের পরিবারের অংশ। তাঁরা একসঙ্গে কাজ করেন, সন্তানদের বড় করেন, এমনকী আমিরের এই তৃতীয় বিয়েতেও তাঁরা হাসিমুখে পাশে ছিলেন। আমিরের মতে, স্বামী-স্ত্রীর আইনি সম্পর্ক ভেঙে যেতেই পারে, কিন্তু দুজন মানুষের মধ্যকার সম্মান ও বন্ধুত্ব কখনো ফুরিয়ে যায় না। বহু ক্ষেত্রেই আমরা দেখতে পাই, সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়া মানেই প্রাক্তনের নামে অকথা-কুকথা রটানো। আমরা বলিউডেই এরকম অনেক উদাহরণ দেখতে পাই। কিন্তু আমিরের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই অসততা বা কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি না করে সম্মানের সঙ্গে আলাদা হওয়ার ঘটনা। তাঁর মতে, একে অপরের পাশে থাকাটাই তাঁর জীবনের অন্যতম বড় শিক্ষা।
আমিরের এই জীবনদর্শন নিয়ে সমাজে দু'রকম মত রয়েছে।
আমাদের চিরাচরিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে বিয়েকে মনে করা হয় ‘চিরকালের বন্ধন’। তাই তিনবার বিয়ে করাকে অনেকেই Commitment Phobia বা সম্পর্কে একধরনের অস্থিরতা হিসেবে দেখেন। সমালোচকদের মতে, বারবার সম্পর্ক বদলানো কি শুধুই মানসিক শান্তি, নাকি নতুনত্বের প্রতি আকর্ষণ— সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। তবে, আমিরের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, তিনি তিনবার বিয়ে করলেও তাঁর বিরুদ্ধে বহুগামিতার অভিযোগ আনা যায় না। তিনি কাউকে ঠকাননি।
আধুনিক দুনিয়ায় দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের নিজস্ব সুখ ও মানসিক শান্তি খোঁজার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। যদি একটি সম্পর্কে দমবন্ধ লাগে, তবে লোকদেখানো অভিনয় করে সারাজীবন অসুখী থাকার চেয়ে সততার সঙ্গে সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসাটাই শ্রেয়। এবং আমির ঠিক এই কাজটিই করেছেন। তিনি প্রতিবারই সম্মতির ভিত্তিতে, আইনি পথে এবং অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
আমির খানের এই ব্যক্তিগত জীবনের সিদ্ধান্ত নিয়ে যখন চারদিকে তুমুল চর্চা, তখন বিষয়টিকে অত্যন্ত ইতিবাচক ও আধুনিক মনস্তত্ত্বের দিক থেকে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এই বিষয়ে বিশিষ্ট মনোবিদ অন্বেষা বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেন, এটি অত্যন্ত ইঙ্গিতপূর্ণ এবং একটি সাহসী সিদ্ধান্ত। তাঁর মতে:
"বয়সের প্রান্তে পৌঁছে মানুষ অনেক বেশি করে একা হয়ে যায়। আমাদের সমাজে কিছু খুবই খারাপ নিয়ম আছে যে, এই বয়সে এটাই হবে বা আমাদের এইভাবেই চলতে হবে। সেইসব নিয়ম থেকে বেরোনো খুব দরকার, আর তার জন্য আমিরের এই পদক্ষেপটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।"
তিনি আরও বলেন, মানুষের সঙ্গে আইনি সম্পর্ক শেষ হতেই পারে, কিন্তু তার কারণে মানুষটার সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। আমির যেভাবে তাঁর প্রাক্তন স্ত্রীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছেন, তা যথেষ্ট এগিয়ে থাকা এক ভাবনাচিন্তার পরিচয় দেয়। মনোবিদের মতে, এখনকার 'জেন-জি' (Gen Z) বা আজকের তরুণ প্রজন্ম যেভাবে সম্পর্ককে দেখে, তারা আমিরের এই সিদ্ধান্তে দারুণভাবে উৎসাহিত হবে। কারণ, আমাদের সমাজে এখনও বহু মানুষ কেবল লোকলজ্জার ভয়ে বা সমাজের নিয়মের বাইরে বেরোতে ভয় পেয়ে নিঃসঙ্গ জীবন কাটান, কোনো নতুন পদক্ষেপ করতে পারেন না।
মনোবিদ অন্বেষা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায়:
"খুব হেলদি (স্বাস্থ্যকর) একটি পদক্ষেপ আমির খান নিয়েছেন। তিনি তো বরাবরই তাঁর কাজ, তাঁর শিল্প বা 'সত্যমেব জয়তে'-র মতো শো-এর মধ্য দিয়ে সমাজের একটা অন্য দিক তুলে ধরেছেন। তাঁর এই ব্যক্তিগত জীবনের সিদ্ধান্তটিও যথেষ্ট স্বাস্থ্যকর। আমাদের হয়তো অনেক সময় হিংসা হতে পারে, কারণ আমরা নিজেরা সমাজের ওই চেনা ছকের বাইরে বেরোতে আসলে ভয় পাই।"
জীবন পরিবর্তনশীল। মানুষ বদলায়, মানুষের চিন্তাভাবনা বদলায়। আমির খানের এই নতুন অধ্যায় আমাদের শেখায় যে, জীবনের যেকোনো পর্যায়ে গিয়ে নতুন করে সুখের খোঁজ করা যায়। বয়স কেবলই একটা সংখ্যা মাত্র। গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের সঙ্গে এবং নিজের সঙ্গীর সঙ্গে সৎ থাকা।
সম্পর্কের ভাঙা-গড়া নিয়ে বিতর্ক থাকবেই, কিন্তু নিজের ভুলগুলি শুধরে নিয়ে, প্রাক্তনকে সম্মান জানিয়ে, ৬০ বছর পেরিয়েও নতুন করে ভালো থাকার এই সাহস— সত্যিই এক অন্যরকম দর্শনের জন্ম দেয়।







