প্রতি চার প্রার্থীর এক জনের নামে মামলা, কী বলছে রিপোর্ট?

West Bengal Election 2026: বাংলার ভোটে প্রতি চার জন প্রার্থীর এক জনের নামে ফৌজদারি মামলা, বহু জনের বিরুদ্ধে খুন-নারী নির্যাতনের অভিযোগ—তবু তাঁরাই রাজনৈতিক দলগুলির ভরসা। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিতর্কিত মুখ কারা?

inscript
৩ মিনিট
প্রতি চার প্রার্থীর এক জনের নামে মামলা, কী বলছে রিপোর্ট?

অপরাধের অভিযোগ, খুনের মামলা, মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের মতো গুরুতর অভিযোগ—সব জেনেও রাজনৈতিক দলগুলি এমন প্রার্থীদেরই ভোটের ময়দানে নামাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের মাঝপথে প্রকাশিত অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস (ADR) এবং পশ্চিমবঙ্গ ইলেকশন ওয়াচের রিপোর্ট বাংলার ভোট-রাজনীতির এক অস্বস্তিকর ছবি সামনে আনল। রিপোর্ট বলছে, এ বারের নির্বাচনে লড়াই করা মোট প্রার্থীদের প্রায় ২৩ শতাংশ নিজেদের হলফনামায় ফৌজদারি মামলার কথা স্বীকার করেছেন। আরও উদ্বেগের বিষয়, ২০ শতাংশ প্রার্থীর বিরুদ্ধে রয়েছে গুরুতর অপরাধমূলক মামলা। অর্থাৎ প্রতি চার জন প্রার্থীর মধ্যে প্রায় একজনের নামে কোনো না কোনো অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।

এই সমীক্ষা করা হয়েছে ২,৯২৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ২,৯২০ জনের হলফনামা খতিয়ে দেখে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ৬৮৩ জন প্রার্থীর নামে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৫৮৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের ধরন এমন, যা সাধারণ রাজনৈতিক বিক্ষোভ বা রুটিন প্রশাসনিক সংঘর্ষের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। গুরুতর অপরাধের তালিকায় রয়েছে খুন, খুনের চেষ্টা, অপহরণ, মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধ, ধর্ষণ, দুর্নীতি, নন-বেলেবল অপরাধ এবং পাঁচ বছর বা তার বেশি সাজাযোগ্য মামলা। অর্থাৎ যাঁরা আগামী দিনে আইন প্রণেতা হতে চান, তাঁদের এক বড় অংশ নিজেরাই আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে।

প্রথম দফায় ১,৪৭৫ জন প্রার্থীর মধ্যে ৩৪৫ জনের নামে অপরাধমূলক মামলা ছিল। দ্বিতীয় দফায় ১,৪৪৫ জনের মধ্যে সেই সংখ্যা ৩৩৮। দুই দফাতেই শতাংশের হিসাবে প্রায় একই, ২৩ শতাংশ। গুরুতর মামলার ক্ষেত্রেও ছবিটা একই রকম, ২০ শতাংশের আশেপাশে। অর্থাৎ এটি কোনো বিচ্ছিন্ন অঞ্চলভিত্তিক প্রবণতা নয়, গোটা রাজ্যের নির্বাচনী কাঠামোর মধ্যেই অপরাধী প্রার্থীদের উপস্থিতি দৃশ্যমান।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য হলো, কোনো দল কতটা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ প্রার্থী দিয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী বিজেপির প্রার্থীদের মধ্যেই অপরাধমূলক মামলার হার সর্বাধিক। ২৯৩ জন বিজেপি প্রার্থীর মধ্যে ২০৮ জন, অর্থাৎ ৭১ শতাংশের নামে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। গুরুতর মামলাও রয়েছে ১৮৮ জনের বিরুদ্ধে। তৃণমূল কংগ্রেসের ২৯০ জন প্রার্থীর মধ্যে ১১২ জন বা ৩৯ শতাংশের নামে অপরাধমূলক মামলা। সিপিএমের ক্ষেত্রে এই হার ৪৭ শতাংশ এবং কংগ্রেসে ২৬ শতাংশ। সংখ্যার তারতম্য থাকলেও বড় চারটি রাজনৈতিক শক্তির কেউই এই প্রশ্নে নির্দোষ নয়। ফলে স্পষ্ট, ‘জিততে পারে’—এই একমাত্র মানদণ্ডেই প্রার্থী বাছাই হয়েছে, তাঁর সামাজিক ভাবমূর্তি বা আইনি পরিচ্ছন্নতা এখানে দ্বিতীয় সারিতে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভোট দিতে পারলেন না মিরজাফরের বংশধরেরা

Nawab family vote denied: সব নথি জমা দেওয়ার পরও মুর্শিদাবাদের নবাব পরিবারের দেড়শোরও বেশি সদস্যের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। প্রশাসনিক গাফিলতি, না অন্য কোনো কারণ? ‘ছোটে নবাব’-সহ এত মানুষ ভোট দিতে পারলেন না কেন?

এই প্রবণতা আরও ভয়ের হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, ১৯২ জন প্রার্থী নিজেদের হলফনামায় মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংক্রান্ত মামলার কথা উল্লেখ করেছেন। এঁদের মধ্যে ৮ জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগও রয়েছে। ৩৫ জনের বিরুদ্ধে খুনের মামলা এবং ১৮৫ জনের বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টার মামলা রয়েছে। ভোটের সময় দলগুলি যখন নারী সুরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা, উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়ের কথা বলে, তখন সেই দলগুলিরই টিকিটে এমন প্রার্থীদের উপস্থিতি রাজনৈতিক নৈতিকতার গভীর সংকটকে সামনে আনে।

অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করেছে—‘রেড অ্যালার্ট’ কেন্দ্র। যেসব বিধানসভা কেন্দ্রে তিন বা তার বেশি প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে, সেই কেন্দ্রগুলিকে রেড অ্যালার্ট বলা হয়। পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি আসনের মধ্যে ১২৯টি আসন এই তালিকায় পড়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৪৪ শতাংশ কেন্দ্রে ভোটারদের সামনে একাধিক বিতর্কিত প্রার্থী।

তবে প্রশ্ন উঠতেই পারে, এত অপরাধের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও দলগুলি কেন এমন প্রার্থী দেয়? কারণটা নতুন নয়। আসলে যে ব্যক্তি এলাকায় ‘কাজ করিয়ে দিতে পারে’, কর্মী সামলাতে পারে, বিরোধীদের চাপে রাখতে পারে, কিংবা বিপুল টাকা ঢালতে পারে—দল তাঁর অতীত নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামায় না। রাজনীতির এই হিসাবেই অপরাধী ভাবমূর্তির লোকেরা বারবার বৈধতা পেয়ে যায়।

সোশ্যাল মিডিয়া এবং জনপরিসরে এই রিপোর্ট ঘিরে ইতোমধ্যেই তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, সাধারণ মানুষ যদি একটি চাকরির জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়া সুযোগ না পান, তবে আইনসভায় যাওয়ার ক্ষেত্রে এত বড় ছাড় কেন? আবার কেউ কেউ বলছেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে অনেক মামলাই হয়, তাই সব সংখ্যাকে এক চোখে দেখা উচিত নয়। এই যুক্তির ভিত্তি কিছুটা থাকলেও সমস্যা হলো খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, দুর্নীতির মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্তদের ক্ষেত্রেও একই রাজনৈতিক প্রশ্রয় দেখা যাচ্ছে। ফলে ‘সব মামলা রাজনৈতিক’ বলে দায় এড়ানো কঠিন।

বাংলার ভোটে টাকার প্রভাব কতটা, সেই ছবিটিও স্পষ্ট করে দেয় এই রিপোর্ট। এবারের নির্বাচনে ৬২৯ জন প্রার্থী কোটিপতি। বড় দলগুলির মধ্যে তৃণমূলের ৭২ শতাংশ প্রার্থী কোটিপতি, বিজেপির ৪৯ শতাংশ, কংগ্রেসের ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ রাজনীতিতে পরিচ্ছন্ন, মধ্যবিত্ত, সাধারণ পেশাজীবী মানুষের প্রবেশ যেন ক্রমশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

এ কথা বলতেই হয়, পশ্চিমবঙ্গে বিপুল হারে ভোট পড়ছে ঠিকই। কিন্তু মনে রাখতে হবে, প্রার্থীদের বড় অংশই আইনের দৃষ্টিতে প্রশ্নবিদ্ধ।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।

কেন মিডটার্ম নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

US Midterm Elections 2026: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা। কেন ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা

US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।

রামলীলার পর কী? কী করবেন বিরোধীরা?

INDIA bloc Unity Under strain: ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ২১ দল একজোট হলেও মঞ্চ শেষেই ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট। বাম নেতাদের বক্তৃতায় প্রাধান্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় ভূমিকা’র সতর্কবার্তা। প্রিয়াঙ্কা, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত বক্তৃতার সুযোগ না পাওয়ায় শরিক-অসন্তোষ।

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?

US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।

রামলীলার সভার জন্য ক্ষতি হয়েছে ছোট দোকানদারদের, কতটা প্রচার, কতটা সত্যি?

loss claim for Ramlila rally: রামলীলা ময়দানের সমাবেশ ঘিরে ছোট দোকানদারদের ‘২.৫ লক্ষ দোকান বন্ধ’ ও ‘১০-১১ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি’র দাবি আসলে, দিল্লির ব্যবসায়ী সংগঠন সিটিআই-এর অনুমান আসলে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের হিসাবের ভিত্তিতে করা হয়েছে। বিজেপি-কংগ্রেস পাল্টাপাল্টি অভিযোগে এই সংখ্যাগুলি এখন রাজনৈতিক হাতিয়ার।