কেন এই লজ্জার হার আর্জেন্টিনার?
Argentina World Cup Final: বিশ্বকাপ ফাইনালে কেন হারল আর্জেন্টিনা? কেন ছন্দে দেখা গেল না লিওনেল মেসিকে? লাউতারো মার্টিনেজের অনুপস্থিতি কতটা প্রভাব ফেলল? শেষ তিন ম্যাচের আগ্রাসী ফুটবল ফাইনালে কোথায় হারিয়ে গেল? শিরোপার লড়াইয়ে ঠিক কোন ভুলগুলির খেসারত দিতে হলো স্কালোনির দলকে?
বিশ্বকাপের শেষ বাঁশি বাজতেই যেন স্তব্ধ হয়ে গেল আর্জেন্টিনা। টানা তিন ম্যাচে যে দলকে দেখা গিয়েছিল আগ্রাসী, ক্ষুধার্ত এবং আত্মবিশ্বাসে ভরপুর, সেই দলটিকেই ফাইনালে যেন চিনতেই পারলেন না সমর্থকেরা। মাঠে ছিল না সেই ছন্দ, ছিল না প্রতিপক্ষকে চেপে ধরার তীব্রতা। শেষ পর্যন্ত হতাশাজনক পরাজয়ের মধ্য দিয়েই শেষ হলো আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ অভিযান।
ফাইনালে শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, আর্জেন্টিনা নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারছে না। মাঝমাঠে বল ধরে রাখা কিংবা উইং ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের প্রতিরোধ ভাঙার যে পরিকল্পনা আগের তিন ম্যাচে সফল হয়েছিল, তার কোনোটিই এদিন কাজে আসেনি। প্রতিপক্ষ প্রথম থেকেই আর্জেন্টিনার মূল খেলোয়াড়দের ঘিরে ধরে খেলার গতি কমিয়ে দেয়। ফলে ম্যাচ যত এগিয়েছে, ততই ছন্দ হারিয়েছে লিওনেল স্কালোনির দল।
বিশেষ করে লিওনেল মেসির পারফরম্যান্স সমর্থকদের হতাশ করেছে। গোটা টুর্নামেন্টে তিনি মুহূর্ত তৈরি করেছেন, প্রয়োজনে ম্যাচের গতি বদলেছেন, সতীর্থদের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন। কিন্তু ফাইনালে সেই মেসিকে দেখা যায়নি। তিনি বল পেয়েছেন কম, পেলেও প্রতিপক্ষের একাধিক ফুটবলারের চাপে দ্রুত বল ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। ড্রিবল, থ্রু পাস কিংবা দূর থেকে শট নেওয়া—কোনো কিছুতেই স্বাভাবিক ছন্দে দেখা যায়নি তাঁকে। ম্যাচের শেষ দিকে ক্যামেরায় ধরা পড়ে এক হতাশ, ক্লান্ত এবং কিছুটা অবিশ্বাসে ডুবে থাকা মেসির মুখ। মনে হচ্ছিল, তিনিও যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না যে ম্যাচটি এভাবে হাতছাড়া হয়ে গেল।
আর্জেন্টিনার আক্রমণ এ দিন শুরু থেকেই ছিল নড়বড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তার প্রধান কারণ লাউতারো মার্তিনেজের অনুপস্থিতি। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তাঁর করা গোলটি আর্জেন্টিনার ফাইনালে ওঠার অন্যতম বড় কারণ ছিল। শুধু গোল নয়, সামনে বল ধরে রাখা, প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ব্যস্ত রাখা এবং সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করার কাজটাও তিনি অসাধারণভাবে করেছিলেন। ফাইনালে সেই উপস্থিতির অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিকল্প ফরোয়ার্ডরা চেষ্টা করলেও মার্টিনেজের মতো প্রভাব ফেলতে পারেননি। ফলে মেসিও অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Football and Politics: প্যালেস্টাইনে নিহত ফুটবলারের সংখ্যা ৫৬৭ ছাড়িয়েছে। তবু বিশ্ব ফুটবল নিয়ামক সংস্থার তরফে নূন্যতম বিবৃতিটুকু আসেনি। তারা ফুটবলকে 'কলুষিত' করতে চায় না। কিন্তু ফুটবল পক্ষ নেয়! অবিরত পক্ষ নেয় মানবতার। তার দায় আছে সবুজকে কলুষিত না হতে দেওয়ার। তার দায় আছে ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার। প্রবল ক্ষমতার বিপক্ষে দাঁড়ানোর।
মাঝমাঠেও দেখা যায় একই সমস্যা। মাঠের মধ্যে ৬৫% সময় বল ছিল স্পেনের দখলে। ৭৬২ টি নিখুঁত পাস খেলেছে স্পেন। ফলে যে সমন্বয় দেখা গিয়েছে, স্পেনের খেলায় তার সামনে দাঁড়াতেই পারেনি আর্জেন্টিনা। যে দলটি কয়েক দিন আগেও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ছোট ছোট পাসে প্রতিপক্ষের বাধা ভেঙে এগিয়ে যাচ্ছিল, সেই দলই এদিন ছোট পাস ছেড়ে দূরে পাস খেলতে বাধ্য হয়। কিন্তু তাতেও সাফল্য আসেনি।
ম্যাচের একটি বড় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনার শৃঙ্খলার অভাব। ম্যাচ যত উত্তেজনাপূর্ণ হয়েছে, ততই বেড়েছে ফাউল, তর্ক এবং ধাক্কাধাক্কি। শেষ দিকে লিয়ান্দ্রো পারেদেস লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। তাঁর এই বহিষ্কার ম্যাচের শেষ মুহূর্তে আর্জেন্টিনার সম্ভাবনাকে আরও কঠিন করে তোলে। ১০ জনে এই স্পেনের বিরুদ্ধে খেলা ছিল কার্যত অসম্ভব। পারেদেসের এই আচরণ নিয়ে ম্যাচ শেষে সমালোচনাও শুরু হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারাই দলের ক্ষতির অন্যতম কারণ। আর্জেন্টিনা স্নায়ুর চাপ ধরে রাখতে পারেনি।
পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনার ফুটবলে সেই খিদেটাই খুঁজে পাওয়া যায়নি, যা শেষ তিন ম্যাচে ছিল দলের সবচেয়ে বড় শক্তি। আগের ম্যাচগুলিতে প্রতিটি বলের জন্য লড়াই, বল হারালেই তা ফেরত পাওয়ার চেষ্টা এবং প্রতিপক্ষকেও এক মুহূর্ত স্বস্তিতে খেলতে দেয়নি তারা। ফাইনালে সেই জায়গায় যেন ক্লান্তি এবং দ্বিধা কাজ করেছে। অনেক বলেই দ্বিতীয়বার চ্যালেঞ্জ করতে দেখা যায়নি ফুটবলারদের। প্রতিপক্ষ বরং আরও সংগঠিত, আরও পরিকল্পিত ফুটবল খেলেছে।
ডিফেন্সও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। চাপের মুহূর্তে ভুল পজিশন নেওয়া, বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি নেওয়া এবং সেট-পিস সামলাতে দুর্বলতা—সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনা নিজেদের শক্ত জায়গাতেই পিছিয়ে পড়ে। মনে রাখতে হবে, গোলে একটিও শট নিতে পারেনি আর্জেন্টিনা। তিন কাঠির ভেতরে ঢুকতেই পারেননি লিওনেল মেসি।
আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেস একসময় যেন মনে হচ্ছিল একাই লড়ছেন। মার্তিনেস না থাকলে এই খেলার ফলাফল হতো ভিন্ন। নীল সাদা দলের হয়ে অন্তত ১০টি গোল বাঁচান এমিলিয়ানো মার্তিনেস। ভাঙা হাতে তাঁর অপ্রতিরোধ্য লড়াই আর্জেন্টিনার দর্শকদের মনে থেকে যাবে।
সংযত কারণেই লিওনেল স্কালোনির কৌশল নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ম্যাচের পরিস্থিতি বদলানোর জন্য তিনি একাধিক পরিবর্তন আনলেও সেগুলির প্রভাব খুব বেশি দেখা যায়নি। বরং অনেকের মতে, মার্টিনেজের অনুপস্থিতিতে আক্রমণের পরিকল্পনা নতুনভাবে সাজানো উচিত ছিল। মেসির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এদিন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁকে আটকে দিতে পারলেই আর্জেন্টিনার আক্রমণের ধার অনেকটাই কমে যাচ্ছিল।
তবু মেসির দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি বিশ্ব ফুটবলকে অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন। কিন্তু এই ফাইনালে তিনি ছিলেন নিজের ছায়ামাত্র। সমর্থকদের কাছে এই হার নিঃসন্দেহে কষ্টের। কারণ শেষ তিন ম্যাচের পারফরম্যান্স তাঁদের বিশ্বাস করিয়েছিল, ট্রফি হয়তো আবারও বুয়েনস আইরেসে ফিরবে। কিন্তু ক্ষুধা হারানো, নিস্প্রভ মেসি, মার্টিনেজের অনুপস্থিতি এবং শৃঙ্খলার অভাব মিলিয়েই শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ভেঙে যায় আলবিসেলেস্তেদের।






