বাদল সরকারের ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’: নাগরিক একাকিত্বের নাট্য-জ্যামিতি
‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটকটি ছিল বাদল সরকারের এক পরীক্ষাগার। এখানে তিনি প্রথাগত মঞ্চের কাঠামোকে ভেঙে চুরমার করেননি ঠিকই, কিন্তু তার ভিতর থেকে প্রাণভোমরাটিকে বের করে এনেছিলেন। সাজসজ্জার বাহুল্য বর্জন করে মানুষের নগ্ন অস্তিত্বকে মঞ্চে দাঁড় করানোর যে সৎ সাহস তিনি এখানে দেখিয়েছিলেন, তাই পরবর্তীকালে মহীরুহ হয়ে ‘থার্ড থিয়েটার’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। মঞ্চের এই মুক্তি আসলে নাট্যকার এবং অভিনেতা—উভয়েরই আত্মার মুক্তি।
বাংলা নাট্যসাহিত্যের বাঁক বদলের ইতিহাসে বাদল সরকারের ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ (১৯৬৩) একটি একক স্তম্ভ। সাধারণত এই নাটকটিকে সার্ত্রে বা কামুর অস্তিত্ববাদের (Existentialism) ভারতীয় সংস্করণ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, নাটকটি কেবল অমল-বিমল-কমলদের একঘেয়েমি বা ইন্দ্রজিতের ব্যর্থতার গল্প নয়; বরং এটি আধুনিক নাগরিক জীবনের এক জ্যামিতিক বৃত্তায়ন। যেখানে সময় একটি সরলরেখা নয়, বরং একটি ঘূর্ণি যা ব্যক্তিকে বারবার তার আদি বিন্দুতে আছড়ে ফেলে।
এই নাটকের গঠনতন্ত্র নিয়ে আলোচনা করার সময় প্রথমেই মনে রাখা প্রয়োজন যে, বাদল সরকার শুধু একজন নাট্যকার ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সুদক্ষ নগর পরিকল্পনাবিদ বা টাউন প্ল্যানার। একজন নগর পরিকল্পনাবিদ যেভাবে একটি শহরকে গ্রিড, বৃত্ত, সরলরেখা এবং ত্রিভুজে বিভক্ত করে দেখেন, বাদল সরকারও এই নাটকের কাঠামোকে এক জ্যামিতিক শৃঙ্খলায় বেঁধেছেন। এই আঁটোসাঁটো জ্যামিতিক কাঠামোর ভিতরেই তিনি স্থাপন করেছেন এক অসীম ‘শূন্যতা’ বা ‘Void’। জ্যামিতিক বিন্দু থেকে বৃত্তের আবর্তনে নাগরিক জীবনের শূন্যতা কীভাবে এই নাটকের মূল কাঠামো হয়ে উঠেছে, তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
নাটকের শুরুতে আমরা তিনটি চরিত্র পাই—অমল, বিমল ও কমল। জ্যামিতিক ভাষায় এরা এক একটি ‘বিন্দু’। বিন্দু যেমন স্থান অধিকার করে কিন্তু তার কোনো বিস্তার নেই, এই তিনটি চরিত্রও তেমনই। তাদের জীবনে কোনো গভীরতা বা বিস্তার নেই; তারা সামাজিক গাণিতিক গড়ের (Statistical Average) প্রতিনিধি মাত্র।
নাটকটি শুরুই হচ্ছে এক অদ্ভুত জ্যামিতিক শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে। চরিত্রগুলি মঞ্চে আসে একটি ছকে বাঁধা নিয়মে। তাদের পরিচিতি প্রদানের ধরন অনেকটা এমন:
বিমল: আমি বিমল। বি. কম. পাস করেছি। বড় অফিসে চাকরি করি।
কমল: আমি কমল। এম. এস-সি. পাস। প্রফেসারি করি।
এই পরিচিতি প্রদানের মধ্যে কোনো আবেগ নেই; এটি অনেকটা ‘ডেটা শিট’ বা ছকের মতো। বাদল সরকার এখানে মানুষকে মানুষ হিসেবে নয়, বরং একটি যান্ত্রিক সভ্যতার ‘স্থানাঙ্ক’ (Coordinates) হিসেবে দেখিয়েছেন। অমল-বিমল-কমলরা এক সরলরেখায় চলে। তাদের জীবনের গতিপথ প্রাক-নির্ধারিত: পড়াশোনা থেকে ডিগ্রি, তারপর চাকরি থেকে বিয়ে এবং শেষে মৃত্যু। এই রৈখিক জীবন আসলে একটি জ্যামিতিক ফাঁদ।
‘এবং ইন্দ্রজিৎ’-এর সবচেয়ে শক্তিশালী জ্যামিতিক রূপক হলো ‘বৃত্ত’ (Circle)। বৃত্তের কোনো শুরু নেই, কোনো শেষ নেই; এটি একটি অনন্ত আবর্তন। নাটকের চরিত্রগুলি বারবার একই জায়গায় ফিরে আসে। নাট্যকার এখানে সময়ের ধারণাকে একটি বৃত্তে পরিণত করেছেন। অমল-বিমল-কমলরা যে জীবনের কথা বলে, তা আসলে একটি আবর্ত। তারা ভাবে তারা উন্নতি করছে (পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধি), কিন্তু জ্যামিতিক দিক থেকে তারা একই বৃত্তের পরিধিতে ঘুরপাক খাচ্ছে।
ইন্দ্রজিৎ এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। সে বলে:
ইন্দ্রজিৎ: আমি কি এই তিনজনের মতন? আমি কি বি. এ. পাস করে চাকরি করে বিয়ে করে রিটায়ার করব? আমি কি আর কিছু হতে পারি না?
এখানেই দ্বন্দ্বের শুরু। ইন্দ্রজিৎ নিজেকে একটি ‘স্পাইরাল’ (Spiral) বা কুণ্ডলী হিসেবে কল্পনা করতে চায়, যা প্রতি আবর্তনে উচ্চতর স্তরে যায়। কিন্তু নাটকের শেষে দেখা যায়, সেই স্পাইরালও আসলে এক ধরনের বৃত্তাকার বিভ্রম। কলকাতা থেকে লন্ডন, লন্ডন থেকে আবার কলকাতা—এই ভৌগোলিক ভ্রমণ আসলে এক জ্যামিতিক শূন্যতা। সে যেখানেই যায়, নিজেকে একই বিন্দুতে আবিষ্কার করে।
মঞ্চে 'এবং ইন্দ্রজিত'-এর এক দৃশ্য
নাটকের কাঠামোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘ত্রিভুজ’ (Triangle)। তবে এটি কোনো সাধারণ প্রেমের ত্রিভুজ নয়; এটি চেতনার ত্রিভুজ। এর তিন কোণে অবস্থান করছেন—লেখক, ইন্দ্রজিৎ এবং মানসী।
লেখক: তিনি পর্যবেক্ষক, যিনি এই জ্যামিতি আঁকছেন।
ইন্দ্রজিৎ: তিনি ভুক্তভোগী, যিনি জ্যামিতির ভিতরে ছটফট করছেন।
মানসী: তিনি সেই পরম বিন্দু বা লক্ষ্য, যাকে ইন্দ্রজিৎ ছুঁতে চায় কিন্তু পারে না।
মানসী চরিত্রটি নাটকে বারবার ফিরে আসে ভিন্ন ভিন্ন রূপে। সে কখনও প্রেমিকা, কখনও বোন, কখনও বা এক ধরাছোঁয়ার বাইরের আদর্শ। ইন্দ্রজিৎ তাকে কেন্দ্র করে নিজের কক্ষপথ তৈরি করতে চায়, কিন্তু বৃত্তের জ্যামিতিক নিয়ম অনুযায়ী ব্যাসার্ধ স্থির থাকলে পরিধিও স্থির হয়ে যায়। মানসী আসলে সামাজিক স্থিতাবস্থার প্রতীক। সে ইন্দ্রজিৎকে প্রশ্ন করে:
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Manipur: সাবিত্রী হেইসনাম শরীরের শেষ বস্ত্রখণ্ডটিও ফেলে দিতেন মঞ্চে। সোজা দাঁড়াতেন নগ্ন হয়ে। ২০০০ সালের ১৪ এপ্রিল এবং ২০ এপ্রিল, ইম্ফলে প্রথম এই নাটকটি দু’বার মঞ্চস্থ হয়।
কেন তুমি সবার মতো হতে পারো না? কেন তোমাকে আলাদা হতে হবে?
এই প্রশ্নটি ইন্দ্রজিতের জ্যামিতিক স্বকীয়তাকে ভেঙে তাকে সাধারণ বিন্দুর (অমল-বিমল-কমল) সারিতে নিয়ে আসতে চায়।
একটি বৃত্তের মাঝখানে কী থাকে? উত্তর হলো—শূন্য। বাদল সরকার এই বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক সত্যটিকে নাটকের আধ্যাত্মিক সত্যে রূপান্তরিত করেছেন। নাটকের কাঠামোগত শৃঙ্খলার ঠিক মাঝখানে বিরাজ করছে এক বিরাট অর্থহীনতা বা শূন্যতা। ইন্দ্রজিৎ যখন তার অস্তিত্বের অর্থ খোঁজে, সে আসলে সেই শূন্যতার মুখোমুখি হয়। এই শূন্যতা ফুটে ওঠে নাটকের সংলাপের বিরতি (Pauses) এবং নৈঃশব্দ্যের মধ্য দিয়ে।
লেখক: আমি লিখছি... কী লিখছি? কেন লিখছি?
ইন্দ্রজিৎ: আমি আছি... কেন আছি?
এই ‘কেন’ এবং ‘কী’ হলো সেই শূন্যস্থান, যা কোনো জ্যামিতিক ফর্মুলা দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। বাদল সরকার এখানে আলবেয়ার কামুর ‘দ্য মিথ অফ সিসিপাস’-এর প্রভাবকে ভারতীয় মধ্যবিত্তের প্রেক্ষাপটে স্থাপন করেছেন। সিসিপাস যেভাবে পাহাড়ের উপরে পাথর ঠেলে তোলে এবং তা নিচে পড়ে যায়—এই বৃত্তাকার পরিশ্রমই হলো তার অস্তিত্ব। ইন্দ্রজিতের ক্ষেত্রেও তাই। সে বারবার নিজেকে নির্মাণ করে, কিন্তু নাগরিক জীবনের জ্যামিতি তাকে চূর্ণ করে দেয়।
বাদল সরকারের নাটকে মঞ্চসজ্জাও জ্যামিতিক। তিনি প্রথাগত ভারী সেট ব্যবহার না করে অভিনয়ের মাধ্যমে ‘স্থান’ (Space) তৈরি করতেন। ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটকে ট্রেনের কামরা, কফি হাউসের টেবিল বা অফিস—সবই তৈরি হয় আলোকসম্পাত এবং অভিনেতাদের শারীরিক বিন্যাসের মাধ্যমে। যখন অমল-বিমল-কমল-ইন্দ্রজিৎ মঞ্চে দাঁড়ায়, তখন তাদের শারীরিক দূরত্বের মধ্যেও এক ধরনের জ্যামিতিক বিচ্ছিন্নতা কাজ করে। তারা কাছাকাছি থাকলেও প্রত্যেকেই নিজের নিজের ‘আইসোলেটেড পয়েন্ট’-এ অবস্থান করে। এটি আধুনিক নগরায়নের এক নির্মম বাস্তব। মানুষ ভিড়ের মধ্যে বাস করে, কিন্তু জ্যামিতিকভাবে সে একা।
নাটকের কাঠামোতে সময় (Time) কোনো সরলরেখা নয়। সাধারণত নাটকে একটি শুরু, মধ্যভাগ এবং পরিণতি থাকে। কিন্তু এখানে সময় খণ্ডিত। অমল-বিমল-কমলদের সময় হলো একটি ক্যালেন্ডারের পাতা ওলটানোর মতো যান্ত্রিক। আর ইন্দ্রজিতের সময় হলো স্মৃতির দহন। নাটকের শেষে যখন লেখক এবং ইন্দ্রজিৎ মুখোমুখি হয়, তখন সময় থমকে যায়।
লেখক: রাস্তাটা সোজা নয় ইন্দ্রজিৎ। রাস্তাটা গোল। আমাদের আবার ফিরতে হবে।
ইন্দ্রজিৎ: তাহলে কি কোনো লাভ নেই? কোনো মুক্তি নেই?
এখানে লেখক সময়ের জ্যামিতিক সত্যটি স্বীকার করে নেন। মুক্তি নেই জেনেও পথ চলা—এটিই হলো বাদল সরকারের থার্ড থিয়েটারের দিকে যাত্রার প্রথম ধাপ। এই ‘হাঁটা’ বা ‘Progeny’ হলো শূন্যতাকে জয় করার একমাত্র পথ।
‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটকে সময় এবং স্থান (Time and Space) কোনো স্থির বা রৈখিক ধারণা নয়। এখানে সময় একটি বহমান নদীর বদলে থমকে যাওয়া এক জলাধার, আর স্থান হলো একটি গোলকধাঁধা। নাটকটিতে সময়ের ধারণাটি অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। অমল-বিমল-কমলদের কাছে সময় মানে কেবল অফিসের রেজিস্টার খাতা বা পদোন্নতির অপেক্ষা। কিন্তু ইন্দ্রজিতের কাছে সময় একটি ‘অনন্ত প্রতীক্ষা’। সে কীসের জন্য অপেক্ষা করছে, তা সে নিজেও জানে না।
নাটকে সময়ের এই স্থবিরতাকে বাদল সরকার ফুটিয়ে তুলেছেন পুনরাবৃত্তিমূলক সংলাপের মাধ্যমে। যখন চরিত্রগুলি বলে— “পরীক্ষা দিলাম, পাস করলাম, চাকরি খুঁজছি... ইন্টারভিউ দিচ্ছি... চাকরি পেলাম।” তখন মনে হয় সময় যেন একটি গ্রামোফোন রেকর্ডের মতো একই জায়গায় আটকে গিয়েছে।
মিউজিয়ামে যেমন বস্তুগুলি নড়াচড়া করে না, ইন্দ্রজিতের জীবনেও প্রকৃত অর্থে কোনো বিবর্তন ঘটে না। বছর যায়, দশক পেরোয়, কিন্তু মানসিক স্তরে সে ১৯ এপ্রিল বা কোনো এক বিশেষ তিথিতেই আটকে থাকে। এই স্থবিরতাই সময়কে এক অনন্ত প্রতীক্ষায় রূপান্তর করে।
নাটকে ‘স্থান’ বা স্পেস-কে অত্যন্ত বিমূর্তভাবে ব্যবহার করেছেন বাদল সরকার। ইন্দ্রজিৎ বারবার স্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে মুক্তি খুঁজতে চায়। সে কলকাতা থেকে ডামডাম, ডামডাম থেকে লন্ডন, আবার লন্ডন থেকে কলকাতায় ফিরে আসে। কিন্তু এই ভৌগোলিক পরিবর্তন তাকে কোনো মানসিক মুক্তি দেয় না।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Reading List : যদি জানতাম কোনোদিন আর দেখা হবে না, আমরা পরস্পরের মুখোমুখি বসব না তবে শুধু চিঠি দিয়ে যোগসূত্র রেখে যেতে পারতাম কি? লিখনে কি সব কথা বলা যায়?
এখানে ‘কলকাতা’ কেবল একটি শহর নয়, এটি একটি চেতনার নাম। এটি সেই মিউজিয়ামের দেওয়াল, যা তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে। সে যখন লন্ডনে যায়, সে আসলে তার একাকীত্ব আর প্রতীক্ষাকে সঙ্গে করেই নিয়ে যায়।
ইন্দ্রজিৎ: আমি পালিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম সমুদ্র পার হলে সব বদলে যাবে। কিন্তু সেখানেও গিয়ে দেখলাম—আমি সেই আমিই আছি।
স্থান এখানে একটি ফাঁদ। মিউজিয়ামের এক ঘর থেকে অন্য ঘরে গেলে যেমন বস্তুর চরিত্র বদলায় না, ইন্দ্রজিতের ক্ষেত্রেও দেশকালভেদে তার অস্তিত্বের সংকট একই থাকে। এই মিউজিয়ামের প্রধান প্রদর্শনী হলো ‘প্রতীক্ষা’। ইন্দ্রজিৎ প্রতীক্ষা করে এক অলীক মুক্তির, এক নতুন সংজ্ঞার। কিন্তু তার এই প্রতীক্ষা কোনো গন্তব্যে পৌঁছয় না। এটি আলবেয়ার কামুর বর্ণিত সিসিপাসের শ্রমের মতো। সিসিপাস যেমন অনন্তকাল ধরে পাথর ঠেলে পাহাড়ের উপরে তোলে, ইন্দ্রজিৎ তেমনি প্রতিদিন তার অস্তিত্বের বোঝা টেনে নিয়ে চলে।
নাটকের ‘মানসী’ চরিত্রটি এই প্রতীক্ষার একটি কেন্দ্রীয় বিন্দু। মানসী এখানে স্থির, অচঞ্চল। সে যেন মিউজিয়ামের সেই দুর্লভ শিল্পকর্ম, যাকে ইন্দ্রজিৎ বারবার স্পর্শ করতে চায় কিন্তু কাঁচের দেওয়াল (সামাজিক নিয়ম ও নৈতিকতা) তাকে বাধা দেয়। তাদের প্রেম কোনো পরিণতির দিকে এগোয় না, বরং তা এক অনন্ত অপেক্ষার মিউজিয়ামে সংরক্ষিত হয়ে থাকে।
বাদল সরকার নাটকে দুই ধরনের সময়ের সংঘাত দেখিয়েছেন। প্রথমত—যান্ত্রিক সময়, যা ঘড়ির কাঁটায় চলে। অমল-বিমল-কমলরা এই সময়ের উপাসক। তাদের জীবন সেকেন্ড, মিনিট আর ঘণ্টার হিসেবে বিভক্ত। দ্বিতীয়ত—চেতনার সময়, যা ইন্দ্রজিতের। এই সময় কোনো নিয়ম মানে না; এটি স্মৃতির অতীতে চলে যায়, আবার ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় ঝাঁপ দেয়।
নাটকের ‘লেখক’ চরিত্রটি এই দুই সময়ের মধ্যে সেতু বন্ধন করার চেষ্টা করেন। তিনি যখন কাগজ ছিঁড়ে ফেলেন বা নতুন নাটক লেখার চেষ্টা করেন, তিনি আসলে সময়ের এই মিউজিয়াম থেকে পালানোর পথ খোঁজেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকেও স্বীকার করতে হয় যে, এই জাদুঘর থেকে বেরোনোর কোনো দরজা নেই। নাটকের শেষ দৃশ্যে লেখক যখন বলেন—
আমাদের পথ চলতে হবে ইন্দ্রজিৎ। রাস্তাটা গোল, কিন্তু আমাদের হাঁটতে হবে।
তখন এই ‘অনন্ত প্রতীক্ষার মিউজিয়াম’ একটি নতুন মাত্রা পায়।
‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটকের আলোচনায় উপজাতীয় প্রেক্ষিত একটি বিশেষ সমাজতাত্ত্বিক ও দার্শনিক গুরুত্ব বহন করে। এখানে ‘উপজাতীয়’ বলতে কোনো নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠী নয়, বরং আধুনিক নগরসভ্যতার ভিতরে জন্ম নেওয়া এক ‘বিচ্ছিন্ন উপজাতি’র (Alienated Tribe) কথা বলা হয়েছে, যারা ভিড়ের মধ্যে থেকেও নিঃসঙ্গ।
আধুনিক শহর আসলে এক অদ্ভুত জাদুঘর, যেখানে মানুষ তার নিজস্ব পরিচয় হারিয়ে এক একটি ‘টাইপ’ বা শ্রেণিতে পরিণত হয়। বাদল সরকার অমল, বিমল এবং কমলের মাধ্যমে এই নাগরিক উপজাতির একটি রেখাচিত্র এঁকেছেন। এই উপজাতির বৈশিষ্ট্য হলো—তারা প্রশ্নহীন, আবর্তিত এবং যান্ত্রিক। তাদের জীবনের লক্ষ্যগুলো সমাজ কর্তৃক নির্ধারিত (Pre-defined)।
ইন্দ্রজিৎ এই উপজাতিরই একজন হতে চেয়েছিল, কিন্তু তার ভিতরের ‘সত্তা’ তাকে সেই নির্বোধ সুখে থাকতে দেয় না। এখান থেকেই শুরু হয় নাগরিক ট্র্যাজেডি। যখন একজন মানুষ তার চারপাশের চেনা সমাজ বা ‘উপজাতির’ ভাষা বুঝতে পারে না, অথচ সেই সমাজকেই ত্যাগ করতে পারে না—তখনই তার একাকীত্ব এক মহাকাব্যিক রূপ ধারণ করে।
নাগরিক ট্র্যাজেডির মূল উপজীব্য হলো ‘বিচ্ছিন্নতাবোধ’ (Alienation)। ইন্দ্রজিৎ কলকাতার জনসমুদ্রে মিশে আছে, বাসে চড়ছে, কফি হাউসে আড্ডা দিচ্ছে, কিন্তু মানসিকভাবে সে এক জনমানবহীন দ্বীপে নির্বাসিত। বাদল সরকার দেখিয়েছেন, আধুনিক শহরে যোগাযোগের (Communication) মাধ্যম বাড়লেও মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ (Connection) কমে গিয়েছে।
সংলাপের একঘেয়েমি এবং পুনরাবৃত্তি এই একাকীত্বকেই প্রকট করে। অমল-বিমল-কমলরা যখন তাদের পদোন্নতি বা বাজারদর নিয়ে কথা বলে, ইন্দ্রজিৎ তখন নক্ষত্রের দূরত্ব বা সময়ের অর্থ খোঁজে। এই যে চিন্তার অসমতা, এটিই তাকে তার নিজস্ব ‘নাগরিক উপজাতি’ থেকে বিচ্যুত করে একাকীত্বের ট্র্যাজেডিতে নিক্ষেপ করে। প্রথাগত ট্র্যাজেডিতে নায়কের পতন ঘটে কোনো মহৎ ভুলের কারণে। কিন্তু নাগরিক ট্র্যাজেডিতে ইন্দ্রজিতের পতন ঘটে তার ‘সচেতনতা’র কারণে। সে জানে সে বৃত্তে ঘুরছে—এটাই তার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
অমল-বিমলরা সুখী কারণ তারা জানে না তারা বৃত্তে বন্দি। কিন্তু ইন্দ্রজিৎ সেই বন্দিত্ব সম্পর্কে সচেতন। এই সচেতনতা তাকে মুক্তি দেয় না, বরং তার একাকীত্বকে আরও ঘনীভূত করে। সে বুঝতে পারে, এই ৪০০০ বছরের সভ্যতায় সে কেবল একজন ‘অপ্রাসঙ্গিক’ দর্শক। এই অপ্রাসঙ্গিকতাই আধুনিক নাগরিক উপজাতির সবচেয়ে বড় অভিশাপ।
নাগরিক একাকীত্বের আরেকটি দিক হলো প্রেমের ব্যর্থতা। ইন্দ্রজিৎ ও মানসীর সম্পর্ক কোনো সামাজিক বা অর্থনৈতিক কারণে বাধাগ্রস্ত হয়নি, বরং তা বাধাগ্রস্ত হয়েছে তাদের অস্তিত্বের সংকটে। মানসী সেই স্থায়িত্ব বা Stability চায় যা এই নাগরিক জ্যামিতির অংশ। অন্যদিকে ইন্দ্রজিৎ চায় এমন কিছু যা সংজ্ঞাতীত। মানসী যখন বলে,
সবাই যা করে তুমি তা করো না কেন?
তখন বোঝা যায় যে ইন্দ্রজিৎ তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষের কাছেও একজন ‘ভিনগ্রহী’ বা অন্য কোনো উপজাতির প্রতিনিধি হয়ে গিয়েছে। এই মানসিক দূরত্বই নাগরিক জীবনের একাকীত্বকে এক দীর্ঘশ্বাসে পরিণত করে।
নাটকটিতে লেখক এবং ইন্দ্রজিৎ আসলে একই সত্তার দুটি বিচ্ছিন্ন অংশ। লেখক যখন তার চরিত্র খুঁজে পান না, তখন তা আসলে আধুনিক মানুষের আত্মপরিচয়ের সংকটকে (Identity Crisis) নির্দেশ করে। এই নাগরিক ট্র্যাজেডিতে মানুষ নিজেই নিজের কাছে অচেনা। নাটকের শেষে যখন তারা ধুলোবালি মাখা রাস্তায় হাঁটার কথা বলেন, তখন সেই হাঁটা কোনো গন্তব্যের দিকে নয়—তা স্রেফ টিকে থাকার জন্য। এই ‘সারভাইভাল’ বা টিকে থাকাই হলো আধুনিক উপজাতির একমাত্র ধর্ম। এখানে একাকীত্ব কোনো সাময়িক মানসিক অবস্থা নয়, বরং এটিই নিয়তি।
তৎকালীন বাংলা থিয়েটার ছিল মূলত ‘প্রসেনিয়াম’ বা চার দেওয়াল ঘেরা মঞ্চের উপর নির্ভরশীল। সেখানে দামি পর্দা, বাস্তবধর্মী সেট এবং আলোকসম্পাতের এক কৃত্রিম জগৎ তৈরি করা হতো। কিন্তু বাদল সরকার বুঝলেন, মধ্যবিত্তের জটিল মনস্তত্ত্ব এবং অস্তিত্বের সংকট ফুটিয়ে তোলার জন্য এই আড়ম্বরপূর্ণ মঞ্চসজ্জা আসলে একটি বাধা।
‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটকে তিনি প্রথমবার দেখালেন, মঞ্চে কোনো আস্ত ঘর বা কফি হাউসের সেট ছাড়াই কেবল কয়েকটি চেয়ার বা বেঞ্চ এবং প্রতীকের সাহায্যে একটি সম্পূর্ণ জগৎ তৈরি করা সম্ভব। এটিই ছিল প্রথাগত মঞ্চসজ্জা থেকে ‘মুক্তি’র প্রথম পদক্ষেপ। মঞ্চ এখানে কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক স্থান নয়, বরং তা মানুষের ‘মনোভূমি’তে রূপান্তরিত হলো।
বাদল সরকার বিশ্বাস করতেন, থিয়েটারের জন্য যা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা হলো অভিনেতা এবং দর্শক; বাকি সব কিছু গৌণ। ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’-এ মঞ্চের এই শূন্যতাকে তিনি এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—তার ‘মাল্টি-পারপাস স্পেস’। একই মঞ্চে কখনও কলেজ, কখনও অফিস, কখনও পার্কের বেঞ্চ আবার কখনও লন্ডন—সবই রূপায়িত হয়। এই পরিবর্তনের জন্য কোনো পর্দা পড়ে না; অভিনেতাদের চলন এবং সংলাপের মাধ্যমেই স্থান পরিবর্তিত হয়। এই যে ‘ফ্লেক্সিবল স্পেস’ বা নমনীয় স্থানের ব্যবহার, এটিই পরবর্তীকালে তার ‘থার্ড থিয়েটারে’র মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়, যেখানে অভিনেতা এবং দর্শকের মধ্যে কোনো দূরত্ব থাকবে না।
থার্ড থিয়েটারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বিত্তহীন নাট্যরীতি। ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটকে আমরা এর প্রাথমিক রূপটি দেখতে পাই। যখন অমল-বিমল-কমলরা মঞ্চে আসে, তাদের হাতে কোনো বাস্তবের ফাইল বা বই থাকে না, কিন্তু তাদের ভঙ্গিমা বুঝিয়ে দেয় তারা জীবনের ভার বয়ে বেড়াচ্ছে। মঞ্চের উপর থাকা লোহার জালি বা কয়েকটি রড অনেক সময় কারাগার বা সময়ের শৃঙ্খল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বস্তুর বদলে প্রতীকের উপর এই নির্ভরশীলতা মঞ্চসজ্জাকে এক বিশাল খরচের হাত থেকে মুক্তি দেয় এবং নাট্যকারের কল্পনাকে অসীম বিস্তার দেয়।
প্রথাগত নাটকে আলো ব্যবহৃত হতো কেবল দৃশ্যমানতা বাড়ানোর জন্য। কিন্তু ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’-এ আলো হয়ে ওঠে একটি স্বতন্ত্র চরিত্র। অন্ধকারের মধ্য থেকে ইন্দ্রজিতের হঠাৎ উদয় হওয়া বা লেখকের মুখের উপর আসা তীক্ষ্ণ আলো—এই জ্যামিতিক আলোকপাত চরিত্রের বিচ্ছিন্নতাকে (Alienation) ফুটিয়ে তোলে। মঞ্চের উপর কোনো বস্তুগত আসবাব না থাকায় আলোই সেখানে সীমানা নির্ধারণ করে দেয়। এই আলোক-জ্যামিতি পরবর্তীকালে থার্ড থিয়েটারের ‘ইনডোর’ পারফরম্যান্সের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
থার্ড থিয়েটারে অভিনেতার শরীরই প্রধান দৃশ্যপট। ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’-এ আমরা দেখি, অভিনেতারা যখন ট্রেনের হুইসেলের শব্দে বা একঘেয়ে যান্ত্রিক ভঙ্গিতে মঞ্চ অতিক্রম করে, তখন দর্শক সেই যান্ত্রিক সভ্যতার প্রেক্ষাপটটি নিজের মনে তৈরি করে নেয়। নাট্যকার এখানে দর্শকের কল্পনাশক্তিকে (Imagination) মুক্তি দিয়েছেন। মঞ্চে একটি আস্ত ট্রেন রাখার চেয়ে ট্রেনের দুলুনি অভিনেতা যখন তার শরীরে ফুটিয়ে তোলে, তখন সেই অভিজ্ঞতা হয় অনেক বেশি প্রত্যক্ষ এবং সংবেদী।
নাটকের শেষ দৃশ্যটি থার্ড থিয়েটারের জন্মের সবচেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত। লেখক যখন বলেন,
রাস্তাটা আমাদের সামনে পড়ে আছে ইন্দ্রজিৎ
তখন তাঁরা মঞ্চের কৃত্রিম আলো আর ফ্রেম থেকে বেরিয়ে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই ‘রাস্তা’ কেবল গল্পের রাস্তা নয়, এটি থিয়েটারের রাস্তা। বাদল সরকার বুঝেছিলেন, চার দেওয়ালের থিয়েটার কেবল উচ্চবিত্ত বা শিক্ষিত মধ্যবিত্তের বিনোদন। কিন্তু ইন্দ্রজিৎ যে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি, তাকে খুঁজে পেতে হলে মঞ্চের জাঁকজমক ত্যাগ করে সাধারণের ভিড়ে মিশে যেতে হবে। এই মঞ্চসজ্জার মুক্তিই শেষ পর্যন্ত ‘আঙন মঞ্চ’ (Arena Theatre) বা গ্রামবাংলার খোলা উঠোনে নাটকের ভিত গড়ে দিয়েছিল।
‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটকটি ছিল বাদল সরকারের এক পরীক্ষাগার। এখানে তিনি প্রথাগত মঞ্চের কাঠামোকে ভেঙে চুরমার করেননি ঠিকই, কিন্তু তার ভিতর থেকে প্রাণভোমরাটিকে বের করে এনেছিলেন। সাজসজ্জার বাহুল্য বর্জন করে মানুষের নগ্ন অস্তিত্বকে মঞ্চে দাঁড় করানোর যে সৎ সাহস তিনি এখানে দেখিয়েছিলেন, তাই পরবর্তীকালে মহীরুহ হয়ে ‘থার্ড থিয়েটার’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। মঞ্চের এই মুক্তি আসলে নাট্যকার এবং অভিনেতা—উভয়েরই আত্মার মুক্তি।








