পুরভোট প্রমাণ, নন্দীগ্রামজয়ী শুভেন্দু রইলেন তবে বিজেপিকে হারাতে হল কিঞ্চিত বেশি...

১০ মাস আগের কথা। দিনটা ছিল, ২ মে ২০২১, অধিকারীদের গড় নন্দীগ্রামে খোঁজ শুভেন্দুকে হারিয়ে নন্দীগ্রাম জয়ের স্বপ্ন দেখছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কোন ভাবে শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন সফল না হলেও, বিধানসভায় জেতে তৃণমূল। ২০০ আসনের অশ্বমেধের ঘোড়া ছোটানো বিজেপি ক্ষান্ত হলো ৭৭-এই। তবে কোনোভাবে নিজের দুর্গ টিকিয়ে রেখেছিলেন শুভেন্দু। মমতাকে হারাতে পারলেও, পদ্মশিবিরকে হারিয়েছিল বাংলার মানুষ। ৩ থেকে ৭৭, উন্নতিটা বেশ চোখে পড়ার মতো, কিন্তু, পরাজিত হয়েছিলেন সব বড় মুখেরা। 

কিন্তু, ২০২২ পুরভোটে সেই দুর্গেও ধরল চিড়। নিজের ওয়ার্ডে এমনকি নিজের বুথেও হারলেন শুভেন্দু অধিকারী। হল অধিকারী রাজ্যের অবসান। প্রায় তিন দশক ধরে যে এলাকাটায় রাজত্ব করে আসছিলেন শিশির এবং শুভেন্দুরা, সেখান থেকেই তাদেরকে বিতাড়িত করলেন এলাকার বাসিন্দারা। শুভেন্দু গড় কাঁথিতে অবসান হলো একটা যুগের। শান্তিকুঞ্জ আজ থমথমে। অধিকারীদের ছাড়াই, কাঁথি পুরসভার 'অধিকারী' হলো তৃণমূল কংগ্রেস। অধিকারীদের এলাকায় গিয়ে অধিকারীদের হারালেন মমতার সৈনিকরা। আবারো তৃণমূল কংগ্রেস প্রমাণ করে দিল, ব্যক্তি নয়, বরং আসল কথাটা বলে দল। কাঁথি জিতে তৃণমূল শুভেন্দুকে তার আসল জায়গাটা চিনিয়ে দিল। দাবি করল, শুভেন্দু অধিকারীর দর্প চূর্ণ হয়েছে পুরভোটের পরাজয়ে। সম্পূর্ণ হলো একটা বৃত্ত, যে বৃত্তের শেষে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে শুধু রইল হতাশা। 

গত বিধানসভায় যেমন সবথেকে হাই ভোল্টেজ বিধানসভা আসনটি ছিল নন্দীগ্রাম, সেরকমই পুরো ঘটেছিল কাঁথি পৌরসভা। শুভেন্দু অধিকারীর হোম গ্রাউন্ডে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে রাজত্ব করছেন অধিকারীরা। শিশির অধিকারীর হাত ধরে শুরু হয়েছিল অধিকারী সাম্রাজ্যের, যার উত্তরাধিকার পেয়েছিলেন শুভেন্দু। ভাই সৌমেন্দুও পৌরসভা নির্বাচনে অধিকারীদের অন্যতম মুখ ছিলেন। নন্দীগ্রাম আন্দোলন থেকে শুরু করে ভোটের ময়দান, শুভেন্দুর উত্থান এই নন্দীগ্রাম থেকেই। তবে উত্থানের সময় অবশ্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন। 

বিধানসভা নির্বাচনের পরে যদিও শুভেন্দু বিরোধী দলনেতা। গত বিধানসভায় শমীক ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে বিজেপির বাঘা বাঘা নেতারা পরাজিত হলেও, নন্দীগ্রাম ফেরায়নি শুভেন্দুকে। মমতাকে অত্যন্ত ক্লোজ মার্জিনে হারিয়ে বিধানসভায় গিয়েছিলেন শুভেন্দু। যদিও, সেই জয় নিয়ে বিতর্ক ছিল প্রথম থেকেই। লোডশেডিং, মমতাকে জয়ী ঘোষণা করার পর ফের শুভেন্দুকে চূড়ান্ত জয়ী ঘোষণা করা, ফলাফল নিয়ে ধোঁয়াশা, চ্যালেঞ্জ পাল্টা চ্যালেঞ্জ, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে মামলা, কি হয়নি এই নন্দীগ্রামকে নিয়ে! একে অপরকে নন্দীগ্রাম নিয়ে এক চুলও জমি ছাড়তে চান না মমতা এবং শুভেন্দু দুজনেই। পরবর্তীতে ভবানীপুর উপ-নির্বাচনে জিতে মমতা মুখ্যমন্ত্রী পদে স্থায়ী হলেও, নন্দীগ্রাম নিয়ে কোথাও না কোথাও তার অস্বস্তি থেকেই গিয়েছিল।

তাই, কাঁথি পৌরসভা তৃণমূলের কাছে ছিল ক্ষমতা প্রদর্শনের লড়াই। আর শুভেন্দুর কাছে, কাঁথি ছিল সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু মান রক্ষার লড়াইয়ে, শুভেন্দু অধিকারী নিজের হোম গ্রাউন্ডেই একেবারে গোহারা হারলেন। শুধু পুরসভাতেই নয়, নিজের ওয়ার্ড এমনকি নিজের বুথ পর্যন্ত টিকিয়ে রাখতে পারলেন না তিনি। এটা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে যেমন লজ্জার, তেমনি বিজেপির কাছে অস্বস্তিরও বটে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর পিতৃদেব শিশির অধিকারী বা তার পরিবারের কেউ দীর্ঘ তিন দশক ধরে কাঁথি পুরসভার দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৯০ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত কাঁথি পৌরসভার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব সামলেছেন শিশির অধিকারী। তারপর, ২০০৬ সালে সেই দায়িত্ব গ্রহণ করলেন শুভেন্দু। ২০১০ সালে শুভেন্দু সেই পদ ছাড়লে কাঁথি পুরসভার চেয়ারম্যান হন তার ছোটভাই সৌমেন্দু অধিকারী। ২০২০ পর্যন্ত তিনি ছিলেন দায়িত্বে। যদিও তিনি তৃণমূল ছাড়ার পর তাকে পুর-প্রশাসকের আসন থেকে অপসারিত করা হয়। 

কিন্তু এবারের নির্বাচনে বিজেপিকে সাথে নিয়ে আবারো কাঁথি পুরসভায় পদ্ম ফোটানোর লক্ষ্য নিয়েছিলেন শুভেন্দু। তার জন্য প্রচারও চালিয়েছিলেন জোরকদমে। পুরভোটের আগে নিজেই কার্যত সভা করে করে চষে বেড়িয়েছেন সম্পূর্ণ এলাকা। তৃণমূলকে জমি ছাড়তে নারাজ ছিলেন শুভেন্দু। কিন্তু, তিনি জানতেনই না যে, শুভেন্দু কিংবা শিশির নন, আসল ফ্যাক্টর ছিলেন মমতা। তৃণমূল থেকে শুভেন্দু সরে যেতেই অধিকারীদের মাথা থেকে খসে পড়ল অহংকারের মুকুটটা। একুশের বিধানসভার আগে শুভেন্দু এবং সৌমেন্দু বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। সেজ ছেলে দিব্যেন্দু অধিকারী তৃণমূলের সাংসদ থাকলেও, তাকে নিয়ে জল্পনা ছিল বিস্তর। শিশির অধিকারী ও যোগ দিয়েছিলেন বিজেপিতে। 

কিন্তু, এই সব জল্পনা শেষ করে দিল কাঁথির সাধারণ মানুষেরা। শেষ হলো কাঁথিতে অধিকারীদের রাজ। অধিকারী পরিবারের প্রতিও অনাস্থা প্রদর্শন করল মানুষ। যে দাপট দেখিয়ে শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রামে জিতেছিলেন, সেই দাপট কোথাও একটা হারিয়ে গেল পুরভোটে। বিধানসভা নির্বাচনে মমতাকে হারিয়ে যে ঝড় তোলার চেষ্টা করেছিলেন শুভেন্দু, সেই ঝড় এখন থেমে গিয়েছে। পুরো পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফোটানোর লক্ষ্য নেওয়া শুভেন্দুর নিজের এলাকাতেই ফুটেছে ঘাসফুল। কাঁথি পুরসভার ২১ টি ওয়ার্ডের মধ্যে শুধু মাত্র তিনটি ওয়ার্ডে জয় পেল বিজেপি। তৃণমূল জিতলো ১৭টি ওয়ার্ডে। বাকি একটি গেলো নির্দল এর হাতে। মমতার একদা এক সৈনিক শুভেন্দু অধিকারী এবারে নিজের গড় রাখতে কার্যত ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। অধিকারী পরিবারের কেউ প্রার্থী হননি এবারের নির্বাচনে, কিন্তু শুভেন্দু অধিকারী প্রচারের কোন কমতি রাখেননি। 

কিন্তু, ফল পেরোনোর আগেই শুভেন্দু হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন জয় আসবেনা, তিনি ব্যর্থ হবেন। তাই ভোটের শেষ দিন নিজেকে কিছুটা সরিয়ে রেখেছিলেন শুভেন্দু। তার বিরুদ্ধেই রায় দিলেন মানুষ। হার মানলেন শুভেন্দু অধিকারী। নিজের ঘরেই তাকে হারিয়ে নন্দীগ্রামের জ্বালা মেটালেন মমতা। তবে বিজেপির যে শুধুমাত্র কাঁথিতেই এরকম অবস্থা, তা কিন্তু নয়। বিজেপির দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা তথা প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ এর লোকসভা এলাকা খড়গপুরেও গোহারা হারলো বিজেপি। হিরণ হয়তো জিতলেন, কিন্তু পুরবোর্ড রইল তৃণমূলের হাতেই। 

বর্তমান রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদারের এলাকা বালুরঘাটেও বিজেপির অবস্থা একেবারে তথৈবচ। পুরো পশ্চিমবঙ্গেই বিজেপির প্রভাব কার্যত নেই বললেই চলে। একুশে বাংলায় যে হাওয়া ছিল বিজেপির পালে, সেই হাওয়া আর নেই। শুভেন্দুকেও সমানে সমানে টক্কর দিয়েছেন তিনি। ভবানীপুরের সহজ আসনটা ছেড়ে, শুভেন্দুর চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিলেন মমতা। দাঁড়িয়ে ছিলেন অপেক্ষাকৃত অনেক কঠিন নন্দীগ্রামে। বিধানসভা নির্বাচনের পুরো ফোকাসটা নন্দীগ্রামের দিকে ঘুরিয়ে কার্যত বিজেপির খেলা ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। নিজে পরাজিত হলেও জিতিয়েছিলেন দলকে। 

তবে সেখান থেকেই শুরু বিজেপির অবনমন। একসময় মোদী, অমিত শাহ, জেপি নাড্ডা, যোগী আদিত্যনাথের মত নেতারা বারবার বাংলায় এসে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখাতেন, তারা আজ বাংলাকে নিয়ে বিশেষ আশাবাদী নন। সুকান্ত মজুমদার, শুভেন্দু অধিকারী, দিলীপ ঘোষ তিনজনেই চরমভাবে ব্যর্থ। উত্তরবঙ্গে প্রথম থেকেই বিজেপির একটা প্রভাব ছিলই। সুরিন্দর সিং আলুওয়ালিয়া ছিলেন দার্জিলিংয়ের দীর্ঘদিনের বিধায়ক। সেই আসনেও পরাজিত বিজেপি। সেখানে জিতল নবনির্মিত হামরো পার্টি। গত বিধানসভায় উত্তরবঙ্গে বেশ ভালো প্রভাব ফেলেছিলেন বিজেপি নেতারা। পুরভোটের সেখান থেকে উৎখাত হলো বিজেপি। নামতে নামতে একেবারে তলানিতে চলে এসেছে ভারতীয় জনতা পার্টির সমর্থন। এই পুর-নির্বাচনে এক ধাক্কায় ২৩ শতাংশ ভোট খুইয়ে ধুঁকছে বিজেপি। অন্যদিকে, বিজেপিকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাম। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধী যে বাম ভোটকে কাজে লাগিয়ে ২০১৯ লোকসভায় এসেছিল বিজেপি, সেই বাম ভোটটাও ফিরে গেছে বামে। বিজেপি আবারও ফিরতে শুরু করেছে তার আগের অবস্থায়। প্রশ্ন উঠছে শুভেন্দু অধিকারীর জনপ্রিয়তাকে নিয়েই। প্রশ্ন উঠছে, অত্যধিক আগ্রাসন আর মেরুকরণের রাজনীতিই কাল হলো না তো বিজেপির?

More Articles

;