বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?
Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।
ভারতের ডিজিটাল ভবিষ্যতের অন্যতম বড় প্রকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে গুগলের বিশাখাপত্তনম ডেটা সেন্টার হাবকে। অন্ধ্রপ্রদেশের এই উপকূলীয় শহরে গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াট (GW) ক্ষমতার এই বিশাল এআই ডেটা সেন্টার। গুগলের ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকার এই বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছে সে রাজ্যের সরকার, যারা এটিকে রাজ্যের জন্য 'ঐতিহাসিকভাবে রূপান্তরকারী' প্রকল্প বলে অভিহিত করেছে। কিন্তু এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান পরিবেশবাদী আন্দোলন এবং একাধিক মামলা এই বিনিয়োগকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল, বিশাখাপত্তনমে গুগল ক্লাউড ইন্ডিয়া এআই হাবের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। গুগলের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রাইডেন ইনফোটেক প্রাইভেট লিমিটেড (Raiden Infotech Pvt Ltd) ১,০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই এআই ডেটা সেন্টার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে, যার জন্য বিশাখাপত্তনম ও অনাকাপল্লি জেলায় মোট ৬০১.৪ একর জমি বরাদ্দ করা হয়েছে। মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, তেলেঙ্গানার পর অন্ধ্রপ্রদেশও ডেটা সেন্টার হাব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। রাজ্যের ডেটা সেন্টার পলিসি ৪.০ এর অধীনে, ২০২৯ সালের মধ্যে সে রাজ্যে ১ গিগাওয়াট ক্ষমতাযুক্ত ডেটা সেন্টার যোগ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, এবং এই খাতে ৫১% পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতার পরিসীমা রাখা হয়েছে।
বিশাখাপত্তনম শহরের ২৫ লক্ষ মানুষের জন্য জল সরবরাহের ব্যবস্থা ইতোমধ্যেই চাপের মধ্যে রয়েছে। শহরটি প্রতিদিন ৪১০ মিলিয়ন লিটার জল পেয়ে থাকে, যেখানে শহরটির জলের চাহিদা প্রায় ৪৮০ মিলিয়ন লিটার। এই পরিস্থিতিতে বিশাল ডেটা সেন্টারের জন্য প্রয়োজনীয় জলের চাহিদা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিবেশবাদীরা সতর্ক করে দিয়েছেন, ডেটা সেন্টার থেকে নির্গত গরম জল স্থানীয় জলাশয় ও জীববৈচিত্র্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
একাধিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, একটি ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন ডেটা সেন্টার প্রতিদিন প্রায় ২০ লক্ষ লিটার জল ব্যবহার করে, যা প্রায় ৬,৫০০ পরিবারের দৈনিক জলের চাহিদার সমান। ২০২৪-২৫ সালে ভারতের ডেটা সেন্টারগুলি প্রায় ১৫০ বিলিয়ন লিটার জল ব্যবহার করেছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে ৩৫৮ বিলিয়ন লিটারে পৌঁছাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
AI in Gaza War: ইজরায়েলি বাহিনীকে 'টার্গেট' নির্ধারণ করতে গাজা জুড়ে অজস্র ফিলিস্তিনিদের মুখ স্ক্যান করতে গুগল ফটো ফেসিয়াল রিকগনিশন পরিষেবা ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছে গুগল।
তবে অন্ধ্রপ্রদেশের আইটি মন্ত্রী নারা লোকেশ দাবি করেছেন, ডেটা সেন্টারগুলির জন্য জল পোলাভরম প্রকল্পের শিল্প বরাদ্দ থেকে সরবরাহ করা হবে, শহরের বাসিন্দাদের পানীয় জলের উপর কোনো প্রভাব পড়বে না। তিনি জানান, রাজ্যের পরিকল্পিত ৬.৫ গিগাওয়াট ডেটা সেন্টারের জন্য বছরে প্রায় ৩ টিএমসি (Thousand Million Cubic feet) জল প্রয়োজন হবে, যা পোলাভরম প্রকল্পের শিল্প বরাদ্দ থেকে সরবরাহ করা হবে।
বিশাখাপত্তনম হাইকোর্টে দায়ের করা পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন (PIL)-এ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, ডেটা সেন্টার সাইটটি কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের মাত্র ৮৬০ মিটার দূরে অবস্থিত, যেখানে চিতাবাঘ ও প্যাঙ্গোলিনের মতো প্রাণীরা বাস করে। ভারী নির্মাণকাজ ও শব্দ দূষণ এই বন্যপ্রাণী অধ্যুষিত অভয়ারণ্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গুগল অবশ্য জানিয়েছে, তারা শব্দ-নিবারণ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এছাড়া, তাঁদের বক্তব্য যে, 'উন্নত এয়ার কুলিং প্রযুক্তি' ব্যবহার করা হবে, যাতে স্থানীয় জলসম্পদ রক্ষা পায়।
গত কয়েক মাসে বিশাখাপত্তনমে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। মানুষ রাস্তায় নেমে 'আমরা ডেটা খেতে পারব না' লেখা ব্যানার নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন এবং গুগলের লোগোতে হাতকড়া এঁকে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। গ্রিন বিশাখা (Green Visakha) নামের একটি পরিবেশবাদী সংস্থা এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে।
২০২৬ সালের, চলতি সেপ্টেম্বর মাসে 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস' (Stop Vizag Data Centers) নামের একটি নাগরিক আন্দোলনের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট ভারত সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মেটা জানিয়েছে, ভারত সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি বিধিমালার অধীনে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই অ্যাকাউন্টটির ১১,৮০০-এর বেশি ফলোয়ার ছিল এবং দু'মাসে ৫৬ লক্ষেরও বেশি ভিউ পেয়েছিল এখানে পোস্ট হওয়া লেখা, ছবি ও ভিডিওগুলি।
অ্যাকাউন্টটি নিষিদ্ধ করার আগে নয়টি পোস্ট নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। মানবাধিকার ফোরাম (HRF) এবং Environmental Reporting Collective (ERC)-এর পোস্টও একইভাবে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। HRF জানিয়েছে, অন্ধ্রপ্রদেশ পুলিশ তাদের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে ডেটা সেন্টার-বিরোধী কনটেন্ট সরানোর জন্য অনুরোধ করেছিল।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
AI Threat to China’s Communist Party: এআই শুধু প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ বদলাবে, নাকি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও রাজনীতিতেও তৈরি করবে নতুন সংকট? কেন চিনের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্তা এআইকে কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতার জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখছেন? বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার হাতে এআই গেলে কী ধরনের বিপদ তৈরি হতে পারে? আর কেন শি জিনপিং এআইকে মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা বলছেন?
অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার দাবি করেছে, ডেটা সেন্টার প্রকল্পটিকে, তাঁর পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, ছাড়াই দ্রুততার সঙ্গে অনুমোদন দেওয়া হয়নি। রাজ্য সরকার জানিয়েছে, তারা প্রকল্পের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ খতিয়ে দেখবে এবং সেগুলি বৈধ হলে উপযুক্ত প্রতিকার প্রদান করবে।
তবে, বিশাখাপত্তনমের জল সংকট মোকাবিলায় ১৫,০০০ কোটি থেকে ২৩,০০০ কোটি টাকার একটি প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু-র কাছে পাঠানো হয়েছে। এই প্রস্তাবে ইলেরু জলাধারের ক্ষমতা বাড়ানো এবং পাঁচটি নতুন ব্যালান্সিং রিজার্ভার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশাখাপত্তনম ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিলের সভাপতি ও. নরেশ কুমার জানিয়েছেন, ডেটা সেন্টার ও নতুন শিল্প স্থাপনার ফলে শহরের দৈনিক জলের চাহিদা ১৫০ কোটি লিটার ছাড়িয়ে যাবে, যা বার্ষিক ৬০ টিএমসি-রও বেশি।
ভারতের ডেটা সেন্টারগুলির ক্ষমতা ২০২০ সালের ৫২০ মেগাওয়াট থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ১.৫ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৪.৫-৬.৫ গিগাওয়াটে পৌঁছাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই খাতে ২০১৯-২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ৯৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রতিশ্রুত হয়েছে, যা ২০২৭ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কিন্তু এই দ্রুত বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুৎ ও জলের চাহিদা। ভারতের বিদ্যুৎ মন্ত্রকের অনুমান, শুধুমাত্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অতি উৎপাদনের কারণে ২০৩১-৩২ সালের মধ্যে ২৬.৩ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদা নতুন করে তৈরি হবে।
বিশাখাপত্তনমের গুগল ডেটা সেন্টার প্রকল্পটি ডিজিটাল ভারতের আকাঙ্ক্ষা এবং পরিবেশগত সুরক্ষার মধ্যে, একটি জটিল অসাম্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একদিকে, এই প্রকল্পটি বিপুল বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি করতেই পারে; অন্যদিকে, এই প্রকল্পটি স্থানীয় জলসংকট ও জীববৈচিত্র্যের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। সরকার ও শিল্পপতিদের উচিত পরিবেশগত প্রভাবের মূল্যায়নকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়া এবং স্থানীয় জনগণের উদ্বেগের সুষ্ঠ সমাধান করা। কারণ, আপেক্ষিক প্রাণ-প্রকৃতিবিনাশী উন্নয়নের চেয়ে, দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নই প্রকৃত উন্নয়নের রূপরেখা হতে পারে।






