মমতায় না, নবীনে হ্যাঁ! কেন এই দুমুখো নীতি বিজেপির?

আশার আলো থাকলেও ভয় কাটছে না, ভরসাও পাচ্ছে না বিজেপি। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে 'না' বললেও নবীন পট্টনায়েকে 'হ্যাঁ' বলতেই হলো কেন্দ্রকে। লঘু বাংলায় একেই বলে 'ভন্ডামি', একটু ভালো ভাষায় 'দ্বিচারিতা'।

আসলে ভোট বড় বালাই। ভোটের জন্য সব কিছুই 'জায়েজ'। টানা ৮ বছর ক্ষমতায় আছে বিজেপি। এই মুহূর্তে দেশের ১২ রাজ্যে সরাসরি ক্ষমতায় আছে বিজেপি। অন্য দলের সঙ্গে জোট গড়ে বিজেপি সরকারে আছে আরও ৬ রাজ্যে। পক্ষান্তরে কংগ্রেস, তৃণমূল, আপ, বিজেডি, সিপিএম, টিআরএস, শিবসেনা, ওয়াইএসআর ইত্যাদি বিরোধী দলগুলির হাতে ১২ রাজ্য। সরল পাটিগণিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজেপি-মনোনীত প্রার্থীর হারার কথা নয়। তবুও ভয় কাটছে না মোদি-শাহর। আর এই ভয় কাটাতে সংকীর্ণ মানসিকতা প্রদর্শনেও তাই পিছপা হয়নি বিজেপি তথা কেন্দ্র।

২০২১-এ রোমে অনুষ্ঠিত বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মুখ্যমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন Comunita di Sant’Egidio বা 'কমুনিতা দি সান্তেএজিদিও' সংস্থা‌‌‌। বাংলার মুখ্যমন্ত্রীকে পাঠানো ওই সংস্থার সভাপতি মার্কো ইমপ্যাগলিয়াজো-র আমন্ত্রণপত্রে সামাজিক ক্ষেত্রে মমতার অবদানের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছিল, "বিগত ১০ বছর সাধারণ মানুষের সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়নের জন্য যে কাজ আপনি করে যাচ্ছেন তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।" পাশাপাশি নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়ে তৃতীয়বারের জন্য বাংলার শাসন ক্ষমতায় আসার জন্য মমতাকে অভিনন্দনও জানান ওই সংস্থার সভাপতি।

আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার বাঁচাতেই নুপুর-ইস্যুতে নীরব মোদি? জানুন আসল কারণ

এই Comunita di Sant’Egidio সংস্থাটি মূলত সমাজের প্রান্তিক মানুষের জন্য কাজ করে। ১৯৮৭ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্মেলনেরও আয়োজন করে তারা। ২০২১-এর শান্তি বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশাপাশি আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল পোপ ফ্রান্সিস, জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলো মার্কেল-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্বকে। গত বছরের ৬ এবং ৭ অক্টোবর রোমে এই কর্মসূচি আয়োজিত হয়। দু'দিনের সম্মেলনেই মুখ্যমন্ত্রীকে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছিল।

ভারত সরকারের অনুমতি ছাড়া এই ধরনের কোনও সম্মেলনে দেশের কোনও মুখ্যমন্ত্রী অংশ নিতে পারেন না‌। নবান্নের তরফে দিল্লির কাছে অনুমতিও চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেদিন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রোম সফরের অনুমতি দেয়নি কেন্দ্র। ২০২১-এর ২৪ সেপ্টেম্বর বিদেশ মন্ত্রকের তরফে চিঠি দিয়ে জানানো হয়, রোম থেকে যে কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ পেয়েছেন, সেখানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অংশ নেওয়া সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ওই অনুষ্ঠান অনেক বড় মাপের। সেখানে ভারতের কোনও রাষ্ট্রনেতার পরিবর্তে একটি অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর যাওয়া বেমানান। এই অযৌক্তিক কারণ দেখিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর রোম সফরের অনুমতি সেদিন দেয়নি কেন্দ্র। এর ফলে দেশের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পোপের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সুযোগ পাননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মোদি সরকারের এই মনোভাবকে ‘প্রতিহিংসামূলক আচরণ’ চিহ্নিত করে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরবও হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বলেছিলেন, "কতগুলি জায়গায় আটকাবেন আমাকে? চিরকাল এভাবে আমাকে আটকাতে পারবেন না।"

কিন্তু যেসব কারণ দেখিয়ে সেদিন মমতার রোম সফরে আপত্তি জানিয়েছিল কেন্দ্র, এবার আর সেই সব কারণকে বিবেচনায় না এনে একবাক্যে ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়েকের সফরে ছাড়পত্র দিয়েছে মোদির সরকার। কেন্দ্রের তরফে বলা হচ্ছে, নবীন পট্টনায়েক ওড়িশায় শিল্প আনতে ওখানকার শিল্পকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে যাচ্ছেন। তারপর ব্যক্তিগত সফরে তিনি ভ্যাটিকানে যাবেন। এতে আপত্তির কিছু নেই। যুক্তি যাই-ই হোক, এর ফলে আরও একবার স্পষ্ট হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের ভন্ডামি, সামনে এসেছে সরকারের দু'মুখো নীতি। একই সঙ্গে জাতীয় স্তরে নানা প্রশ্নও উঠছে‌।

আগামী ২৪ জুলাই মেয়াদ শেষ হচ্ছে ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের। পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন, তাই নিয়ে জল্পনাও চলছে জাতীয় স্তরে। হিসেবে দেখা যাচ্ছে, এই মুহূর্তে এককভাবে বা জোট গড়ে যতগুলি রাজ্যে সরকার চালাচ্ছে বিজেপি, সেসব রাজ্যের ভোট একত্র করেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ভোট কিছু কম রয়েছে বিজেপি তথা এনডিএ-র হাতে। উত্তরপ্রদেশে এবার বিজেপির বিধায়ক কমেছে। ২০১৭ সালের চেয়ে অনেক বেশি আসন পেয়েছে সমাজবাদী পার্টি। পাঞ্জাবেও বিজেপি-বিরোধী বিধায়কই বেশি। মহারাষ্ট্রেও একই ছবি। তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে সার্বিকভাবে বেশ খানিকটাই চাপেই রয়েছে বিজেপি। ওদিকে শোনা যাচ্ছে, বিজেপি-বিরোধী শিবির এমন কাউকে প্রার্থী করতে চাইছে, যাতে ওড়িশার নবীন পট্টনায়েকের বিজু জনতা দল এবং অন্ধ্রপ্রদেশের জগন্মোহন রেড্ডির দল ওয়াইএসআরসিপি-র সমর্থন মেলে। এমন ভাবনা থাকলেও বাস্তবে এই দুই দলের সমর্থন বিজেপির বিরুদ্ধে সম্ভবত যাবে না। শোনা যাচ্ছে, নবীন পট্টনায়েক এবং জগন্মোহন রেড্ডি, দু'জনই মোদি এবং শাহ-কে নাকি কথা দিয়েছেন, এনডিএ-র প্রার্থীকেই তাঁদের দল ভোট দেবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ইলেক্টোরাল কলেজে বিজেডির বেশ ভালোই ‘নম্বর’ রয়েছে।

বিরোধী শিবিরের বক্তব্য, এইসব অঙ্ক মাথায় রেখেই বিজেপি এবং কেন্দ্রীয় সরকার তুষ্ট রাখতে চাইছে নবীন পট্টনায়েককে। নবীনকে খুশি করার জন্যই তাঁর রোম সফরে এক কথায় সবুজ সংকেত দিয়েছেন মোদি-শাহ। কেন্দ্রের এই উদারতার পিছনে নিশ্চিতভাবেই কৌশলী রাজনৈতিক ছক রয়েছে।

আর সেই ছক আর গোপন রইল না। ফের খুলে গেল বিজেপির মুখোশ। আরও একবার প্রকাশ্যে এল গেরুয়া শিবিরের সংকীর্ণ মানসিকতার ছবি।

More Articles

;