শিকলে বাঁধা দেবী, ডাকাতদের আরাধ্যা! দক্ষিণ কলকাতার চেতলার ডাকাত কালীর ইতিহাস
Dakat Kali: দক্ষিণ কলকাতার চেতলায় রয়েছে রহস্যে মোড়া প্রাচীন ডাকাত কালীবাড়ি। লোককথা অনুযায়ী, একসময় ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে এই মন্দিরে পুজো দিত দস্যুরা। লুটের সম্পদও নিবেদন করত দেবীর চরণে। কিন্তু কেন শিকলে বাঁধা রয়েছে দেবীমূর্তি? নীলু-ভুলু ডাকাতের কাহিনি থেকে সারদা দেবীর আগমন—জানুন এই মন্দিরের ইতিহাস।
ডাকাতদের সঙ্গে কালীর সম্পর্ক সেই কোন আদ্যিকালের। তারপর টালা হোক বা টালিনালা, কত জল বয়ে গেছে, সেই ডাকাতের দল, তার প্রতিপত্তি আজ অস্তাচলে৷ তবে কালীমন্দিরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে সেই ইতিহাসের অনুষঙ্গ। যেমন চেতলার ডাকাত কালীবাড়ি। শোনা যায়, একসময় এই মন্দিরে পুজো দিয়েই ডাকাতি করতে বেরোত দস্যুরা। ডাকাতি করে ফিরে লুটের সামগ্রীও নাকি দেবীর চরণে নিবেদন করত তারা। শুধু তাই নয়, এই মন্দিরের দেবীমূর্তিকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার পিছনেও রয়েছে এক অদ্ভুত লোককথা।
জলা-জঙ্গল ঘেরা চেতলার অতীত
আজকের চেতলা এলাকায় একসময় ছিল ঘন জঙ্গল, জলাভূমি এবং ফাঁকা জমি। তখন দক্ষিণ কলকাতার এই অংশে জনবসতি ছিল অনেক কম। আদি গঙ্গার পথ ধরে চলত নৌ-বাণিজ্য এবং তীর্থযাত্রীদের যাতায়াত। সেই নদীপথকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জায়গায় গড়ে উঠেছিল দস্যু ও ডাকাতদের আস্তানা। নির্জন রাস্তা এবং জঙ্গলের সুযোগ নিয়ে তারা পথচলতি মানুষ ও নৌযাত্রীদের লুট করত বলে প্রচলিত রয়েছে।
সেই সময় চেতলা অঞ্চলের ডাকাতদের মধ্যে মা কালীর উপাসনার প্রচলন ছিল বলে লোকমুখে শোনা যায়। বড় কোনও অভিযানে যাওয়ার আগে তারা দেবীর কাছে পুজো দিত। ডাকাতি করে ফিরে লুট করা সম্পদ দেবীর পায়ে নিবেদন করত। কথিত আছে, বিশেষ তিথিতে দেবীর সামনে বলিও দেওয়া হত। এমনকি নরবলির কাহিনিও এই মন্দিরকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে। সেই ডাকাতদের আরাধ্যা দেবী হিসেবেই কালী পরিচিতি পান ‘ডাকাত কালী’ নামে। যদিও এই ঘটনাগুলির সবকটির ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না, এগুলি মূলত স্থানীয় জনশ্রুতি ও লোককথার অংশ।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Dhaka Kalibari: দেশভাগের পর বরিশাল থেকে কলকাতায় এসে নিজের শিকড়ের স্মৃতি ধরে রাখতে মন্দির গড়ে তুলেছিলেন ননীগোপাল চক্রবর্তী। দক্ষিণ কলকাতার প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের এই মন্দিরই আজ পরিচিত ঢাকা কালীবাড়ি নামে। মাটির প্রতিমা থেকে কষ্টিপাথরের বিগ্রহ, কালীপুজোর বিশেষ ভোগ—মন্দিরটির ইতিহাসে মিশে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস ও দেশভাগের স্মৃতি। কী ভাবে?
নীলু ও ভুলু ডাকাতের কাহিনি
চেতলার ডাকাত কালীবাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নীলু ও ভুলু নামে দুই কুখ্যাত ডাকাত সর্দারের নাম। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, তারকেশ্বর অঞ্চলের এই দুই ডাকাত সর্দার ছিল দেবীর প্রধান উপাসক। ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে তারা মন্দিরে এসে দেবীর কাছে প্রার্থনা করত। অভিযান থেকে ফিরে লুট করা ধনসম্পদের একাংশ দেবীর চরণে উৎসর্গ করত বলেও শোনা যায়।
সেই সময় ডাকাতদের কাছে দেবী কালী ছিলেন শক্তি ও সাহসের প্রতীক। কোনও বিপদে পড়লে তারা দেবীর কাছেই আশ্রয় চাইতেন। তাদের বিশ্বাস ছিল, দেবীর আশীর্বাদ সঙ্গে থাকলে কোনও অভিযানে বাধা আসবে না।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Boroma Kali at Barddhaman : কথিত আছে, শাঁখারিকে ডেকে বালিকাবেশে শাঁখা পরেছিলেন দেবী, আজও রহস্যে ঘেরা বর্ধমানের বড়মা
কেন শিকলে বাঁধা দেবীমূর্তি?
ডাকাত কালীবাড়ির অন্যতম আকর্ষণ হল দেবী কালীর শিকলে বাঁধা মূর্তি। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, দেবী অত্যন্ত চঞ্চলা। একসময় নাকি মন্দিরের ভিতরে নিজের নির্দিষ্ট জায়গা থেকে সরে যেতেন তিনি। বারবার এমন ঘটনা ঘটতে থাকায় দেবীকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। সেই থেকেই দেবীমূর্তিকে শিকলে বাঁধা রাখার রীতি চলে আসছে বলে বিশ্বাস করেন স্থানীয় মানুষ।
সারদা দেবীকে ঘিরে আর এক কাহিনি
এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সারদা দেবীর নামও। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, একবার সারদা দেবী এই মন্দিরে এসেছিলেন এবং কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থান করেছিলেন। কিন্তু স্থানীয় মানুষ প্রথমে তাঁকে চিনতে পারেননি। তাঁকে আটকে রাখা হয়েছিল বলেও লোককথায় উল্লেখ রয়েছে। পরে তাঁর প্রকৃত পরিচয় জানার পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনার পর মন্দিরের পরিচিতি আরও ছড়িয়ে পড়ে বলে মনে করা হয়।
কালীপুজোয় বিশেষ আয়োজন
প্রতিবছর দীপাবলির অমাবস্যায় মন্দিরে বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয়। পুজোর রাতে মন্দির চত্বরে ভক্তদের ভিড় জমে। ধূপ-ধুনো, ঘণ্টা ও শঙ্খধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নন, কলকাতার বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও বহু মানুষ দেবীর দর্শনে আসেন।







