তিনি ভারতীয় না কি পাকিস্তানি, উত্তর খুঁজছেন পদ্মিনী

ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্কের দ্বৈরথে নাগরিকত্ব নিয়ে জটিলতা বা বিভাজনের শিকার বহু পরিবার। কোন পথে এর সমাধান, তারই অপেক্ষায় দিন গুনছেন পদ্মিনী ও তাঁর মতো আরও অনেকে।

Aritra Dasgupta
৩ মিনিট
তিনি ভারতীয় না কি পাকিস্তানি, উত্তর খুঁজছেন পদ্মিনী

২০১৯-এ ভারত সরকার নিয়ে এসেছিল ভারতীয় নাগরিকত্ব সংশোধন আইন। যে আইন নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্কের ঝড় উঠেছিল। ২০১৯-এর এনআরসি-সিএএ আইনে বলা হয়েছিল, ভারতরাষ্ট্রের বাইরে বসবাসকারী বিপন্ন উদ্বাস্তু হিন্দুরা ভারত সরকারের কাছে নাগরিকত্বের আবেদন জানালে তা মঞ্জুর করবে কেন্দ্রীয় সরকার। সেই আইনে কোনও ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষকে নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়ে কোনও উল্লেখ ছিল না। বিজেপি সরকারের আমলে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ক্রম অবনতি, কেন্দ্রীয় সরকারের ইসলাম-বিরোধী মনোভাবের কারণে সেই সময়ে রাজপথে নেমেছিল গোটা নাগরিক সমাজ। সেই আন্দোলনে উল্লেখযোগ্যভাবে সামনের সারিতে উঠে এসেছিল মুসলিম মেয়েরা। দিল্লির শাহিনবাগ, কলকাতার পার্ক সার্কাসে মুসলিম মহিলারা নিজেদের নাগরিকত্বের দাবিতে সরব হয়ে অবস্থানে বসেছিলেন।

নাগরিকত্ব আইনের ক্ষেত্রে যে-কোনও দেশেই সবথেকে বেশি জটিলতা তৈরি হয় মহিলাদের ক্ষেত্রেই। জন্ম থেকে বিবাহ বা স্বামীর বদলি- একাধিক কারণে মেয়েদের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব প্রমাণের নির্দিষ্ট কাগজপত্র দেখানো সবক্ষেত্রে সম্ভব হয়ে ওঠে না।

নাগরিকত্ব নিয়ে এমনই এক জটিলতার শিকার হয়েছিলেন রাজস্থানের জয়পুরের বিখ্যাত কানোটা পরিবারের পদ্মিনী রাঠোর। ২০১৫ সালে পাঞ্জাবের সিন্ধ প্রদেশের আরেক খানদানি পরিবারের ছেলে কানওয়ার কারনি সিং সোধাকে বিয়ে করেন। সেসময় একাধিক সংবাদপত্রের শিরোনামে উঠে এসেছিল পাকিস্তানি ছেলের সঙ্গে ভারতীয় মেয়ের বিয়ের সেই দৃশ্য। বিয়ের পর প্রায় ৭ বছর ধরে ক্রমাগত ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রকের আধিকারিকদের কাছে দরবার করে যেতে হয়েছে পদ্মিনীকে। যখনই বর্ডার পেরনোর দরকার পড়েছে, তখনই ভারতীয় সরকারের তরফে নানা জটিলতার প্রসঙ্গ এনে বিষয়টিকে ফেলে রাখা হয়েছে। বিবাহসূত্রেই ভারতীয় নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানের নাগরিকত্বর জন্য আবেদন করেছিলেন পদ্মিনী। ভারতীয় আইনে কোনও ব্যক্তি একইসঙ্গে দুই দেশের নাগরিকত্ব পেতে পারেন না। সেইখান থেকেই পদ্মিনীর সমস্যার শুরু।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গারদের অন্ধকারে চূড়ান্ত নৃশংসতা, ভয়াবহ ইঙ্গিত দিচ্ছে ভারতে বন্দিমৃত্যুর খতিয়ান

গরাদের অন্ধকারের পিছনে মৃত্যুমিছিলের খতিয়ান পেশ করল সরকার। কারণ জেল হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় শীর্ষে উত্তরপ্রদেশ, এবং তার পরেই পশ্চিমবঙ্গ।

পদ্মিনী-র কথায়, "আমি ২০১৫ সালে কানওয়ার কারনি সিংকে বিয়ে করেছি। আমাদের পাঁচ বছরের একটা ছেলে আছে। তারও পাকিস্তানের পাসপোর্ট আছে। আমাদের পরিবারে আমিই একমাত্র, যার এখনও অবধি পাকিস্তানি পাসপোর্ট নেই। এই কারণেই পাকিস্তানের ভেতর এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় আমি যাতায়াত করতে পারি না। আমি এখনও ভারতীয় নাগরিক হওয়ার কারণে পাকিস্তানের এক শহর থেকে অন‍্য শহরে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমার ভিসার প্রয়োজন হয়। সেই ভিসা করাতেই ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগে, যা আমাদের জন্য খুবই সমস্যার।"

শেষ কয়েক বছরের বিভিন্ন ঘটনা ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও জটিল করেছে। পদ্মিনী রাঠোরের মতে, "২০১৯-এর পুলওয়ামায় বিস্ফোরণের ঘটনার আগে পাকিস্তানে যাওয়ার ক্ষেত্রে চারবার অনুমোদন দিত পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রক। কিন্তু পুলওয়ামার ঘটনার পর থেকে বছরে সেই অনুমতি দুইবার মেলে। এই পরিস্থিতিতে আমার পক্ষে পাকিস্তানে যাওয়া খুবই সমস্যার বিষয় হয়ে উঠেছে।"

শুধুমাত্র যাওয়া-আসার সমস্যা নয়, আর্থিক বিভিন্ন সমস্যাও তৈরি হয় এই জটিলতা থেকে। পদ্মিনী যেহেতু পাকিস্তানের নাগরিকত্ব পাননি, তাঁর পক্ষে কোনওভাবেই নিজের নামে পাকিস্তানে জমি কেনা সম্ভব নয়। ভারতের নাগরিকত্বর নথি আধারের মতোই পাকিস্তান সরকারও কম্পিউটারাইজড ন্যাশনাল আইডেন্টিটি কার্ড দেয় নাগরিকদের। সেই কার্ড না থাকলে পাকিস্তানেও কোনও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা যায় না। কিন্তু কিছু বছর আগেও দু'দেশের নাগরিকত্ব নিয়ে এতখানি জটিলতা ছিল না। পদ্মিনীর স্বামী পাকিস্তানের বাসিন্দা কানওয়ার কারনি সিংয়ের পরিবারের বেশিরভাগ মহিলাই ভারতীয়। বিবাহসূত্রে তাঁরা পাকিস্তানের নাগরিক হওয়ার আবেদন জানিয়েছিলেন। সেই সময় তাঁদের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব পেতে কোনও রকমের অসুবিধেই হয়নি। এই প্রসঙ্গে পদ্মিনী অনুমান করেন, "ভারত-পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সময়ের অস্থির সম্পর্কই এত দ্বিপাক্ষিক জটিলতা তৈরি করেছে। জম্মু ও কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বাতিল, বালাকোট এয়ারস্ট্রাইক, পুলওয়ামায় জঙ্গি হামলা একাধিক কারণে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক খারাপ হয়েছে।"

আবার নাগরিকত্ব নিয়ে অন্য রকম অভিজ্ঞতা হয়েছে ৪৬ বছর বয়সি সামিরা ইজলালের। ১৯৯৯ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর পরেই নাগরিকত্বর জন্য আবেদন করেন সামিরা। সামিরার কথায়, "১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে আমাদের বিয়ে হয়। ডিসেম্বরের মধ্যেই আমি পাকিস্তানের নাগরিকত্ব পেয়ে গিয়েছিলাম। এরকম অভিজ্ঞতা সাধারণত কমই হয়। আবেদন করে বছরের পর বছর বসে থাকতে হয় কিন্তু ভাগ্যক্রমে আমার ক্ষেত্রে ৯ মাসেই বিষয়টা মিটে গিয়েছিল।" আবার পাকিস্তানের নাগরিকত্ব সামিরার ক্ষেত্রেই অনেক সমস্যা তৈরি করেছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে পারিবারিক একটি বিয়েতে যোগ দিতে সপরিবারে ভারতে আসেন সামিরা। লখনউ, হায়দরাবাদ এবং দিল্লির ভিসার জন্য আবেদন করেছিলেন তাঁরা। ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রকের তরফে কেবল লখনউ ও হায়দরাবাদের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। সামিরার ধারণা প্রজাতান্ত্রিক দিবসের নিরাপত্তার কথা ভেবেই তাঁদের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্কের দ্বৈরথে নাগরিকত্ব নিয়ে জটিলতা বা বিভাজনের শিকার বহু পরিবার। কোন পথে এর সমাধান, তারই অপেক্ষায় দিন গুনছেন পদ্মিনী ও তাঁর মতো আরও অনেকে।

লিখেছেন
Aritra Dasgupta
Aritra Dasgupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।

কেন মিডটার্ম নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

US Midterm Elections 2026: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা। কেন ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা

US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।

রামলীলার পর কী? কী করবেন বিরোধীরা?

INDIA bloc Unity Under strain: ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ২১ দল একজোট হলেও মঞ্চ শেষেই ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট। বাম নেতাদের বক্তৃতায় প্রাধান্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় ভূমিকা’র সতর্কবার্তা। প্রিয়াঙ্কা, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত বক্তৃতার সুযোগ না পাওয়ায় শরিক-অসন্তোষ।

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?

US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।