সংসদে উচ্চারণ করা যাবে না..., বিরোধীদের কণ্ঠরোধ? তুমুল শোরগোল

সংসদের স্বঘোষিত `ডিকশনারি’ থেকে বাদ গেল অনেক শব্দ। তাহলে সাংসদরা এখন কী কী শব্দ ব্যবহার করবেন, তা এখানে বলা হয়নি। বিরোধীরা বলছে, সরকার নিজেদের সমালোচনা শুনতে চায় না।

tiasa gupta
৪ মিনিট
সংসদে উচ্চারণ করা যাবে না..., বিরোধীদের কণ্ঠরোধ? তুমুল শোরগোল

খুব বেশিদিন আগের ঘটনা নয়। সালটা ২০১৮। তখনও সংসদে বাদল অধিবেশন চলছে। রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, "আপনি আমাকে পাপ্পু বলতে পারেন, কিন্তু আমি আপনাকে ঘৃণা করি না।" রাহুলের এই কথার মধ্যে যন্ত্রণা কতটা ছিল, তা তিনিই বলতে পারবেন, তবে ছিল এক প্রচ্ছন্ন ভাষা-সন্ত্রাসে মদত দেওয়ার প্রতি তীক্ষ্ণ জবাব। সংসদের ভেতরে এবং বাইরে বারবার রাহুলকে বিরোধীরা (কখনও কংগ্রেসও) আক্রমণ করতে ব্যবহার করেছেন 'পাপ্পু’ শব্দ। দেখা গেছে, এই ধারার বাহক অমিত শাহও। এই প্রবণতা বন্ধ করতে এবার পদক্ষেপ করল সংসদ। তবে সংসদের নতুন ভাষাবিধিতে `পাপ্পু’ যে ঠাঁই পায়নি, তা বলাই বাহুল্য। যদি কিছু কিছু শব্দে লাগাম পড়ানো হয়ে থাকে, তাহলে বিরোধীদের এভাবে ভাষা চয়ন করে ব্যক্তিগত আক্রমণে কেন লাগাম পড়ানো হলো না? কেন শুধুমাত্র মোদিকে বাঁচানোর চেষ্টা দেখল দেশ?

চলুন দেখে নেওয়া যাক, কোন কোন শব্দে লাগাম পড়ানো হল।

এই দেশে কোনটা শালীন, কোনটা অশালীন- এই নিয়ে বিতর্ক বহু দিনের। শালীনতা-ভঙ্গের অভিযোগে মামলা-মোকদ্দমাও কম হয়নি। সাহিত্যিক সমরেশ বসুর দুই উপন্যাস 'বিবর’ ও 'প্রজাপতি’ শালীন না অশালীন, তা নিয়ে বিতর্কের জল গড়িয়েছে অনেক দূর। শেষ ‌পর্যন্ত দীর্ঘ ১৭ বছর বিতর্ক চলার পর সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল `প্রজাপতি’ উপন্যাস অশ্লীল নয়। শালীনতার সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষমতা ও অধিকার কার, সেই বিতর্ক আজও অমীমাংসিত। সংসদের ভেতরে ভাষা সন্ত্রাসের অভিযোগ বহুদিনের। তাই কি বাদল অধিবেশনের আগে এই লাগাম?

সংসদে বাদল অধিবেশন শুরু হবে ১৮ জুলাই। এদিন লোকসভার সচিবালয় একটি বই প্রকাশ করেছে, তাতে ৬৫টি নতুন শব্দ রয়েছে, যেগুলো এখন থেকে অসংসদীয় বলে গ্রাহ্য করা হবে। তালিকায় চোখ বোলালে চোখ কপালে উঠতে পারে, কেন?

সংসদকক্ষে কোনও মন্ত্রীকে `অহংকারী’ বলা যাবে না। জনতা 'নির্যাতিত’ হচ্ছে বলা যাবে না। সরকার বা প্রধানমন্ত্রীকে 'নৈরাজ্যবাদী’ বলে অবিহিত করা যাবে না। ব্যবহার করা যাবে না 'অপমান’ ও 'লজ্জিত’ শব্দও। সাংসদরা এতদিন কারও বিরুদ্ধে মিথ্যে বলার অভিযোগ আনতে পারতেন, এবার আর তা চলবে না। কারণ নয়া ভাষাবিধি থেকে বাদ `লাই’ শব্দটা। এই নতুন বিধিতে লাইয়ের পাশাপাশি `অসত্য’ শব্দকেও জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

চালু বেশ কিছু শব্দের মুখ আগল পড়াল সংসদ। এর মধ্যে বিদেশি শব্দও আছে। যেমন, চামচা, চামচাগিরি, চেলা, বেচারা, বেহরি (বয়রা), বাল (শিশুসুলভ) বুদ্ধি, ঢিনঢোরা পিটোনো, গদ্দার। তালিকায় দেদার ঢোকানো হয়েছে ইংরেজি শব্দ। যা এতদিন সাংসদরা অবাধে ব্যবহার করে এসেছেন। আর চলবে না ড্রামা, আইওয়াশ, হিপোক্রেসি বা সেক্সুয়াল হ‍্যারাসমেন্ট। 'নিকম্মা’ বলা যাবে না (তা সরকার যতই নিকম্মা হোক না কেন), বিকল্প কী, কে জানে?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নতুন অশোক স্তম্ভ ঘিরে দেশজুড়ে বিতর্ক, যে শিল্পী বানালেন এই মূর্তি

নতুন অশোক স্তম্ভ, যা জাতীয় প্রতীক হিসেবে পরিচিত, তার নকশা, ভাস্কর্য এবং ইনস্টলেশনের দায়িত্বে ছিলেন লক্ষ্মণ এবং তাঁর দল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সংসদ ভবনে জাতীয় প্রতীক উন্মোচনের সময় শিল্পী লক্ষ্মণকে অভিনন্দন জানান।

সংসদে এবার থেকে আর চলবে না 'নৌটঙ্কি’। আচ্ছে দিনের স্লোগান বাস্তবায়িত হোক বা না হোক, `কালা দিন’ শব্দ ব্যবহার করা যাবে না। ব্যবহার করা যাবে না কালোবাজারিও।

এতে কি মোদির বিরুদ্ধ স্বর রুদ্ধ?

সাংসদদের বাকস্বাধীনতা থেকে এই শব্দগুলো বাদ গেলে ঠিক কী সুবিধা হতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে রাজনৈতিক মহলে। সামনেই বাদল অধিবেশন। কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে, বহুবার সাংসদরা প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে বেশ কিছু শব্দ প্রয়োগ করেছেন। এবারও তাঁকে আক্রমণের ঝাঁঝ বাড়াতে এই সব শব্দবন্ধনী প্রয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। সেই আঁচ কি পেয়েছেন মোদি? অধিবেশন চলাকালীন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা সাংসদদের আওয়াজকে লাগাম দিতেই বলা যাবে না এইসব শব্দ! তা নিয়ে আলোচনা চলছে গরমাগরম।

সংসদের ভেতর এবং বাইরে প্রধানমন্ত্রীকে আক্রমণ করতে বিভিন্ন সময় বিরোধীরা তাঁর `নাটক’ করা নিয়ে খোঁচা দিয়ে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী নাটক করুন বা না করুন, বিরোধীরা যাতে তাঁকে `নাটুকে’ বলতে না পারে তাই কি এই আয়োজন!

ফলে এখন সংসদে মোদি বিরোধিতা রুখতে `নাটক’ নৈব নৈব চ।

সরব সমাজ

১৩ জুলাই বেশ কিছু শব্দ অসংসদীয় হিসেবে ঘোষণা করেছে লোকসভার সচিবালয়। বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে আক্রমণ করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন টুইট করে বলেছেন, "মৌলিক শব্দ আমি ব্যবহার করব। আমাকে সাসপেন্ড করুন। গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করব।" তিনি আরও লেখেন, কয়েক দিনের মধ্যে সংসদের অধিবেশন শুরু হবে। সাংসদদের ওপর হাস্যকর নির্দেশিকা জারি করা হলো। এই তালিকায় আছে, লজ্জাজনক, নির্যাতন, অযোগ্য ভণ্ডামির মতো একাধিক শব্দ। এই সবগুলো প্রায় সাংসদরা ব্যবহার করে থাকেন।

সংসদের ভাষা নির্দেশিকা নিয়ে ভাষাবিদ পবিত্র সরকার বলেছেন, বিরোধীদের সরকারের সমালোচনা করার অধিকার গণতন্ত্রে স্বীকৃত। সমালোচনার ভাষার মধ্যে থাকবে আক্রমণ। শুধু থাকবে না নিম্ন রুচি। কোনটা শোভন, কোনটা অশোভন, কোনও সংসদীয়, কোনটা অসংসদীয়– তা ঠিক করুক আদালত। এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন পবিত্র সরকার।

শিক্ষাবিদ নৃশিংসপ্রসাদ ভাদুড়ির প্রশ্ন, আমার তো বাক স্বাধীনতা রয়েছে। শব্দগুলো হঠাৎ করে কী দোষ করে ফেলল? আমাদের এই সব শব্দরাশির উৎস সরস্বতী। সব শব্দই তাঁর। কার অধিকার আছে তাতে লাগাম টানার?

সংসদের স্বঘোষিত `ডিকশনারি’ থেকে বাদ গেল অনেক শব্দ। তাহলে সাংসদরা এখন কী কী শব্দ ব্যবহার করবেন, তা এখানে বলা হয়নি। বিরোধীরা বলছে, সরকার নিজেদের সমালোচনা শুনতে চায় না। তাই বেছে বেছে কতগুলি শব্দে লাগাম পড়ানো হল। এর পিছনের যুক্তি অবশ্যই পরিষ্কার নয়। সংসদ গণতন্ত্রের পীঠস্থান। এখানে কোনও ইস্যু নিয়ে সরকার-বিরোধী তরজা হবে, এটাই তো দস্তুর। আর শালীন, অশালীনের মধ্যে সীমারেখা কীভাবে এক্ষেত্রে টানা হলো, তা জানতে চাইবে দেশ। সংসদে যদি সাংসদদের মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে যে আগামীদিনে দেশ এক নির্বাক সংসদ উপহার পাবে, তা বলাই বাহুল্য। এর পরিণতি কোথায় গিয়ে ঠেকতে পারে?

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? সরকার বদলায়, কেন বদলায় না মন?

Rabindranath Tagore Targeted in Bangladesh: বাংলাদেশে বারবার কেন নিশানা হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? হাসিনা থেকে ইউনূস, সরকার বদলালেও কেন থামছে না তাঁর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার মুছে ফেলার চেষ্টা? জাতীয় সঙ্গীতের স্রষ্টাকেই কেন বারবার প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়তে হচ্ছে?

যন্তর মন্তরে ঢুকে বিক্ষোভ, পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে সিজেপি-র দুই নেতা

Jantar Mantar protest: যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের জেরে সিজেপি নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠাল আদালত। নির্বাচন কমিশন, এসআইআর এবং প্রতিবাদের অধিকার ঘিরে বাড়ছে বিতর্ক।

দিল্লিতে মহিলা বিক্ষোভকারীদের হেনস্থার অভিযোগ, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে উঠছে যে সব প্রশ্ন

Delhi protest: দিল্লিতে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ ঘিরে মহিলা আন্দোলনকারীদের একাংশ পুলিশের বিরুদ্ধে হেনস্থা ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন। এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা ও প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন।

২৩ দিনের অনশন থেকে জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন, রাজপথই নেহা বোরার হয়ে ওঠার সাক্ষী

Neha Bora: ২৩ দিন ধরে অনশন করে যেমন তিনি সংবাদমাধ্যমের নজরে এসেছিলেন, তেমনই সম্প্রতি দিল্লির রাজপথে পুলিশের বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও তাঁকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।

বরফের গভীরে নিউট্রিনোর খোঁজ: মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে এবারের পদার্থবিদ্যায় নোবেল

IceCube Neutrino Observatory: অ্যান্টার্কটিকার বরফের গভীরে কীভাবে কাজ করে আইসকিউব টেলিস্কোপ? কীভাবে অদৃশ্য নিউট্রিনো কণার সংকেত ধরে কৃষ্ণগহ্বর, ব্ল্যাজার এবং মহাবিশ্বের গভীর রহস্য উন্মোচন করছেন বিজ্ঞানীরা?

ইন্ডিয়া জোটের মিছিলে বাধা, সুপ্রিম কোর্টে দায়ের হলো রিট

INDIA bloc's march towards supreme court: সোমবার কনট প্লেস থেকে সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে ইন্ডিয়া ব্লকের ‘চলো দিল্লি’ মিছিল অনুষ্ঠিত হলো। রাহুল গান্ধীর দুই পাশে ছিলেন, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ও নেহা বোরা। মিছিলে অংশ নেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদব, ডি রাজা, সুপ্রিয়া সুলে। ভগবান দাস রোডে মিছিল পুলিশি বাধার সম্মুখীন হয়। শেষমেশ সুপ্রিম কোর্টে ‘রাহুল গান্ধী বনাম নির্বাচন কমিশন অফ ইন্ডিয়া’ নামে একটি রিট পিটিশন দাখিল হয়।