কোর্টে যত ঝড় তুলেছেন বিতর্ক ততই পিছু নিয়েছে, আজও সানিয়া মির্জা মানেই তরজা

প্রতিদিন টেনিস কোর্ট পেরিয়ে সাঁতার শিখতে যেত ছোট্ট একটি মেয়ে। সে বছর গরমের ছুটিতে হাতে খানিকটা বেশি সময় থাকায় মা নিয়ে গেলেন টেনিসের ক্লাসে ভর্তি করাতে। মেয়েটির বয়স তখন মাত্র ছয়। রুগ্ন সেই ছোট মেয়েটিকে দেখে স্যার বলেছিলেন যে এত ছোট বাচ্চাকে ভর্তি নেওয়া সম্ভব নয়। মায়ের জোড়াজুড়িতে প্রায় দু'ঘন্টা অপেক্ষার পর টেনিস অ্যাকাডেমিতে ভর্তি নেওয়া হল সেই ছোট্ট শিশুটিকে। এরপর একমাস বাদে স্যার ফোন করে তাঁর বাবা-মাকে মেয়ের খেলা দেখতে আসার জন্য অনুরোধ করেন এবং জানান এত ছোট মেয়েকে এইভাবে খেলতে তিনি আগে দেখেননি।মাত্র ৮ বছর বয়সেই বিপক্ষের ১৫ বছরের প্রতিদ্বন্দ্বীকে কাঁদিয়ে ছেড়েছিল সেই মেয়ে। তারপর যত সময় পেরিয়েছে ততই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছেন হায়দরাবাদের সেই দামাল টেনিস কন্যা। ছোট সেই মেয়ে ভারত তথা বিশ্বের টেনিস জগতের অন্যতম নক্ষত্র সানিয়া মির্জা। বর্ণময় টেনিস তারকা পেশাগত টেনিস জীবন থেকে এবছরই অবসর নেবেন বলে বুধবার ঘোষণা করেছেন। তাঁর কীর্তি আগামী কয়েক প্রজন্মের ভারতীয় মহিলা টেনিস খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণিত করবে নিঃসন্দেহে। শুধু তাই নয়, সানিয়ার উত্থান ভারতীয় নারীর ক্ষমতায়ণের পথে মাইলফলক বলা চলে।

সানিয়ার জন্ম ১৯৮৬ সালে মুম্বাইয়ে। জন্মের পরই ছোট সানিয়াকে নিয়ে হায়দ্রাবাদে চলে আসেন তাঁর মা বাবা। বাবা পেশায় একজন ক্রীড়া সাংবাদিক ছিলেন। ছোট থেকেই টেনিসের প্রশিক্ষণ শুরু হয় সানিয়ার।একের পর এক ম্যাচ জিতে অল্প সময়েই বিশ্বের নজর আকর্ষণ করে এই মেয়ে।মাত্র ১১ বছর বয়সেই সানিয়া ঠিক করে ফেলেন পেশাদারভাবে টেনিসই খেলবেন ভবিষ্যতে। তবে একসময় ডাক্তার হবেন বলেও ভেবেছিলেন। কিন্তু ভাগ্য বদলাবেন কী করে? হয়ে উঠলেন ভারতীয় টেনিসের তারকা।  ভারতের প্রথম মহিলা টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে গ্র্যান্ড স্ল্যাম জেতার নজির রয়েছে সানিয়ার ঝুলিতে। এক সময় ডাবলসের শীর্ষস্থানেও ছিলেন। সিঙ্গলসে সর্বোচ্চ ২৭ নম্বরে উঠেছিলেন হায়দ্রাবাদের এই টেনিস রূপসী। এশিয়ান গেমস এবং কমনওয়েলথ গেমসেও পদক জিতেছেন তিনি।। ২০১৬ সালে মার্টিনা হিঙ্গিসের সঙ্গে জুটি বেধে শেষ বার অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জিতেছিলেন সানিয়া। কেরিয়ারে ডাবলস এবং মিক্সড ডাবলস মিলিয়ে তিনটি করে মোট ৬টি গ্র্যান্ড স্ল্যাম রয়েছে তাঁর। ।২০১১ সালে ডাবলসে ফরাসি ওপেন জেতেন সানিয়া। সব থেকে বেশি সাফল্য পেয়েছেন মারটিনা হিঙ্গিসের সাথে জুটি বেধে। ২০১৫ সালে টানা ৪৪ টি ম্যাচ জিতেছিলেন হিঙ্গিসের সঙ্গে।

বুধবার অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের প্রথম রাউন্ডে বিদায়ের পরই অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন সানিয়া। তিনি জানিয়েছেন, ‘ আমার নিজের মনে হচ্ছে চোট সেরে উঠতে বেশি সময় নিচ্ছে। শরীরের অবনতি ঘটছে হয়তো বয়সের কারণেই এমনটা হচ্ছে। পাশাপাশি আমার তিন বছরের ছেলের জন্য অনেক রিস্ক হয়ে যাচ্ছে ।টেনিস কোর্টে এটাই আমার শেষ মরশুম’। গত দুই বছর সানিয়াকে নিয়মিত টেনিস কোর্টে দেখা যাচ্ছিল না। ২০১৮ সাল থেকে মাতৃত্বকালীন বিরতি নিয়েছিলেন তিনি। এরপর অতিমারীর কারণে কোর্টে ফেরার সম্ভাবনা আরওই ক্ষীণ হয়ে যায়। শেষ খেতাব জিতেছেন ২০২১ সালের অস্ত্রাভা ওপেনে। তাই সব ভেবেচিন্তেই ২০২২ এর শুরুতেই অবসরের কথা ঘোষণা করলেন সানিয়া।

আরও পড়ুন-কেউ বলে দেবতা, কেউ বলে শয়তান, কেন বিশ্বের সবচেয়ে বিতর্কিত মানুষ এলন মাস্ক

সানিয়ার কেরিয়ার মানে শুধু অনুপ্রেরণার গল্প এমন কিন্তু নয়। পদে পদে বিতর্কের সম্মুখীন হয়েছেন তিনি। একটি তরজা থেকে বেরিয়েছেন তো অন্য তরজা অপেক্ষা করেছে বাড়ির দরজায়।

ছোট পোশাক নিয়ে টিপ্পনী

সানিয়া তাঁর কেরিয়ারের বড় সময় জুড়ে মুসলিম ধর্মীয় গোষ্ঠীর সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছিলেন। ম্যাচের সময় ছোট টেনিস পোশাক পরার জন্য একজন গোঁড়া মুসলিম পণ্ডিত বলেছিলেন যে মহিলাদের টেনিস পোশাক ইসলামের সাথে মানানসই নয়। পরে,অবশ্য চাপের মুখে তিনি মন্তব্য প্রত্যাহার করে বলেন যে তারা কাউকে খেলতে বাধা দেয় না।

ভারতের জাতীয় পতাকাকে অপমান বিতর্ক

২০০৮ সালে তাঁর বিরুদ্ধে মধ্যপ্রদেশের ভোপালে একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় দাবি করা হয় তিনি যে ভাবে জাতীয় পতাকার দিকে পা দিয়ে বসে ছিলেন তাতে তিনি জাতীয় পতাকার অসম্মান করেছেন। জাতীয় সম্মান আইন ১৯৭১ এর ২ ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।

রেশন কার্ডে সানিয়ার মুখ

অন্ধ্রপ্রদেশের ভিজিয়ানা গ্রামে লক্ষ্মী নামক এক মহিলার রেশন কার্ডে সানিয়ার ছবি আসে। দেখা যায় , সানিয়ার মুখ বসানো সেই মহিলাকে ২ টাকা কেজি দরে রেশনে চাল দেওয়া হবে এবং মিলবে স্বাস্থ্য বিমার সুবিধা ও স্থায়ী বসবাসের জায়গা।

হুমকি ফোন

 সানিয়ার জীবনের প্রেম ও পরবর্তীকালে পাকিস্তানি ক্রিকেটার শোয়েব মালিককে বিবাহের কারণে একাধিক বার সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। ২০০৮ সালে ২৮ বছরের ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র মহম্মদ আশরাফ গ্রেপ্তার হন সানিয়াকে ফোনে হুমকি দেবার জন্য।তাঁর দাবি, তিনি সানিয়াকে ভালবাসেন তাই শোহরাবের সাথে বাগদান বাতিল করতে হবে। পরে সেই পড়ুয়া গ্রেপ্তার হন পুলিশের হাতে। কিন্তু পরবর্তীকালে মহম্মদ শোহরাবের সাথে বাগদান বাতিল করেন সানিয়া এবং ২০১৩ সালে পাক ক্রিকেট তারকা শোয়েব মালিকের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। পাকিস্তানের পুত্রবধু হিসেবে একাধিক সময়ে টিপ্পনী শুনতে হয়েছে তাঁকে। তবে লাজুক স্বভাবের এই টেনিসসুন্দরী সব আক্রমণেরই জবাব দিয়েছেন তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিতে।

সানিয়া এবং টেনিস অ্যাসোসিয়েশন

সানিয়া অল ইন্ডিয়া টেনিস অ্যাসোসিয়েশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে তাঁরা সানিয়াকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করছেন লিয়েন্ডার পেজকে খুশি রাখার জন্য। ২০১২ সালে অলিম্পকের মিক্সড ডাবলসে পেজ সানিয়ার সাথে খেলতে চেয়েছিলন কিন্তু সানিয়ার তাতে মত ছিল না। তিনি মহেশ ভূপতির সঙ্গে জুটি বাঁধতে চেয়েছিলেন। ২০১২ সালেই অলিম্পিকে পুরুষদের ডাবলসেও বোপান্না ও ভুপতিও পেজের সঙ্গে জুটি বাঁধতে অস্বীকার করেছিলেন।

তেলেঙ্গানা বিতর্ক

২০১৩ সালের ২৩ শে জুলাই তেলেঙ্গানার বিজেপি নেতা সানিয়ার তেলেঙ্গানার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন সানিয়া পাকিস্তানের ক্রিকেট তারকা শোয়েব মালিকের বিবাহিত স্ত্রী তাই তিনি কীভাবে ভারতের একটি রাজ্যের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হতে পারেন। পাশাপাশি তাঁর ভারতীয় নাগরিকত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

এবছর বাকি টেনিস টুর্নামেন্টে কেমন ফল করবে সানিয়া তাঁর উত্তর দেবে সময়। ভারত দ্বিতীয় কোনো সানিয়া পাবে কিনা তাও অজনা আমাদের। আমরা দর্শকেরা শুধু তাঁর সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা জানাতে পারি ।

More Articles

;