পুষ্করে স্নান করে 'পাপক্ষয়'! বিমান বসুর মন্তব্য বামেদের দ্বিচারিতারই প্রকাশ?
Biman Bose slams Mamata Banerjee : নাস্তিক বাম নেতার মুখে পুষ্কর হ্রদে পুণ্যস্নানের প্রসঙ্গ! বঙ্গ রাজনীতিতে ফের বামেদের নিয়ে নয়া বিতর্ক...

“ওঁর উচিত ছিল পুষ্করে স্নান করা। তাহলে ওঁর সমস্ত পাপ ধুয়ে যেত।”
এমনিতেই বঙ্গ রাজনীতিতে বিভিন্ন ঘটনার ঘনঘটা। কখনও দুর্নীতি, হিংসা, বোমাবাজি, কখনও আবার দরিদ্রের বাড়িতে অন্ন ভোজন, কিংবা শাসক বনাম বিরোধীর তীব্র বাক্যবাণ। প্রায় প্রতিদিনই খবরের শিরোনামে জায়গা পায় পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির লড়াই। ওপরের দু’টি বাক্য তারই সাম্প্রতিক সংযোজন। সৌজন্যে সিপিএমের প্রবীণ নেতা ও বাম চেয়ারম্যান বিমান বসু।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
CM Ajoy Mukherjee: অজয় মুখোপাধ্যায়ের রাগের সবচেয়ে বড় কারণ ছিল বামদলগুলি। সমস্ত গণ্ডগোল করছে সিপিএম এবং নকশাল, কিন্তু তার দায় গিয়ে পড়ছে মুখ্যমন্ত্রীর উপর!
ঘটনাটি ঠিক কী? গত রবিবার, ৪ ডিসেম্বর দিল্লি গিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সঙ্গে যান কলকাতার মেয়র এবং মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। পরদিন তিনি রাজস্থানের আজমের শরিফে যান। সেখানে ফুল, চাদর চড়ানোর পর চলে যান পুষ্করে। সেখানকার ব্রহ্মা মন্দিরে পুজোও দেন। এই ব্যাপারটি নিয়েই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কটাক্ষ করেন বিমান বসু। এএনআই-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আজমের শরিফ গিয়েছেন, পুষ্করে পুজো দিয়েছেন ভালো কথা। কিন্তু ওঁর পুষ্করে স্নান করা উচিত ছিল। তাহলে সমস্ত পাপ ধুয়ে যেত।”
বর্তমানে বঙ্গ রাজনীতিতে ভাষণ আর নেতাদের বক্তব্যে বারবার কু-কথার স্রোত উঠে আসে। মদন মিত্র, অখিল গিরি থেকে দিলীপ ঘোষ – ট্র্যাডিশন বজায় আছে তার নিজের জায়গায়। কিন্তু আপাতভাবে দেখলে, বিমান বসুর এই বক্তব্যে সেই কু-কথার তোড় নেই। অশ্লীল গালাগালিও নেই। রয়েছে ঠাট্টা, বক্রোক্তি, খানিক বাঁকা হাসি। কিন্তু সেখানেও রয়ে গিয়েছে বিতর্কের বিভিন্ন পরিসর। প্রবীণ এই বামনেতা উল্লেখ করেছেন পাপের কথা। পাপ বলতে? সারদা-নারদা, শিক্ষক দুর্নীতি, কালো টাকার পাহাড়, গরু-কয়লা পাচার, পঞ্চায়েত সহ অন্যান্য ভোটে হিংসার ঘটনা, নিজেদের এলাকায় দলের নেতা, যুব নেতাদের দহরম মহরম ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রতিটা ক্ষেত্রেই তর্জনী উঠেছে বর্তমান শাসক দলের দিকে। এসএসসি, টেটের চাকরিপ্রার্থীরা বসে আছেন রাস্তায়। কার্নিভালের জৌলুস বজায় রাখতে তাঁদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হচ্ছে সেই দুর্দশা। পাপ বলতে কি এসবের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন বিমান বসু?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Purulia arms drop case: ২০১১ সালে এক ইন্টারভিউতে কিম ডেভি জানিয়েছেন, এই আর্মস ড্রপের প্ল্যানে পুরো মদত ছিল তদানীন্তন ভারত সরকারের।
অবশ্য কেবল তিনিই নন, বাম নেতারা বারবার এই দুর্নীতি নিয়ে সরব হয়েছেন। তাহলে বিমান বসুর বক্তব্যে বিতর্ক কোথায়? ওই যে, ‘পুষ্করে স্নান’। এই জায়গায় বিষয়টি নিয়ে খানিক বলা দরকার। হিন্দু শাস্ত্রমতে, পুষ্কর হ্রদে স্নান অত্যন্ত পবিত্র। পুরাণ মতে, পুত্রদের হত্যা করার জন্য শাস্তিস্বরূপ বজ্রনাভকে বধ করেছিলেন প্রজাপতি ব্রহ্মা। পদ্মের ডাঁটি দিয়ে তাঁকে বধ করার সময় সেই ফুল থেকে তিনটে পাপড়ি এসে পৃথিবীতে পড়ে। সেখান থেকেই তিনটে হ্রদের সৃষ্টি হয়। তারই অন্যতম হল পুষ্কর হ্রদ। রাজস্থানের আজমের জেলার এই বিশেষ জায়গায় প্রতি বছরই তীর্থযাত্রীদের ভিড় লেগেই থাকে। এখানে স্নান করলে সমস্ত পাপ ধুয়ে যায়, পবিত্র হয়ে ওঠে মানুষ – এমনটাই বিশ্বাস। সেই পাপ-পুণ্যের হিসেবনিকেশ মেটানোর জন্যই যুগে যুগে এখানে ভিড় লেগেছে মানুষের। প্রজাপতি ব্রহ্মার অন্যতম বড়ো মন্দির থাকার জন্য পুষ্করের স্থান মাহাত্ম্যও ছড়িয়ে পড়েছে দর্শনার্থীদের মধ্যে।
সেই পাপ-পুণ্যের হিসেবের কথাই শোনা গেল বিমান বসুর মুখে। যিনি একজন প্রবীণ বাম নেতা। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমের অন্যতম মুখ হিসেবে যাকে দেখা গিয়েছে। যার দলীয় আদর্শ, ভাবধারা, বামপন্থার পড়াশোনা ভগবান কিংবা পাপ-পুণ্যের তত্ত্ব দেয় না। সেই পড়াশোনায় ভগবানের ‘সিংহাসন’ নেই; বরং সমস্ত মানুষের সমান অধিকারের কথা বলা হয়। ধর্মের ভেদাভেদ, বেড়াজাল ভেঙে সমস্ত কিছুকে এক চোখে দেখার কথা বলা হয়। নাস্তিক সেই মানুষটির মুখে ‘পাপের হিসেব’, ‘পুষ্করে স্নান’ ইত্যাদি শব্দ শুনে খানিক এলোমেলো হয়ে যায় ব্যাপারটা। একজন বাম আদর্শের নেতার মুখে এসব কথা আসলে কি দ্বিচারিতা নয়? এখানেই প্রশ্ন উঠছে…
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অবশ্য এটাই প্রথম নয়। দুর্গাপুজোর সময় রাস্তার গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়, মণ্ডপের বাইরে বামেদের বইয়ের স্টল অনেকেই দেখেছেন। তা নিয়ে কেবল বাইরে নয়, দলের ভেতরেও নানা সময় বিতর্ক সামনে এসেছে। পুজো-পার্বণের মধ্যে থাকা, কমিটির অংশ হওয়া নাকি আদর্শকে জায়গা দিয়ে সেখান থেকে দূরে চলে আসা? ক্ষমতায় আসার পর এ নিয়েই বারবার বঙ্গের বাম নেতা কর্মীদের মধ্যে মতান্তর দেখা গিয়েছে। অনিল বিশ্বাসের হুইপ উপেক্ষা করে পুজোয় সামিল হয়েছিলেন প্রয়াত সিপিএম নেতা সুভাষ চক্রবর্তী। দুর্গাপুজোর উদ্বোধন থেকে শুরু করে বিভিন্ন পুজোয় উপস্থিত থাকা – সবই বহাল তবিয়তে ‘পালন’ করেছেন তিনি। দেবীপক্ষের আগেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুজো উদ্বোধনকে কটাক্ষও করেছেন নব্য বামেরা।
সমস্ত ছবিটাই দলের ওপর মহলের। এই ছবি দেখেই নিচুতলার অনেক কর্মী থেকে সাধারণ মানুষ – সবাই সংশয়ে। বামপন্থার আদর্শ কি তাহলে ‘মৃত’? অবশ্য নেতাদের যুক্তি, এসব আসলে জন সংযোগের একটি উপায়মাত্র। সুভাষ চক্রবর্তীর বক্তব্য ছিল, বাংলার শ্রেষ্ঠ উৎসব থেকে দূরে থাকা মানে ‘আহাম্মকি’। সেখান থেকেই লাল কাপড়ে মোড়া একের পর এক বইয়ের স্টল। কিন্তু দেবীপক্ষ, পিতৃপক্ষ নিয়ে অতিরিক্ত ভাবনা, এসবই কি বারবার বামেদের চিরাচরিত ভাবমূর্তিতে আঘাত হানছে না? নাস্তিকতার তো কোনও দেবীপক্ষ হয় না। তাহলে অহেতুকি বিতর্কের অবতারণা কেন?
বিমান বসুর বক্তব্যের আরও একটা স্তর আছে। খুব সূক্ষ্মভাবে ঢুকে পড়েছে আজমের শরিফ এবং পুষ্কর হ্রদ। দুর্ভাগ্যবশত গোটা ভারতের মতো বাংলাতেও এখন অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডা হল ধর্ম। ‘হিন্দু বনাম মুসলিম’-এর এই পাঁকে অন্যান্য দলের মতো সিপিএমও পড়েছে। তাই তো আব্বাস সিদ্দিকির ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট বা আইএসএফের সঙ্গে হাত মেলানো বামেদের। দুর্নীতি, কালো টাকা, মানুষের সুস্থভাবে, স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকার খণ্ডন, বেকারত্ব – ইস্যু তো ‘কম পড়ে নাই’। তাহলে বারবার পুষ্কর হ্রদ ও ধর্মীয় তাজিয়ার অবতারণা কেন? নিছক মজা করেই কি এমন কথা বিমান বসুর? নাকি প্রকারান্তরে সিপিএমের ভাবধারার আকাশ ক্রমশ ঘোলাটে হয়ে উঠছে?







