দিল্লিতে মহিলা বিক্ষোভকারীদের হেনস্থার অভিযোগ, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে উঠছে যে সব প্রশ্ন
Delhi protest: দিল্লিতে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ ঘিরে মহিলা আন্দোলনকারীদের একাংশ পুলিশের বিরুদ্ধে হেনস্থা ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন। এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা ও প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন।
দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ১০ অক্টোবর যন্তর মন্তরের কাছে বিক্ষোভকারীদের উপর পুলিশি পদক্ষেপের পর হরিয়ানার একাধিক মহিলা, পড়ুয়া ও প্রবীণ নাগরিক পুলিশের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহার, শারীরিক হেনস্থা এবং আটকে রাখার সময় ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা না দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। অন্যদিকে, বিজেপি নেতা রাজীব জৈন পুলিশের পদক্ষেপের পক্ষে সওয়াল করে বলেছেন, কেউ আইন ভাঙলে পুলিশ নিজের কাজ করবে। ফলে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রতিবাদের পাশাপাশি সামনে এসেছে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার এবং প্রতিবাদীদের সঙ্গে পুলিশের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন।
অভিযোগকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, ১০ অক্টোবরের বিক্ষোভে অংশ নিতে হরিয়ানার বিভিন্ন এলাকা থেকে দিল্লিতে এসেছিলেন বহু মহিলা ও তরুণ-তরুণী। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারাও। বিক্ষোভের মূল দাবি ছিল মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকা সংশোধনকে ঘিরে ওঠা অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত।
হরিয়ানার জিন্দের কুরুক্ষেত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৪ বছর বয়সি পড়ুয়া মধু জানান, তিনি বন্ধুদের সঙ্গে দিল্লিতে এসেছিলেন। ৯ থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত তাঁরা এ কে গোপালন ভবনে ছিলেন। তাঁর অভিযোগ, ভবনের বাইরে প্রায় ৪০০ জন দিল্লি পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন ছিলেন। বাইরে বেরোতেই তাঁদের আটক করা হয়। পরে যে জায়গায় তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেখানে পানীয় জল এবং শৌচাগারের মতো প্রয়োজনীয় সুবিধাও ছিল না বলে দাবি করেন তিনি।
মধুর আরও অভিযোগ, মহিলা বিক্ষোভকারীদের চুল ধরে টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তোলা হয়। মহিলা পড়ুয়াদের সঙ্গে পুরুষ পুলিশকর্মীরা দুর্ব্যবহার করেন বলেও তিনি দাবি করেছেন। এমনকি, মহিলা পুলিশকর্মীদের হস্তক্ষেপ করতেও বাধা দেওয়া হয়েছিল বলে তাঁর অভিযোগ। বিজেপি ও আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত বলে তিনি যাঁদের চিহ্নিত করেছেন, তাঁদের কয়েক জনের বিরুদ্ধেও বিক্ষোভকারীদের মারধরের অভিযোগ তুলেছেন মধু। যদিও এই অভিযোগগুলির স্বাধীনভাবে যাচাই হওয়া জরুরি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Neha Bora: ২৩ দিন ধরে অনশন করে যেমন তিনি সংবাদমাধ্যমের নজরে এসেছিলেন, তেমনই সম্প্রতি দিল্লির রাজপথে পুলিশের বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও তাঁকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
হরিয়ানার ঝজ্জরের ভূপানিয়া গ্রামের বাসিন্দা সুমন লাউচাবও পুলিশের আচরণ নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন। বন্ধুদের সঙ্গে দিল্লিতে আসা সুমনের দাবি, বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা জানার পর তাঁর পরিবারের কাছে ফোন করে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তিনি আন্দোলনে যোগ দেবেন কি না। এতে তাঁর আশঙ্কা হয়েছিল, তাঁকে দিল্লি যেতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে। তাঁর অভিযোগ, বিক্ষোভ চলাকালীন মহিলাদের চুল ও পা ধরে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাঁদের মারধর করা হয়।
রোহতকের সঙ্গীতা সেহওয়াতের অভিযোগ, মহিলা বিক্ষোভকারীদের জোর করে বাসে তোলা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য, তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি জানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশের বলপ্রয়োগের মুখে পড়তে হয় তাঁদের।
শুধু তরুণ পড়ুয়ারাই নন, প্রবীণ নাগরিকদের মধ্যেও পুলিশের আচরণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ৮৩ বছর বয়সি মুক্তারি জাখড়, যিনি প্রয়াত স্বাধীনতা সংগ্রামী রাম সিং জাখড়ের স্ত্রী, বলেছেন, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানো গণতান্ত্রিক অধিকার। তাঁর মতে, ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। ৮৫ বছর বয়সি প্রাক্তন সেনাকর্মী বেদপাল রাঠিও বিক্ষোভকারীদের উপর পুলিশের পদক্ষেপ প্রত্যক্ষ করেছেন বলে জানিয়েছেন এবং তাঁদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
হরিয়ানার মহিলা সংগঠনগুলিও এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে। অল ইন্ডিয়া ডেমোক্র্যাটিক উইমেন্স অ্যাসোসিয়েশনের হরিয়ানা শাখার অভিযোগ, ১০ ও ১১ অক্টোবর মহিলা বিক্ষোভকারীদের উপর হামলা চালানো হয় এবং অনেককে আটক করা হয়। সংগঠনটির দাবি, কনট প্লেসে পতাকা মিছিলের সময় আটক এসএফআইয়ের মহিলা কর্মীদের কয়েক জনকে পুরুষ পুলিশকর্মীরা মারধর করেন। তাঁদের কয়েক জন আহত হন বলেও অভিযোগ। আটক মহিলাদের মহিলা পুলিশকর্মী ছাড়াই বাসে করে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাঁদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল বলেও সংগঠনটি দাবি করেছে। এই ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে।
ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল লোকদলের মহিলা শাখার নেত্রী সুনয়না চৌটালাও মহিলা পড়ুয়া ও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথিত দুর্ব্যবহারের নিন্দা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, মহিলাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করা জরুরি। তাঁদের অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখতে হবে এবং কোনো পুলিশকর্মী দোষী প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
অন্যদিকে, বিজেপি নেতা এবং সোনিপত পুরনিগমের মেয়র রাজীব জৈন পুলিশের পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, কেউ আইন ভাঙলে পুলিশ নিজের দায়িত্ব পালন করবে। অর্থাৎ, বিক্ষোভকারীদের অভিযোগের বিপরীতে বিজেপি নেতার অবস্থান হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে পুলিশের পদক্ষেপকে সরাসরি অন্যায় বলা যায় না। তবে পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা নির্দিষ্ট অভিযোগগুলির বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তা থেকেই যায়।
ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য তদন্ত যেমন জরুরি, তেমনই বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের অভিযোগও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পুলিশের আইন মেনে কাজ করার দায়িত্ব রয়েছে। একই সঙ্গে নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানানোর অধিকারও রয়েছে। হরিয়ানার মহিলা, পড়ুয়া ও প্রবীণ নাগরিকদের তোলা অভিযোগগুলির নিরপেক্ষ তদন্তই পারে ঘটনার প্রকৃত চিত্র সামনে আনতে এবং দায় নির্ধারণ করতে।







