২৩ দিনের অনশন থেকে জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন, রাজপথই নেহা বোরার হয়ে ওঠার সাক্ষী
Neha Bora: ২৩ দিন ধরে অনশন করে যেমন তিনি সংবাদমাধ্যমের নজরে এসেছিলেন, তেমনই সম্প্রতি দিল্লির রাজপথে পুলিশের বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও তাঁকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
দিল্লির রাজপথে কখনও অনশন, কখনও বিক্ষোভ, কখনও আবার পুলিশের ব্যারিকেড টপকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। গত কয়েক মাসে ছাত্র আন্দোলনের পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (আইসা)-র সর্বভারতীয় সভানেত্রী নেহা বোরা। ২৩ দিন ধরে অনশন করে যেমন তিনি সংবাদমাধ্যমের নজরে এসেছিলেন, তেমনই সম্প্রতি দিল্লির রাজপথে পুলিশের বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও তাঁকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। তাঁর প্রতিবাদের কেন্দ্রে রয়েছে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন।
গত ১১ অক্টোবর, রবিবার, দিল্লির আর কে আশ্রম মার্গ মেট্রো স্টেশনের কাছে ফের বিক্ষোভের ডাক দেন নেহা। দাবি ছিল, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ তুলে এই আন্দোলন চলছিল। নেহার ডাকে সেখানে জড়ো হন সমর্থকেরা। কিন্তু বিক্ষোভ শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই এলাকায় প্রচুর পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পুলিশের বাধা এড়িয়ে নেহা ও তাঁর সঙ্গীরা কনট প্লেসের দিকে দৌড়তে শুরু করেন। দুপুর ২টো ৫১ মিনিটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেহা জানান, তাঁরা ব্যারিকেড পেরিয়ে কনট প্লেসে পৌঁছেছেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ তাঁকে আটক করে। অন্য বিক্ষোভকারীদেরও টেনে-হিঁচড়ে বাসে তোলা হয় বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এই ঘটনার পর পুলিশি হেফাজতে তাঁদের কী পরিস্থিতির মধ্যে রাখা হয়েছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। আটক হওয়ার পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে নেহা অভিযোগ করেন, বিক্ষোভকারীদের যে বাসে তোলা হয়েছিল, তার ভিতরে ছোট ছোট খোপ ছিল। সেখানে শ্বাস নেওয়ার মতো জায়গাও ছিল না বলে তাঁর দাবি। মহিলা বিক্ষোভকারীদের একটি ছোট জায়গায় গাদাগাদি করে রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পুরুষ বিক্ষোভকারীদের গালিগালাজ করা এবং মারধরের অভিযোগও তোলেন নেহা। তবে এই অভিযোগগুলির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ওই প্রতিবেদনগুলিতে পাওয়া যায়নি।
এই বিক্ষোভ অবশ্য এক দিনের ঘটনা নয়। তার আগের দিন, শনিবারও, দিল্লিতে প্রতিবাদের চেষ্টা করেছিলেন নেহা ও তাঁর সঙ্গীরা। পুলিশি বাধা ও আটক করার ঘটনার পরেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি। রবিবারও তাঁর বার্তা ছিল, একটি জায়গায় প্রতিবাদ আটকে দেওয়া হলে অন্য জায়গায় মানুষকে একত্রিত হতে হবে। দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়া এই প্রতিবাদে পুলিশের উপস্থিতি এবং আটক করার ঘটনা আন্দোলনের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Jantar Mantar protest site: আঠারো শতকে নির্মিত যন্তর মন্তর মূলত একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণকেন্দ্র। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঐতিহাসিক এই স্থাপনার পাশের রাস্তা হয়ে ওঠে দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা প্রতিবাদীদের মিলনস্থল।
নেহার রাজনৈতিক যাত্রাপথ বুঝতে গেলে তাঁর ছাত্রজীবন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের দিকে তাকাতে হয়। ২৯ বছর বয়সি নেহার বেড়ে ওঠা উত্তরাখণ্ডের খাটিমায়। তাঁর বাবা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত। বাবার চাকরির কারণে ছোটবেলায় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে হয়েছে পরিবারকে। প্রায় ১২ বছর ধরে দিল্লিতে থাকলেও উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ি পরিবেশের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও সম্পর্ক এখনও গভীর। পরিবারের সদস্যেরা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে একমত নন। বিশেষ করে সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাবার সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে। কিন্তু পরিবারের আপত্তি তাঁর আন্দোলনের পথ থেকে তাঁকে সরাতে পারেনি।
নেহার রাজনৈতিক চেতনা গড়ে ওঠার পিছনে নাটকেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সামাজিক নানা সমস্যা নিয়ে মঞ্চে অভিনয় করতেন তিনি। সেই সূত্রেই ধীরে ধীরে সমাজের বিভিন্ন বৈষম্য, নারীবাদ এবং প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সিনিয়রের মাধ্যমে রাজনৈতিক নাটকের দলের সঙ্গে যুক্ত হন। পরে যোগ দেন আইসায়। তাঁর কাছে নাটক ও রাজনীতি আলাদা কোনও বিষয় নয়; বরং সামাজিক সমস্যাগুলি মানুষের সামনে তুলে ধরার দুটি পথ।
২০১৯ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ-বিরোধী আন্দোলন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। সেই আন্দোলনে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও সক্রিয় করে তোলে। এরপর থেকে শিক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রশ্নে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন তিনি। বর্তমানে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নেহা নাটক ও পারফরম্যান্স স্টাডিজ নিয়ে পিএইচডি করছেন। পাশাপাশি আইসার সর্বভারতীয় সভানেত্রী হিসেবে ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
তবে নেহাকে জাতীয় স্তরে পরিচিতি এনে দেয় ২০২৬ সালের জুলাই মাসের অনশন আন্দোলন। সেই সময় লাদাখের পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে একই প্রতিবাদস্থলে অনশনে বসেছিলেন আইসার তিন ছাত্রনেতা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন নেহাও। দিল্লির জন্তর মন্তরে টানা ২৩ দিন অনশন করেন তাঁরা। তাঁদের অন্যতম দাবি ছিল, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষা পরিচালনায় অব্যবস্থা এবং ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে এই আন্দোলন গড়ে উঠেছিল।
নেহার বক্তব্য ছিল, বছরের পর বছর ধরে প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষার অব্যবস্থা নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ জমছিল। বিভিন্নভাবে প্রতিবাদ করেও তাঁরা প্রত্যাশিত ফল পাননি। সেই পরিস্থিতিতে অনশনকে প্রতিবাদের আরেকটি পথ হিসেবে বেছে নেন তাঁরা। দিন যত এগিয়েছে, ততই শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন অনশনকারীরা। শেষ পর্যন্ত বিরোধী দলের সাংসদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অনুরোধে ২০ জুলাই অনশন ভাঙেন তাঁরা। এই আন্দোলনের পর ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের ঘটনাও সামনে আসে। নেহা হয়ে ওঠেন শিক্ষা ও ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ।
শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নেহার আপত্তি শুধু পরীক্ষায় অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জাতীয় শিক্ষানীতি, ২০২০ এবং পরীক্ষা পরিচালনার ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীয়করণ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর মতে, শিক্ষার নীতি নির্ধারণ ও পরীক্ষা পরিচালনার ক্ষেত্রে যে সমস্যাগুলি তৈরি হয়েছে, তা ছাত্রছাত্রীদের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
জুলাইয়ের অনশনের পর অক্টোবর মাসে ফের প্রতিবাদের সামনের সারিতে দেখা যায় নেহাকে। এ বার প্রশ্ন দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ও ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে। এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে নামেন তিনি। জন্তর মন্তরে পৌঁছনোর পথে পুলিশের বাধা এবং পরপর আটক করার ঘটনা সত্ত্বেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ডাক দিয়েছেন নেহা।
তাঁর রাজনৈতিক পথচলার সঙ্গে পরিবারের মতপার্থক্য রয়েছে, শারীরিক কষ্টও রয়েছে, রয়েছে পুলিশের বাধার মুখে পড়ার অভিজ্ঞতা। কিন্তু এই সব কিছুই তাঁকে আন্দোলন থেকে সরিয়ে দিতে পারেনি। একদিকে গবেষণা, অন্যদিকে রাজপথের প্রতিবাদ—এই দুইয়ের মধ্যে দিয়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছেন নেহা বোরা।







