দ্বিখণ্ডিত তৃণমূল শুভেন্দুকে কতটা শক্তিশালী করল?
Suvendu Adhikari: তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ ভাঙন, নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং সাংগঠনিক সংকটে লাভবান হচ্ছেন শুভেন্দু অধিকারী? বিদ্রোহী বিধায়কদের অবস্থান, আইপ্যাক বিতর্ক এবং নেতৃত্বের প্রশ্নে তৈরি হওয়া অস্থিরতা কি তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষমতার পরিধি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে?
রাজনীতিতে অনেক বড় বড় নেতা দল বদলেছেন। কেউ হারিয়ে গিয়েছেন, কেউ প্রাসঙ্গিক থেকেছেন, আবার কেউ নতুন রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলেছেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের নব্য নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক যাত্রাপথ অন্যরকম। তিনি শুধু দল ছাড়েননি, যে দলকে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন, সেই দলকেই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাচ্যুত করার অন্যতম প্রধান কারিগর হয়েছেন। এমনকী এখানেও শেষ নয়, ক্ষমতাচ্যুত তৃণমূল যেভাবে দ্বিখণ্ডিত হলো, সেখানে তিনি কোনো ভূমিকাই পালন করেননি এটা শিশুও মানবে না। বরং রাজনৈতিক মহলের মত এই ঘটনাপ্রবাহ ভোটজয়ের চেয়েও বড়, তাঁর ব্যক্তিগত জয়।
২০২০ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ছাড়ার সময় শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য ছিল, দলের চরিত্র বদলে যাচ্ছে। দলের সব সিদ্ধান্ত ধীরে ধীরে কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে এবং রাজনৈতিক পরামর্শদাতাদের প্রভাব বাড়ছে। সেই সময় তৃণমূলের অধিকাংশ নেতা এই অভিযোগকে ব্যক্তিগত ক্ষোভ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। ছয় বছর পরে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে একই ধরনের অভিযোগ দলের ভেতর থেকেই উঠছে।
নন্দীগ্রাম আন্দোলনকে রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে শুভেন্দু অধিকারীর ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যেও খুব বেশি দ্বিমত নেই। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের আন্দোলনের উপর ভর করেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান ঘটেছিল। সেই আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। পরবর্তী সময়ে তৃণমূলের সাংগঠনিক বিস্তারেও তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুকুল রায়ের পর রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শুভেন্দুই ছিলেন দলের প্রধান মুখগুলির অন্যতম।
এই কারণেই দলের ভেতরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্রুত উত্থানকে অনেকেই সহজভাবে নিতে পারেননি। রাজনৈতিক লড়াই, গণআন্দোলন কিংবা দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার পথ পেরিয়ে নয়, বরং উত্তরাধিকার রাজনীতির সুবিধা নিয়েই অভিষেক ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন, এমন ধারণা তৃণমূলের একাংশের মধ্যে তৈরি হয়েছিল। এই ধারণা সঠিক না ভুল, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু এই অসন্তোষ যে বাস্তব ছিল, তা পরে একাধিক নেতা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন।
সমস্যা আরও বাড়ে যখন তৃণমূলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্রমশ আইপ্যাক-নির্ভর হয়ে ওঠে। সমীক্ষা, ডেটা, মাইক্রো ম্যানেজমেন্টের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। রাজনৈতিক পরামর্শদাতারা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন, আর বহু পুরনো নেতা নিজেদের গুরুত্ব কমে যাওয়ার অভিযোগ করতে থাকেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সময়ের সঙ্গে সরকার পাল্টেছে, শাসক দলের পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু হকার উচ্ছেদ সম্পর্কে শাসকের দৃষ্টিভঙ্গির এতটুকু পরিবর্তন হয়নি। সেই একই পরম্পরা আজও প্রবহমান।
এই প্রেক্ষাপটে শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে অভিষেক শিবিরের সংঘাত বাড়ে। তৃণমূলের একাংশের অভিযোগ ছিল, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর সাংগঠনিক গুরুত্ব কমতে থাকে। দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাঁর প্রভাব আগের তুলনায় কমে যায় বলেও দাবি করা হয়। ক্রমবর্ধমান এই দূরত্বের জেরেই শেষ পর্যন্ত তিনি ২০২০ সালে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন। তখন অনেকেই মনে করেছিলেন, শুভেন্দুর রাজনৈতিক ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। বাস্তবে ঘটল উল্টোটা।
নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানোর পর শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেকটাই বেড়ে যায়। এরপর ২০২৬ সালে নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর—দুটি আসনেই জয় পান। কিন্তু শুভেন্দুর প্রকৃত সাফল্য সম্ভবত নির্বাচনী ফলাফলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
আজ তৃণমূলের ভেতরে যে ভাঙন দেখা যাচ্ছে, তা কেবল সাংগঠনিক সংকট নয়; এটি নেতৃত্বের সংকটও। বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে সংঘাত তৈরি হয়েছে, তা কার্যত প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে দলের বর্ষীয়ান নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম বিরোধী দলনেতা হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রস্তাবপত্রে থাকা স্বাক্ষর নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূলের টিকিটে জয়ী আরেক বিধায়ক সন্দীপন সাহা। তাঁদের অভিযোগ ছিল, প্রস্তাবনায় থাকা একাধিক স্বাক্ষরে অসঙ্গতি রয়েছে। রাজ্যের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীই আবার প্রকাশ্যে এই অভিযোগের কথা তুলে ধরার পরই দল দ্রুত পদক্ষেপ করে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহাকে তড়িঘড়ি বহিষ্কার করা হয়।
পরবর্তী সময়ে সিংহভাগ তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরিষদীয় দলনেতা হিসেবে বেছে নেওয়ার দাবি সামনে আসে। ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরিষদীয় দলনেতা হিসেবে সমর্থন করেছেন। সেই তালিকায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত জাভেদ খান, শিউলি সাহা, সাবিনা ইয়াসমিন, আখরুজ্জামানরাও ছিলেন।
এই ঘটনার পর এক বিবৃতিতে তৃণমূল কংগ্রেস জানায়, পশ্চিমবঙ্গে দলের সব স্তরের সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। শুধু মূল সংগঠনই নয়, শাখা সংগঠনগুলির কমিটিও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। দলের বক্তব্য, বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে, পরাজয় ও সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণ খতিয়ে দেখা হবে, ভুলত্রুটির বিশ্লেষণ করা হবে। তার পরেই নতুন করে বিভিন্ন স্তরের কমিটি গঠন করা হবে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সাম্প্রতিক হকার উচ্ছেদ কেবল সৌন্দর্যায়ন নয়, বরং নয়া-উদারবাদী মুক্তবাজারের চাপে গণপরিসরে কর্পোরেট পুঁজির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রশাসনিক রূপরেখা। শাসকদলের বুলডোজ়ার নীতি কীভাবে আইনি বৈষম্য তৈরি করে শ্রমজীবী মানুষের সমান্তরাল অর্থনীতি ও জীবিকাকে ধ্বংস করছে— জানুন এই বিশ্লেষণে।
মঙ্গলবার (২ জুন) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা ধর্না কর্মসূচিতে নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, কুণাল ঘোষ-সহ কয়েকজন বিধায়ক ও তৃণমূল নেতাকে দেখা গেলেও দলের বহু পরিচিত মুখ সেখানে অনুপস্থিত ছিলেন। রাজনৈতিক মহলে এই অনুপস্থিতি নিয়েও জল্পনা তৈরি হয়েছে।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরিষদীয় দলনেতা হিসেবে বেছে নেওয়ার ঘটনাকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছেন কুণাল ঘোষ। তাঁর প্রশ্ন,
এইভাবে চোরাগোপ্তা পথে এসব করার কী দরকার ছিল?
একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, দল এই ঘটনার রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তাৎপর্য খতিয়ে দেখবে এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে। এই জায়গাতেই শুভেন্দুর লাভ।
প্রথম লাভ, তাঁর রাজনৈতিক বয়ান বৈধতা পাচ্ছে। তিনি যে অভিযোগ নিয়ে দল ছেড়েছিলেন, আজ সেই অভিযোগের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে তৃণমূলের ভেতর থেকেই। বিদ্রোহী শিবিরের বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব এবং আইপ্যাকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় অতীতেও প্রকাশ্যে আইপ্যাকের সমালোচনা করেছেন। সন্দীপন সাহার বক্তব্যেও একই সুর শোনা গিয়েছে। ফলে শুভেন্দুর দলত্যাগ আর নিছক ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার সিদ্ধান্ত বলে মনে হচ্ছে না; অনেকের কাছে তা রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবেও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।
দ্বিতীয় লাভ, বিজেপির ভেতরে তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাব বৃদ্ধি। তৃণমূল থেকে বেরিয়ে আসা বা অসন্তুষ্ট নেতাদের বড় অংশের সঙ্গে শুভেন্দুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে তাঁরা যদি নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খোঁজেন, স্বাভাবিকভাবেই শুভেন্দুর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর ফলে বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি যতটা বাড়বে, শুভেন্দুর নিজস্ব রাজনৈতিক বলয়ও ততটাই প্রসারিত হতে পারে।
তৃতীয়ত, তিনি এখন এমন একটি অবস্থানে রয়েছেন যেখানে বিরোধী ও প্রাক্তন প্রতিপক্ষ—দু'পক্ষকেই এক রাজনৈতিক ছাতার নীচে আনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রাজনীতিতে ব্যক্তিগত আনুগত্য একটি বড় সম্পদ। বিশেষ করে যখন কোনো নেতা ক্ষমতায় থাকেন। তৃণমূলের বর্তমান সংকট শুভেন্দুকে সেই সুযোগ করে দিচ্ছে।
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমর্থনকারী তালিকায় এমন কিছু নেতার নাম রয়েছে, যাঁদের বিরুদ্ধে অতীতে নানা অভিযোগ উঠেছে। জাভেদ খানের বিরুদ্ধে তিলজলার অশান্তির মামলায় এফআইআর হয়েছে, যদিও তিনি জামিন পেয়েছেন এবং কোনো আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেনি। রথীন ঘোষের নাম পুর নিয়োগ দুর্নীতি তদন্তে উঠে এসেছে, তাঁকে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে, যদিও তিনিও এখনও আদালতে দোষী সাব্যস্ত নন। ফলে রাজনৈতিক মহলে আবার ‘ওয়াশিং মেশিন’ তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও এই বিতর্কের চূড়ান্ত সত্যতা ভবিষ্যতের ঘটনাই নির্ধারণ করবে।
তৃণমূলের ভাঙন কি শুধু বিজেপিকে শক্তিশালী করছে, নাকি শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভিত্তিকেও আরও মজবুত করছে?
বর্তমান পরিস্থিতি দ্বিতীয় সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত করছে। কারণ দল ভাঙলে সাধারণত নতুন শক্তিকেন্দ্র তৈরি হয়। পশ্চিমবঙ্গে সেই সম্ভাব্য শক্তিকেন্দ্রের আনুগত্য একমাত্র শুভেন্দু অধিকারীর হাতেই আছে। এমন এক অনুগত বিধায়ক গোষ্ঠী ধীরে ধীরে তৈরি হতে পারে, যারা রাজনৈতিকভাবে তাঁর নেতৃত্বের উপর নির্ভরশীল থাকবে। ভবিষ্যতের যে কোনো ক্ষমতার সমীকরণে এই গোষ্ঠী তাঁর শক্তির উৎস হয়ে উঠতে পারে। তৃণমূল যত বিভক্ত হচ্ছে, শুভেন্দুর রাজনৈতিক পরিসর ততই বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। বাড়ছে তাঁর ক্ষমতাবৃত্তের পরিধি।








