দুধে বড় হওয়া আম! মাত্র ১৫ দিনের অতিথি! কেন এত দুর্লভ ‘দুধিয়া মালদহ’?
শোনা যায়, বহু বছর আগে লখনউয়ের নবাব ফিদা হোসেন পাকিস্তানের ইসলামাবাদের শাহ ফয়সাল মসজিদ এলাকা থেকে একটি বিশেষ আমের চারা নিয়ে এসেছিলেন। তিনি সেটি এনে পুঁতলেন বিহারের পাটনার দিঘা অঞ্চলে। নবাবের ছিল প্রচুর কোলা গরু। রোজ খাঁটি দুধ দোয়ানোর পর যেটুকু দুধ বেঁচে যেত, নবাবের হুকুমে তা ঢেলে দেওয়া হতো ওই ছোট্ট আম গাছটির গোড়ায়।
গরমে আম ভালোবাসেন না, এমন ভারতীয় খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আমাদের কাছে আম শুধু একটা ফল নয়, একটা আবেগ! আমের এই দুনিয়ায় ল্যাংড়া, হিমসাগর, বেগুনফুলি, হিমসাগর বা ফজলির নাম আমরা সবাই জানি। কিন্তু বিহারে আছে এমন এক জাদুকরি আম, যার স্বাদ আর গন্ধের কাছে বাকি সব আম ফিকে হয়ে যায়। আম-রসিকরা একে আদর করে ডাকেন ‘আমের রানি’। নাম তার—দুধিয়া মালদহ।
এই আমের শুরুটা বেশ নবাবী। শোনা যায়, বহু বছর আগে লখনউয়ের নবাব ফিদা হোসেন পাকিস্তানের ইসলামাবাদের শাহ ফয়সাল মসজিদ এলাকা থেকে একটি বিশেষ আমের চারা নিয়ে এসেছিলেন। তিনি সেটি এনে পুঁতলেন বিহারের পাটনার দিঘা অঞ্চলে।
নবাবের ছিল প্রচুর কোলা গরু। রোজ খাঁটি দুধ দোয়ানোর পর যেটুকু দুধ বেঁচে যেত, নবাবের হুকুমে তা ঢেলে দেওয়া হতো ওই ছোট্ট আম গাছটির গোড়ায়। দুধ খেয়েই বড় হতে লাগল গাছটি। একদিন যখন সেই গাছে প্রথম ফল ধরল, দেখা গেল এক অদ্ভুত কাণ্ড! বোঁটা থেকে আমটি ছিঁড়তেই অন্য আমের মতো জলের মতো আঠা বেরোলো না; টপ টপ করে ঝরে পড়ল একদম খাঁটি সাদা দুধের মতো ঘন রস! ব্যাস, সেই থেকেই এই আমের নাম হয়ে গেল ‘দুধিয়া মালদহ’।

দেখতে কেমন, স্বাদই বা কেমন?
এই আমের ম্যাজিক লুকিয়ে আছে তার চেহারায়। ল্যাংড়া বা অন্য মালদহ আম পাকলে একটু হলদে বা কালচে হয়ে যায়। কিন্তু খাঁটি দুধিয়া মালদহ পেকে যাওয়ার পরও বাইরে থেকে একদম হালকা সবুজ থাকে। দেখে বোঝার উপায় নেই যে ভিতরে কতটা মধু লুকিয়ে আছে!
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কর্ণাটকের এক কৃষক পরিবারের ছেলে আঙ্কে গৌড়া বহু বছর ধরে বিভিন্ন কাজ করার পাশাপাশি বই সংগ্রহ করে গিয়েছেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল একটি বিনামূল্যের লাইব্রেরির। আজ সেই স্বপ্ন বাস্তব রূপ নিয়েছে 'পুস্তক মানে' (Pustak Mane) নামক একটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য লাইব্রেরিতে, যেখানে রয়েছে প্রায় ২০ লক্ষ বই। সেখানে এখন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, গবেষকদের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়।
কিন্তু যেই কাটবেন, ভিতর থেকে বেরিয়ে আসবে মাখনের মতো নরম, আঁশহীন, টকটকে সোনালী-হলুদ রঙের রসালো শাঁস। এর খোসা আর আঁটি এতটাই পাতলা যে, আঁটিটিকে দেখলে মনে হবে যেন একটা কাগজের টুকরো! ফলে ফলের ওজনের প্রায় পুরোটা জুড়েই থাকে শুধুই মিষ্টি রস।
আর গন্ধ? একে বলা হয় ‘রুম পারফিউমার’। খড়ের গদিতে পাকা মাত্র দুটো দুধিয়া আম যদি একটা বন্ধ ঘরে রেখে দেন, তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই গোটা ঘর এক স্বর্গীয় সুবাসে ম ম করবে।
রাজ কাপুর থেকে লর্ড কার্জন: সবাই যখন দিঘার দিওয়ানা!
এই আমের সুখ্যাতি কিন্তু আজকের নয়। ব্রিটিশ আমলে ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন যখন অবিভক্ত বাংলা ও বিহারে এসেছিলেন, তাঁকে এই আম উপহার দেওয়া হয়েছিল। এর স্বাদে মুগ্ধ হয়ে তিনি প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছিলেন।
ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদও ছিলেন এই আমের মস্ত বড় ভক্ত। তিনি রাষ্ট্রপতি ভবনে থাকার সময়ও দিঘার আমের জন্য চিঠি পাঠাতেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে শীর্ষনেতাদের কাছে প্রতি বছর জুনের মরশুমে উপহার হিসেবে এই আম পাঠানোর একটা সুন্দর রেওয়াজ তৈরি হয়ে গিয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Poush Parbon Pithe Puli: পিঠে তৈরির আগে গ্রামাঞ্চলে 'বাউনি' বাঁধার একটি প্রথা ছিল, যা এখন প্রায় বিলুপ্ত। পৌষ সংক্রান্তির আগের দিন, মাটির সরা (যে পাত্রে চিতই পিঠে তৈরি করা হয়)-কে পুজো করা হতো। পাকা ধানের শিষ বিনুনির মতো করে পাকিয়ে সরার গলায় বেঁধে দেওয়া হতো— যার নাম 'বাউনী'। বিশ্বাস করা হতো, এতে সারা বছর ধানের গোলা পূর্ণ থাকবে।
বলিউডের রোম্যান্টিক হিরো রাজ কাপুরের গল্পটা তো আরও মজাদার! ১৯৫২ সালে এই আমের গন্ধ আর স্বাদের কথা শুনে তিনি আর লোভ সামলাতে পারেননি। মুম্বই থেকে সোজা গাড়ি চালিয়ে চলে এসেছিলেন পাটনার দিঘায়। পেট পুরে আম খেয়েও মন ভরেনি, তাই গাড়ি বোঝাই করে কার্টন কার্টন দুধিয়া মালদহ নিয়ে ফিরেছিলেন মুম্বইয়ে।
শুধু দেশেই নয়, বিশ্বমঞ্চেও এই আম ভারতকে গর্বিত করেছে। ১৯৯৭ সালে সিঙ্গাপুরে আয়োজিত আন্তর্জাতিক আম প্রদর্শনীতে সারা পৃথিবীর হরেক জাতের আমকে পিছনে ফেলে বিহারের এই দুধিয়া মালদহ প্রথম স্থান ছিনিয়ে নিয়েছিল।
অনেকেই ভাবেন, চারা এনে অন্য কোথাও পুঁতলে বুঝি এমন আম পাওয়া যাবে? কৃষিবিজ্ঞানীরা বলছেন—একদমই না! আসল দুধিয়া মালদহ একমাত্র পাটনার দিঘা অঞ্চলেই হতে পারে। কারণ দিঘা অঞ্চলটি ঠিক গঙ্গার তীরে। এখানে সোন, গণ্ডক আর পুনপুন নদীর পলিমাটি এসে মেশে। এই মাটিতে বালির ভাগ বেশি থাকে, সঙ্গে থাকে প্রচুর ক্যালসিয়াম আর ফসফরাস। এই বিশেষ মাটির গুণেই আমটিতে টক আর মিষ্টির এমন এক নিখুঁত ভারসাম্য তৈরি হয়, যা অন্য কোথাও পাওয়া অসম্ভব।
দুধিয়া মালদহকে বিশ্বমঞ্চে জনপ্রিয় করে তোলার পিছনে মহম্মদ ইরফান নামের এক স্থানীয় চাষির মস্ত বড় অবদান ছিল। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর এই আমের দেখভাল করার আর কেউ ছিল না। তাঁর ছেলেরা বাগানটি ধরে রাখতে পারেননি। আগে যেখানে তিনি দুধিয়া মালদহের চাষ করতেন, সেই সাধের বাগানটি এখন একটি কলেজ ক্যাম্পাস!
নগরায়ণ আর বহুতল আবাসন তৈরির কারণে দিঘার পুরনো আমবাগানগুলি প্রায় শেষ। বর্তমানে পুরো পাটনা মিলিয়ে আর মাত্র ১,০০০টির মতো আসল দুধিয়া মালদহ গাছ বেঁচে আছে। মহাত্মা গান্ধীর তৈরি ‘বিহার বিদ্যাপীঠ’ ক্যাম্পাস নিজের উদ্যোগে তাদের চত্বরে মাত্র ৫০টির মতো গাছ কোনোমতে টিকিয়ে রেখেছে।
যেহেতু জোগান খুব কম, আর এর মরশুমও মাত্র ১৫-২০ দিনের (জুনের প্রথম থেকে মাঝামাঝি), তাই এখন এটি একটি পরম বিলাসবহুল ফল। বাজারে আসার আগেই আম-রসিকরা চড়া দামে অনলাইনে এটি প্রি-অর্ডার করে রাখেন। এক একটি ছোট ৩ কেজির বাক্সের দাম পড়ে প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা!
এই ঐতিহ্যকে বাঁচাতে এখন নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া শুরু হয়েছে। সাবোরের ‘বিহার কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়’ এই আমটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে এবং বিশ্বমঞ্চে তার পুরনো সম্মান ফিরিয়ে দিতে ‘জিআই ট্যাগ’ (GI Tag)-এর আবেদন জানিয়েছে। ১৯০৫ সালের সরকারি পুরনো নথিপত্র ঘেঁটে এর ইতিহাস প্রমাণ করা হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, আগামী ১-২ মাসের মধ্যেই দুধিয়া মালদহ অফিশিয়ালি জিআই ট্যাগের স্বীকৃতি পেয়ে যাবে।
পাশাপাশি, বৈজ্ঞানিক উপায়ে কলম করে প্রায় ২৫ থেকে ৫০ হাজার নতুন চারা তৈরি করা হচ্ছে, যা আবার চাষিদের মধ্যে বিলি করা হবে।
পাটনার দিঘার এই সাধের ‘দুধিয়া মালদহ’ শুধু আমাদের রসনাতৃপ্তি করে না, এর প্রতিটা কামড়ে মিশে থাকে ইতিহাস আর নস্টালজিয়া। নতুন চারাগুলির হাত ধরে এই আমের সুবাস আবার দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ুক, এটাই এখন সব আম-প্রেমীর প্রার্থনা!







