পিঠের একাল সেকাল
Poush Parbon Pithe Puli: পিঠে তৈরির আগে গ্রামাঞ্চলে 'বাউনি' বাঁধার একটি প্রথা ছিল, যা এখন প্রায় বিলুপ্ত। পৌষ সংক্রান্তির আগের দিন, মাটির সরা (যে পাত্রে চিতই পিঠে তৈরি করা হয়)-কে পুজো করা হতো। পাকা ধানের শিষ বিনুনির মতো করে পাকিয়ে সরার গলায় বেঁধে দেওয়া হতো— যার নাম 'বাউনী'। বিশ্বাস করা হতো, এতে সারা বছর ধানের গোলা পূর্ণ থাকবে।
পৌষ মাসে খেজুর গুড়, চালের গুঁড়ো, আর নারকেল কোরা—বাঙালির হাড়হিম শীতে এই সুবাস অদ্ভুত এক নস্টালজিয়ায় নিয়ে যায় আমাদের। উপকরণের তালিকার পর আর আলাদা করে বলে দিতে হয় না ঠিক কোন পদের সুবাসের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি আর পিঠে-পুলি— একই মুদ্রার দুই পিঠ। বাঙালির 'শেষ পাতে মিষ্টিমুখ' মানেই সেই প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে মিষ্টি এবং পিঠে।
'পৌষ পার্বণে'র নামই এখন হয়ে গেছে 'পিঠে পার্বণ'। পৌষের সঙ্গে পিঠের সম্পর্ক ঠিক কী?
অগ্রহায়ণে গ্রামবাংলার কৃষক পরিবারে ক্ষেতের নতুন ধান বা 'আমন ধান' ঘরে উঠত। দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং পরিশ্রমের পর চাষের ধান ঘরে উঠেছে, কাজেই এই সময় হলো আমোদের। তাই নতুন চাল বা নব অন্নকে ঘিরে নবান্ন উৎসব হতো। তারপর পৌষে হতো পৌষ লক্ষ্মীর পুজো। নতুন ধান ঘরে আসায় মানুষের হাতে টাকা থাকত। তাই বাঙালি নতুন জামা-কাপড় ও অন্যান্য বিভিন্ন শখের জিনিস কিনতে চাইত। আর তাই বিভিন্ন জায়গায় বসত মেলা। কিন্তু খালি মুখে তো আর উৎসব হয় না। নতুন চালের গুঁড়ো বা পিটুলি খুব আঠালো, পিঠে তৈরির জন্য আদর্শ। তাই, ঘরে আসা নতুন ধান, এবং শীতের নতুন গুড় দিয়ে তৈরি করা হতো পিঠে। একে বলা হতো ‘নবান্ন’ পরবর্তী উৎসব বা ‘পৌষ-পার্বণ’।
পিঠে তৈরির আগে গ্রামাঞ্চলে 'বাউনি' বাঁধার একটি প্রথা ছিল, যা এখন প্রায় বিলুপ্ত। পৌষ সংক্রান্তির আগের দিন, মাটির সরা (যে পাত্রে চিতই পিঠে তৈরি করা হয়)-কে পুজো করা হতো। পাকা ধানের শিষ বিনুনির মতো করে পাকিয়ে সরার গলায় বেঁধে দেওয়া হতো— যার নাম 'বাউনি'। বিশ্বাস করা হতো, এতে সারা বছর ধানের গোলা পূর্ণ থাকবে। অর্থাৎ পিঠে তৈরিটা নিছক রান্না ছিল না, এটি ছিল লক্ষ্মী আবাহনের একটি তান্ত্রিক বা লৌকিক ক্রিয়া।
কিন্তু আজ আমরা যাকে ‘পিঠে’ বলে আদর করে ডাকি, তার জন্মবৃত্তান্ত ঠিক কতটা পুরনো?
আজ থেকে প্রায় দু-আড়াই হাজার বছর আগের কথা। তখনো বাঙালির হেঁশেলে মিক্সার গ্রাইন্ডার বা গ্যাস ওভেন আসেনি। ছিল শিল-নোড়া আর মাটির উনুন। তাই, তখন বাজার থেকে চালের গুঁড়ো কিনে এনে বা মিক্সার গ্রাইন্ডারে চাল না গুঁড়ো করে, শিল-নোড়া দিয়ে পিষে চাল গুঁড়ো করা হতো। সংস্কৃত ভাষায় কোনো শস্য বা দানা পিষে যা তৈরি হতো, তাকে বলা হতো ‘পিষ্ট’। আর চাল বা ডাল পিষে, অর্থাৎ ‘পিটুলি’ তৈরি করে তা দিয়ে যে বিশেষ খাবার বানানো হতো, সংস্কৃত পণ্ডিতরা তার নাম দিয়েছিলেন ‘পিষ্টক’।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Pithe puli in Indian Epics: পৌষপার্বণের প্রধান কিন্তু সরা পিঠে। যাকে কেউ বলে ভাপা পিঠে, কেউ আবার বলে চিতই পিঠে। এপার বাংলায় বাউনি বাঁধার আগে মাটির সরায় পিঠে ভাজতে হয়।
পিঠের ইতিহাস যে হাজার হাজার বছরের পুরনো তার পরিচয় পাওয়া যায় আমাদের বৈদিক সাহিত্যে। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন পুঁথি-পত্র খুব একটা পাওয়া যায় না। মধ্যযুগ থেকে পাওয়া যায়। সেই সময়ের এমন কোনো সাহিত্য পাওয়া যায় না, যেখানে মিষ্টির উল্লেখ আছে কিন্তু পিঠের উল্লেখ নেই।
কৃত্তিবাস ওঝার 'শ্রীরাম পাঁচালীতে' বলা হয়েছে,
শেষে অম্বলান্তে হইল ব্যঞ্জন সমাপ্ত।
দধি পরে পরমান্ন পিষ্টকাদি যত।
বিজয় গুপ্তের 'পদ্মপুরাণে' আমরা দেখতে পাই, চাঁদ সদাগরের স্ত্রী সনকার খাবারের যে বিবরণ দিয়েছেন কবি, তাতে বলেছেন,
খির খিরাইয়া রান্ধে দুগ্ধের পঞ্চ পিঠা,
গুড় চিনি দিয়া রান্ধে, খাইতে লাগে মিঠা।
মুকুন্দরাম চক্রবর্তী 'চণ্ডীমঙ্গলে' নানা ধরনের পিঠের কথা বলেছেন,
কলা বড়া, মুগ সাউলি,
ক্ষীর মোন্না, ক্ষীর পুলি
নানা পিঠা রান্ধে অবশেষে।
শ্রীচৈতন্যদেব পিঠে খেতে খুব ভালবাসতেন তার পরিচয় আমরা পাই, শ্রীকৃষ্ণদাস কবিরাজের 'শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত' গ্রন্থে, সেখানে শ্রী চৈতন্যদেবের জন্য রান্নার কথা বলতে গিয়ে বলা হয়েছে,
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ক্ষীর পুলি, নারিকেল পুলি আর পিষ্ট
কাঞ্জি বড়া, দুগ্ধ চিড়া, দুগ্ধ লকলকি
আর যত পিঠা কইল কহিতে না সকি।
ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের 'অন্নদামঙ্গল' কাব্যে ভবানন্দ মজুমদারের স্ত্রী পদ্মমুখী ব্রাহ্মণ ভোজনের জন্য রেঁধেছিলেন রকমারি পিঠে।
অম্বল রাঁধিয়া রামা, আরম্ভিলা পিঠা
বড়া এল আশিকা পীযূষী পুরি পুলি
চুষী রুটি রামরোট মুগের সামুলী।
ভাষার স্রোত বড় অদ্ভুত। নদী যেমন গতিপথে বাঁক বদলায়, ঠিক তেমনই শব্দও সময়ের গতিপথে রূপ বদলায়। সংস্কৃতের এই গম্ভীর শব্দ ‘পিষ্টক’ সাধারণ মানুষের মুখে মুখে প্রাকৃত ভাষায় হয়ে গেল ‘পিটঠক’ বা ‘পিটঠা’। সেখান থেকে আরও খানিকটা পথ হেঁটে বাংলায় এসে তার নাম হলো ‘পিঠা’। যাকে আমরা বলি পিঠে। কিন্তু শব্দটি আসলে পিঠা। আসামেও এর নাম 'পিঠা'। ওড়িশায় একে বলে ‘পোঢ় পিঠা’। নাম যা-ই হোক, মূল মন্ত্র কিন্তু সেই একটাই—শস্য পিষে অমৃত প্রস্তুত করা।
সময়ের গতিপথে কেবলমাত্র নামের অভিযোজন হয়নি, হয়েছে পিঠে তৈরির প্রণালীরও অভিযোজন। সেকালের পিঠে আর আজকের পিঠের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। সেকালের পিঠে ছিল রাজকীয় ও লৌকিক বিলাস। প্রাচীন বা মধ্যযুগে পিঠে শুধু খাবার ছিল না, ছিল আভিজাত্য আর শিল্পের শিলমোহর। ছিল শ্রেণিবৈষম্যের প্রতীক।
‘আসকে পিঠে’ বা ‘সরুচাকলি’ মানেই সেটি খুব সাধারণ মানুষের খাবার। খাবারে দুধ, গুড়, নারকেল দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না যাদের। মাটির সরায় চালের গুঁড়ো জল দিয়ে গুলে তার মিশ্রণ ঢাকা দিয়ে ভাপিয়ে তৈরি হতো বলে এর নাম ছিল ‘আঁশ-কা’ বা আসকে। এটি সম্ভবত পিঠের আদিমতম রূপ।
সরু চাকলি
অন্যদিকে, অভিজাত বা অবস্থাপন্ন গৃহস্থের বাড়িতে পিঠের চেহারা ছিল রাজকীয়। নারকেলের পুর দিয়ে অর্ধচন্দ্রাকৃতি আকার দিয়ে তৈরি করা হতো চন্দ্রপুলি। এই পিঠেতে তখন প্রচুর পরিমাণে কর্পূর ব্যবহার করা হতো। যদিও আজ আর সেই সুবাস পাওয়া যায় না।
চন্দ্রপুলি
দুধ ঘন করে ফুটিয়ে তার মধ্যে ছোট ছোট পুলি ফেলার চল ছিল, যা আজকের দুধ-পুলি। কিন্তু তখন তাতে মেশানো হতো কেশর আর গোলাপ জল। আর তার নাম ছিল ক্ষীরপুলি ও মনোহরা।
সেকালের ক্ষীরপুলি, একালের দুধপুলি
মঙ্গলকাব্যে এমন কিছু পিঠের নাম পাওয়া যায় যার রেসিপি আজ লুপ্ত। যেমন ‘ত্রিভুবন পিঠে’ বা ‘পদ্মমধু’। শোনা যায়, পদ্মফুলের পাপড়ির নির্যাস দিয়ে কোনো এক জাদুকরী উপায়ে এটি তৈরি করা হতো।
চৈতন্যচরিতামৃতের বর্ণনায় পাওয়া যায়, মহাপ্রভুকে ভক্তরা ‘কাকরা’ (এক ধরনের মুচমুচে ভাজা পিঠে) আর ‘মুগ-সামলি’ (মুগ ডাল ও মশলা দেওয়া নোনতা পিঠে) ভোগ দিতেন। অর্থাৎ, পিঠে মানেই যে শুধু মিষ্টি, এই ধারণাটা সেকালে ছিল না। ঝাল ও নোনতা পিঠের বিশাল সমাহার ছিল তখন।
সেকালের কঠিন ও সময়সাপেক্ষ রন্ধন প্রণালী আজকের দিনে হারিয়ে গেছে। আজকের ব্যস্ত যুগে মানুষ সহজ রেসিপি খোঁজে। তাই এসেছে ‘ফিউশন পিঠে’। আগে যেখানে শুধুই ক্ষীর বা নারকেলের ব্যবহার করা হতো, এখন সেখানে জায়গা করে নিয়েছে চকোলেট পাটিসাপটা, ম্যাঙ্গো পুলি, কিংবা আইসক্রিম পিঠে। সময় বাঁচাতে চালের গুঁড়োর বদলে সুজি বা ময়দার ব্যবহার বেড়েছে। খেজুর গুড়ের বদলে অনেক ক্ষেত্রে চিনি বা কৃত্রিম ফ্লেভার ব্যবহার হচ্ছে। সবথেকে বড় পরিবর্তন হলো—আগে পিঠে ছিল হেঁশেলে তৈরি হওয়া এক ভালবাসার পদের নাম। যেখানে বাড়িতে পিঠে তৈরি হচ্ছে মানে বাড়ির প্রতিটি সদস্যের আধীর আগ্রহে অপেক্ষা আর বারবার হেঁশেলে ঢুঁ মারা। কিন্তু এখন পিঠে অনেক ক্ষেত্রেই ‘সুইট শপ’ থেকে কেনা এক শৌখিন ডেজার্ট।
তবুও, আজকের দিনেও মকর সংক্রান্তি এলেই বাঙালির মনটা কেমন আনচান করে। শহুরে ব্যস্ততায় হয়তো ঢেঁকির শব্দ হারিয়ে গেছে, 'ফ্ল্যাট কালচারে' বাড়ির উঠোন হারিয়ে গেছে, যেখানে বসে রোদে পিঠ দিয়ে বসে পিঠে খাওয়া হবে। কিন্তু আজও কোনো এক ফ্ল্যাটের বন্ধ রান্নাঘরে যখন প্রেসার কুকার আর নন-স্টিক প্যানের ভিড়ে একটু নলেন গুড় ফোটে, তখন সেই গন্ধে মিশে থাকে হাজার বছরের পুরনো সেই ‘পিষ্টক’-এর বিবর্তিত ইতিহাস। সময় বদলায় কিন্তু জিভের ডগায় লেগে থাকা পিঠের স্বাদের ইতিহাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা বাঙালি।







