কুমোরটুলিতে কেন এখনও হাতে গোনা মহিলা মৃৎশিল্পী?
Women in Kumartuli’s Idol-Making Tradition: কুমোরটুলিতে দুর্গার প্রতিমা গড়ার কাজে এখনও কেন হাতে গোনা মহিলা শিল্পী? ‘মেয়েদের কাজ নয়’—এই ধারণা, কাজের শারীরিক পরিশ্রম এবং পুরুষ-প্রধান পরিবেশ পেরিয়ে কীভাবে নিজেদের জায়গা তৈরি করছেন চায়না পাল, মালা পাল, কাকলি পালরা?
দশ হাতে দশ কাজ সামলানোর উদাহরণ দেওয়া হয় মেয়েদের। অফিস থেকে সেনাবাহিনী, বিমান চালানো থেকে গবেষণা—প্রায় সব ক্ষেত্রেই নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিচ্ছেন মহিলারা। কিন্তু কলকাতার ঐতিহ্যবাহী কুমোরটুলিতে এখনও ছবিটা কিছুটা আলাদা। দেবী দুর্গার প্রতিমা তৈরির এই শিল্পে মহিলা শিল্পীর উপস্থিতি এখনও তুলনামূলক ভাবে কম।
উত্তর কলকাতার কুমোরটুলি বাংলার মৃৎশিল্পের দীর্ঘ ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক স্থান। এখানকার প্রতিমা কলকাতা ও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের পুজোয় যায়, এমনকি দেশের বাইরেও পাঠানো হয়। অথচ সেই প্রতিমা তৈরির কারিগরদের মধ্যে মহিলার সংখ্যা এখনও হাতে গোনা।
কুমোরটুলিতে কাজ করা মহিলা শিল্পীদের কথায়, এই পেশায় আসার পথ তাঁদের জন্য সহজ ছিল না। ‘মেয়েদের কাজ নয়’ এমন মন্তব্য শুনতে হয়েছে অনেককেই। তার সঙ্গে রয়েছে কাজের শারীরিক পরিশ্রম। বাঁশ, খড়, মাটি দিয়ে কাঠামো তৈরি করা থেকে শুরু করে প্রতিমা সরানো বা গাড়িতে তোলা—প্রতিটি ধাপেই যথেষ্ট শ্রমের প্রয়োজন। একা বা শুধু কয়েকজন মহিলার পক্ষে সবটা সামলানো অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Women of Kumartuli: কুমারটুলির মহিলা শিল্পীরা পাল্লা দিচ্ছেন পুরুষ শিল্পীদের সঙ্গে।
তবু সেই বাধা পেরিয়েই নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন চায়না পাল। প্রতিমাশিল্পী হিসেবে কুমোরটুলিতে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন তিনি। মহিলা শিল্পীদের কাজের ক্ষেত্রে যে সংশয় বা বাধা রয়েছে, তাঁর অভিজ্ঞতাতেও তার ছাপ রয়েছে। তবু তিনি চান আরও মহিলারা এগিয়ে আসুন এই কাজে।
মালা পালও কুমোরটুলির পরিচিত মহিলা প্রতিমাশিল্পীদের অন্যতম। শুধু নিজের হাতে প্রতিমা গড়াই নয়, নতুন প্রজন্মকে এই শিল্প শেখানোর কাজও করছেন তিনি। তাঁর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে মেয়েরাও আসে। আগামী দিনে তাঁর ছাত্রীরা কুমোরটুলিতে এসে পেশাদার ভাবে প্রতিমা তৈরি করবেন—এমনটাই আশা তাঁর।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Durgapuja 2022: সিমলা ব্যায়াম সমিতি, কুমোরটুলি না বাগবাজার, কোন পুজো সবচেয়ে পুরনো?
তবে এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও রয়েছে অন্য চিন্তা। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই প্রতিমা তৈরির মতো শ্রমনির্ভর ঐতিহ্যবাহী পেশায় আগ্রহী নয়। নতুন প্রজন্ম অন্য পেশার দিকে ঝুঁকছে বলে জানাচ্ছেন শিল্পীরা। ফলে মহিলা শিল্পীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি এই ঐতিহ্যবাহী পেশাটিকে নতুন প্রজন্মের কাছে টিকিয়ে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ।
কেউ আবার পরিস্থিতির চাপে এই পেশায় এসেছেন। ২০২৩ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে প্রতিমা তৈরির কাজে নামেন কাকলি পাল। তার আগে এই কাজ করতেন তাঁর স্বামী। অর্থাৎ কারও কাছে প্রতিমা তৈরি শিল্প ও পেশা, আবার কারও কাছে সেটাই হয়ে উঠেছে সংসার চালানোর অবলম্বন।
কুমোরটুলির মহিলা শিল্পীদের এই গল্প আসলে শুধু কয়েকজন শিল্পীর ব্যক্তিগত লড়াইয়ের গল্প নয়। বৃহত্তর শ্রমবাজারেও মহিলাদের অংশগ্রহণের প্রশ্নটি এখনও গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন মন্ত্রকের পিএলএফএস-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছর ও তার বেশি বয়সি মহিলাদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ২০২৬ সালের মার্চে ছিল ৩৪.৪ শতাংশ। এপ্রিলে তা কমে দাঁড়ায় ৩৩.৯ শতাংশে। গ্রামীণ এলাকায় মহিলা এলএফপিআর ছিল ৩৮.২ শতাংশ, শহরাঞ্চলে ২৫ শতাংশ। ২০২৫ সালের এপ্রিলের তুলনায়ও সামগ্রিক মহিলা এলএফপিআর ০.৩ শতাংশীয় বিন্দু কমেছে।
কুমোরটুলির সরু গলিতে তাই একদিকে যখন দেবী দুর্গার দশভুজা রূপ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে সেই প্রতিমা গড়া মহিলাদের লড়াইও চলছে। পুরুষ-প্রধান এই পেশায় তাঁরা জায়গা করে নিয়েছেন ঠিকই। কিন্তু তাঁদের সংখ্যা বাড়বে কি না, আগামী প্রজন্মের মেয়েরা এই পেশাকে পেশা হিসেবে বেছে নেবে কি না! সেই উত্তর হয়তো সময়ই দিতে পারবে।








