দুর্গাপুজো যাদের কাছে এক অভিশাপ

Arunima Mukherjee
৩ মিনিট
দুর্গাপুজো যাদের কাছে এক অভিশাপ

আশ্বিনের শিশির ভেজা কোমল ঘাসে পা রেখে উমা যেন প্রায় চলেই এসেছেন বাপের বাড়ি। পিতৃপক্ষের অবসান ঘটিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয়েছে ইতিমধ্যেই। রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গলা শোনামাত্রই বাঙালিদের পুজোর শুরু হয়। গোটা বাংলায় এ বড় সুখের সময়। উমার মতই এই সময় ঘরে ফেরে বিদেশ বিভুঁইয়ে থাকা আরও কত বাঙালি সন্তান। পুজোর এই ক'টা দিন তাই সব ভুলে আনন্দের জোয়ারে গা ভাসায় আট থেকে আশি সকলেই।

যেখানে সারা বিশ্বের বাঙালি আজ পুজোর আনন্দে মাতোয়ারা, সেখানে এই পশ্চিমবঙ্গের বুকেই এক জনগোষ্ঠীর কাছে দুর্গা পুজোর আগমনে নেমে আসে শোকের ছায়া। মহালয়ার দিন থেকেই তাঁরা নিজেদের গৃহবন্দি করে ফেলেন। ঝাড়খণ্ড লাগোয়া পুরুলিয়া, পশ্চিম-মেদিনীপুর থেকে উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ির চা বাগানের নানান জায়গায় তাঁদের বসবাস। এরা আসলে ‘অসুর’ জনজাতি। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী জানা যায় এ রাজ্যে প্রায় চার হাজার ‘অসুর’ জনজাতির মানুষ বসবাস করেন। ১৯৯১ সালের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, অসুরদের ৫২.৭২ শতাংশ চা-বাগানের শ্রমিক, ১৫.৬৫ শতাংশ কৃষক এবং ১৩.৬ শতাংশ খেতমজুর। উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার নাগরা কাটার ক্যারন, আলিপুরদুয়ার জেলার মাঝেরডাবরি, নিমাতিঝোরা এবং শিলিগুড়ির নকশালবাড়ি চা বাগানে মোট ৬০০ টি অসুর পরিবার বাস করেন। অসুর বংশের সদস্য সুষমা অসুরের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এক সময় খনি থেকে লোহা তোলার কাজে নিযুক্ত ছিলেন এই অসুর উপজাতির সদস্যরা। মূলত তাঁরা চা বাগানের সাদরি ভাষা বোঝেন।

মহিষাসুরের বিক্রমে যখন একদিকে দেবকুলের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছিল, আবার মর্ত্যলোকে ঘনিয়ে এসেছিল বিপদের ঘন মেঘ, তখন সেই প্রবল শক্তিশালী মহিষাসুরকে নিধনের উদ্দেশ্যে সমগ্র দেবকুল এবং মানবকুল শরণাপন্ন হয়েছিল দেবী দুর্গার। অসুর নিধনের এই কাহিনিই আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি। কিন্তু এই ‘অসুর’ জনজাতি আসলে মহিষাসুরকে তাঁদের পূর্বপুরুষ বলে মনে করেন। রামায়ণের রাম এবং রাবণকে নিয়ে যে আর্য–অনার্য চিন্তাধারার কথা শোনা যায়, এই ক্ষেত্রটিও সেই একই সূত্রে গাঁথা। এই মানুষদের মতে তাঁরাই এই দেশের প্রাচীন জনজাতি। তাঁদের নেতার নাম ছিল ‘হুদুর দুর্গা’ বা ‘মহিষাসুর’। দুর্গা সাঁওতালি ভাষায় পুংলিঙ্গ। ‘হুদুর’ কথার অর্থ হল প্রচণ্ড বেগে বয়ে চলা বাতাস বা ঝড় এবং ‘দুর্গা’ কথার অর্থ যিনি দুর্গকে রক্ষা করেন। কেউ কেউ আবার এই হুদুর দুর্গাকে রাজা হিসাবেও কল্পনা করেছেন। তিনি ছিলেন প্রবল শক্তির অধিকারী। তাঁর রাজ্যে নারীরা ছিলেন তাঁদের যোগ্য সম্মানের অধিকারিণী। হুদুর দুর্গার শাসনকালে কোন নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং অসহায় মানুষের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা নিষিদ্ধ ছিল। আর্যরা যখন ভারতে আসেন, তখন সাঁওতাল, হো, মুন্ডা, ওঁরাও প্রভৃতি বিভিন্ন জাতি-উপজাতি তাঁদের ঘোর বিরোধীতা করেন। শোনা যায়, পরপর সাতবার চেষ্টার পরেও যখন আর্যরা এই হুদুর দুর্গকে পরাস্ত করতে বিফল হন , তখন ইন্দ্র এক ছলনার আশ্রয় নেন। তিনি বারাঙ্গনা দেবীকে হুদুর দুর্গার কাছে পাঠান, প্রথমে তিনি এই দেবীকে প্রত্যাখান করলেও অবশেষে তাঁকে বিয়ে করেন। বিয়ের নবন দিনে এই দেবীর দ্বারা নিহত হন হুদুর দুর্গা। হুদুর দুর্গাকে হত্যা করে তিনি হন দেবীদুর্গা। তথ্যচিত্র নির্মাতা সুমিত চৌধুরী এই বিষয়ে বলেছেন, “এক গৌরবর্ণা নারীই যে মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন তা হিন্দু পুরাণে আছে। দেবী দুর্গার যে প্রতিমা গড়া হয়, সেখানে দুর্গা গৌরবর্ণা, টিকালো নাক, যেগুলি আর্যদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য। দুর্গার আরেক নাম সেজন্যই গৌরী। অন্যদিকে মহিষাসুরের যে মূর্তি গড়া হয় দুর্গা পুজায়, সেখানে তার গায়ের রঙ কালো, কোঁকড়ানো চুল, পুরু ঠোঁট। এগুলো সবই অনার্যদের বৈশিষ্ট্য।” যদিও এ শুধুমাত্র এক কাহিনি, এর কোন পোক্ত ভিত্তি নেই।

পুজোর এই ক'টা দিন তাই শোক পালন করেন অসুর জনজাতির মানুষেরা। কোথাও পালিত হয় অরন্ধ্রন , আবার কোথাও জানলা-দরজা বন্ধ করে ঘরেই বসে থাকেন তাঁরা। অনেকে আবার এই শোক পালনের প্রতীকী হিসাবে পরিধান করেন সাদা বস্ত্র , কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় গোটা বাড়ি। পুজোর ঢাকের শব্দ যাতে কানে না আসে, তাই ভূয়াং বাদ্যযন্ত্র বাজানো হয়। এই সময় তাঁরা দাসাই নাচ করেন। পুরুষেরা নারী যোদ্ধার ছদ্দবেশ ধারণ করে কান্নার সুরে গান গেয়ে ঘুরে বেড়ান গ্রামে গ্রামে। এই গানের মধ্যে দিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে খোঁজ চালানো হয় হুদুর দুর্গার, এই নাচে কোন মেয়ে অংশ নেন না। দশমীর দিনে বন্দনা করা হয় মহিষাসুরের। ২০১১ সালে গোটা পশ্চিমবঙ্গে দুশোটির মত অসুরের পুজা বা স্মরণসভা আয়োজিত হয়েছিল, ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় সাতশোরও কিছু বেশি।

তবে সময়ের সঙ্গে অনেককিছুই আর আগের মত নেই। এখনকার খুদেরা দুর্গাপুজোয় আর নিজেদের গৃহবন্দি করে রাখে না। বাকিদের সঙ্গে পা-এ পা মিলিয়ে তারাও সামিল হয় ঠাকুর দেখার ভিড়ে। কিন্তু, আজও গ্রামের বৃদ্ধ মানুষেরা ঘরেই থাকেন, দেবী দুর্গা আজও তাঁদের কাছে এক হত্যাকারিণী।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।